kalerkantho


জেন্ডার বাজেট ও নারী প্রতিনিধি

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



জেন্ডার বাজেট ও নারী প্রতিনিধি

জাতীয় বাজেটে নারীর জন্য বরাদ্দ ও সার্বিক বাজেটে নারী সুযোগ কতটুকু পাচ্ছে তা সাম্প্রতিককালে সরকার ও সরকারের বাইরে জোরেশোরেই আলোচিত হচ্ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, ‘দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক, পশ্চাত্পদ গোষ্ঠী অর্থাৎ নারীদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ...নারীকে স্বাবলম্বী করে তোলার লক্ষ্যে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করব, অব্যাহত রাখব নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের কার্যক্রম। ’

জেন্ডার বাজেট ধারণাটি খুব ব্যাপক। মূলত জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট হলো উভয় জেন্ডারভুক্ত জনগোষ্ঠীর সমভাবে উন্নয়নের বাজেট। এই ধরনের বাজেট প্রণয়ন শুধু নারীর স্বার্থে জরুরি নয়, পুরুষের স্বার্থ ও দেশের উন্নয়নের স্বার্থে জরুরি। ১৯৮৪ সালে অস্ট্রেলিয়ায় জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট বিশ্লেষণ প্রথম শুরু হয় এবং ১৯৯১ সালে সে দেশে প্রথম জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণীত হয়। পরবর্তীকালে এই উদ্যোগ শুরু হয় দক্ষিণ আফ্রিকায়। ২০০১ সালের প্রথমদিকে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট বিষয়টি বাংলাদেশের নারীগোষ্ঠী ও গবেষকের কাছে গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১-এর ঘোষণাপত্রে নারী উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা, জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট যথাযথ বাস্তবায়ন করা ও মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় তথা রাষ্ট্রীয় বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রক্রিয়া অনুসরণ অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদে নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে অর্থ বরাদ্দের কথা বলা হয়।

অতীতে তেমনভাবে না হলেও বর্তমান বাংলাদেশের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নারীর জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হচ্ছে। নারীর জন্য এই বিশেষ ব্যবস্থাগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রতিবছর জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ দেখাতে হয়। এ ব্যবস্থায় নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিরা নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করার সুযোগ পান। ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিরা জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট সম্পর্কে নিজ ধারণা পোষণ করতে পারেন। ১৯৯৭ সালে ইউনিয়ন পরিষদের তিনটি ওয়ার্ডের স্থলে ৯টি ওয়ার্ড গঠন, একটি ওয়ার্ড থেকে একজন সদস্য ও তিনটি ওয়ার্ড নিয়ে একজন মহিলা সদস্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। এই নিয়মে বাংলাদেশে ১৯৯৭, ২০০৩, ২০১১ ও ২০১৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে সংরক্ষিত নারী আসন তিনটি। সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালে। এতে ব্যাপক সংখ্যক নারী নানা সমস্যা মোকাবেলা করেও স্থানীয় নেতৃত্বে নির্বাচিত হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ২৫ জন নারী নির্বাচিত হয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নারীদের জয়ের এই সংখ্যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়েও বেশি।

২০১১ সালে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিদের মতামত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়নে নারী প্রতিনিধিরা যথাযথ ভূমিকা পালন করেন না। এ বিষয়ে সাধারণ নারীদের ধারণা হচ্ছে, ইউনিয়ন পরিষদে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়নে নারী প্রতিনিধিরা কোনো ভূমিকা পালন করেন না। নারী প্রতিনিধিরা মতামত দেন, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বারদের অসহযোগিতার কারণে তাঁরা যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছেন না। অবশ্য ইউনিয়ন পরিষদে পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও কাজের সুষ্ঠু পরিবেশের অভাবের কথাও নারী প্রতিনিধিরা বলেছেন। সাধারণ নারীরা নারী প্রতিনিধির সীমাবদ্ধতা (যোগ্যতা, দক্ষতা, ক্ষমতা ও সামর্থ্যের অভাব) ছাড়াও প্রশ্ন তুলেছেন নারী প্রতিনিধির কাজ করার ইচ্ছা, মানসিকতা ও আন্তরিকতা নিয়ে। মূলত জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট সম্পর্কে নারী প্রতিনিধি ও গবেষিত এলাকার সাধারণ নারীদের কোনো ধারণা নেই বলে গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে। এ বিষয়ে পুরুষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পারিবারিক ও শিক্ষাদীক্ষায় অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন নারীরা নারী প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হননি কিংবা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। ফলে যোগ্যতার অভাবের কারণে তাঁরা অনেক কিছুই করতে পারছেন না। এমনকি অনেক নারী প্রতিনিধি আছেন যাঁরা পুরুষ প্রতিনিধির সহযোগিতা ছাড়া কোনো কাজই ঠিকমতো করতে পারেন না। মাঠকর্মের মাধ্যমে জানা গেছে, আদি বা বড় ব্যবসায় নারীর অংশগ্রহণ নেই, নারীর নেই কোনো অর্থনৈতিক স্বত্বাধিকার। পুঁজি বা মূলধন সব কিছুর মালিকই পুরুষ। অর্থনীতিও পুরুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রবল প্রতাপের ওপর নির্বাচিত নারীসমাজ তেমন কোনো প্রভাব বিস্তার করেছে বলে গবেষণায় প্রতীয়মান হয়নি।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণে ইউনিয়নের সম্ভ্রান্ত, শিক্ষিত ও মর্যাদাশীল পরিবারের নারীদের পরিষদের নারী প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। এ লক্ষ্যে নারী প্রতিনিধির ক্ষমতা, কার্যাবলি, মর্যাদা ও সম্মানী বৃদ্ধি করে অন্তত এমন করা যেতে পারে যাতে পদটির প্রতি শিক্ষিত, সচেতন ও মর্যাদাশীল পরিবারের সদস্যদের আগ্রহ বাড়ে। প্রয়োজন ইউনিয়ন পরিষদে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়ন বাধ্যতামূলক করা। প্রাথমিকভাবে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়নে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট সম্পর্কে ইউনিয়ন পরিষদের সব (নারী-পুরুষ) প্রতিনিধির জন্য সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদের অর্থনৈতিক খরচ ও বাজেটিং-সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে নারী প্রতিনিধির মতামত গ্রহণ আইন দ্বারা বাধ্যতামূলক করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। জেন্ডারের রাজনৈতিক দিক সম্পর্কেও নারী প্রতিনিধিকে সচেতন করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক অধিকার আদায় ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নারী প্রতিনিধি ও সাধারণ নারীকে উত্সাহিত করার জন্য অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে এ কথাও ঠিক যে আগের মনোনয়ন ব্যবস্থার পরিবর্তে বর্তমানের নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা বাংলাদেশের নারী ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

 

লেখক : উন্নয়ন গবেষক, সহকারী পরিচালক প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট

dr.mmh.ju@gmail.com


মন্তব্য