kalerkantho


বৈশ্বিক শোষণ ও বিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্য

মুহা. রুহুল আমীন

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বৈশ্বিক শোষণ ও বিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্য

সমুদ্রতীরের উত্তপ্ত বালুর ওপর পড়ে থাকা শিশু আইলানের নিথর দেহ এবং সিরিয়ার ভবন ধসের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে রক্তাক্ত শিশু ওমরানের ক্ষত-বিক্ষত দেহ বিশ্ব মিডিয়ায় প্রকাশের পর বিশ্ববিবেককে আন্দোলিত করেছিল ব্যাপকভাবে। খুবই নিষ্ঠুর।

বোধ করি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে কাঁদিয়েছিল ঘটনা দুটি। বিশ্ব সমবেদনা তখন উপচে পড়ে বিশ্ববিবেকের সাধারণ বিন্দুতে মিলিত হয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপারটি, সেদিকে কারো দৃষ্টি পড়েনি। আইলান ও ওমরানের মতো যেন আর কোনো শিশুর জীবনে এমন করুণ পরিণতি না আসে, সে জন্য বিশ্বসমাজ তো শুধু নিষ্ঠুর নীরবতাই দেখিয়ে আসছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিবিসি ও এএফপি প্রচারিত দুটি খবর সিরিয়াসহ আরব জাহানের সমস্যা যে অচিরে সমাধানের মুখ দেখবে না, তা জানান দিচ্ছে। সিরিয়াবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত স্তেফান দো মিস্তুরা জেনেভায় জাতিসংঘ আয়োজিত সিরিয়াবিষয়ক শান্তি আলোচনা শুরুর আগে মন্তব্য করেছেন, ‘এসবের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র কোথায়? আমি বলতে পারছি না, কারণ আমার জানা নেই। ’ যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আবির্ভাবের পর থেকেই জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো রাষ্ট্রদূত নেই। এটা অকল্পনীয় যে স্নায়ুযুদ্ধোত্তর সময়ে একক পরাশক্তি হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘে কোনো রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেবে না। কয়েক মাস আগেও জাতিসংঘের কোনো দপ্তরে এমন মন্তব্য অকল্পনীয় ছিল।

সিরিয়া, ইরানের পারমাণবিক ইস্যু; আইএস, ইরাক, ইউক্রেনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির পদভারে কূটনৈতিক অঙ্গন নিয়মিত ক্লান্ত হয়ে উঠত। আর আজ যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিবিদদের অবর্তমানে সেখানে আশা-শূন্যতা বিরাজ করতে শুরু করেছে।

বিবিসি প্রচারিত ওপরের খবরটি দেখে মনে হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মতো বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণকারী বিশ্বশক্তির ব্যাপারে এমন ধারণা নিছক ভ্রম ও সংশয় সৃষ্টিকারী। এ কথার প্রমাণ পাওয়া যায়, এএফপির খবরে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সিরিয়ায় অবরোধ আরোপের বিষয়ে উত্থাপিত খসড়া প্রস্তাবে পাল্টাপাল্টি অবস্থান গ্রহণ করে। সিরিয়ায় অবরোধ আরোপের ব্যাপারে এ পর্যন্ত রাশিয়া অনূর্ধ্ব সাতবার ভেটো প্রদান করে এ কথাই প্রমাণ করতে চেয়েছে, রাশিয়া সিরিয়ার চিরায়ত মিত্র এবং সে কারণে সিরিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত যেকোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাশিয়া স্থাণুর মতো বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

সিরিয়া ইস্যু সমাধানের ক্ষেত্রে উপর্যুক্ত ধারণাগুলোর বাইরে একটি তৃতীয় নয়ন পর্যবেক্ষক হিসেবে সক্রিয় রয়েছে। সেটা আবর্তিত হচ্ছে সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নকে ঘিরে : সিরিয়া সমস্যার কি সমাধান হবে? কী হতে যাচ্ছে দেশটিতে? কী আছে আরব ভাগ্যহীনদের ললাটে? কোন দিকে গড়াচ্ছে শরণার্থী ইস্যু? কোন পথে হাঁটছে বিশ্বরাজনীতি?

সিরিয়ায় যা ঘটছে তা মর্মন্তুদ, হৃদয়বিদারক। কিন্তু সিরীয় ইস্যুকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে। অর্থাৎ একটি দেশের রাষ্ট্রিক পর্যায়ের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করলে তা আরো বড় ভুল হবে। সিরিয়াকে আফ্রো-এশীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম একটি সমস্যাজর্জরিত রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে হবে, যার সমস্যার একক সমাধান কখনো কাঙ্ক্ষিত শান্তি আনবে না।   তাই ওই রাষ্ট্রটির সমস্যা অন্য আরব রাষ্ট্রগুলোর সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত; ফলে অন্য রাষ্ট্রগুলোর সমস্যাও দূর করতে হবে। বিশেষত বৈশ্বিক শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়া এবং অন্তঃক্রিয়ার সঙ্গে সিরিয়াসহ আরব রাষ্ট্রগুলোর সমস্যাগুলো যেহেতু অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কযুক্ত, সে কারণে বৈশ্বিক মোড়ল রাষ্ট্রগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সুষ্ঠু কূটনৈতিক পদক্ষেপ ছাড়া সিরিয়াসহ আরব অঞ্চলের কোনো রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান অচিন্তনীয়।

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের সময়ের এবং বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে সংঘটিত বিশ্বরাজনীতির নানা ঘটনাপ্রবাহের প্রত্যক্ষ শিকার সিরিয়াসহ আরব দেশগুলো। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে আফ্রো-এশীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সুসংহত ও সুসংগঠিত রূপ একসময় দূরাতিক্রম্য বিশ্বশক্তির বৈশিষ্ট্যে বিকশিত করে আরব অঞ্চলকে, যার সীমানা বিস্তৃত হয়ে ইউরোপের বিরাট অংশকেও অন্তর্ভুক্ত করে। এভাবে দিগন্ত বিস্তৃত অটোমান সাম্রাজ্য ইউরোপের জন্য সদা ত্রাস হিসেবে বিবেচিত হয়। নানাভাবে, নানা কৌশলে ইউরোপীয়  বৃহৎ শক্তিবর্গ সংঘবদ্ধ মুসলিম শক্তিকে বিনাশ করতে তত্পর হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর খেলাফত অবসানের মাধ্যমে ইউরোপীয়দের সেই নিরন্তর চেষ্টা সফল হয়। ভেঙে তছনছ হয়ে যায় বৈশ্বিক শৌর্যবীর্যের অধিকারী অটোমান সাম্রাজ্য। লিগ অব নেশনসের ম্যান্ডেট ব্যবস্থার অধীনে আরব রাষ্ট্রগুলোর আশ্রয় জোটে। আফ্রো-এশীয় মুসলিম দেশগুলোর সকরুণ পরিণতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো আরব এলাকায় জোরপূর্বক ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠা, যার পর থেকে একে একে সমগ্র আরবকে দুর্বল করার প্রক্রিয়া শুরু।

ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটি বিস্মৃত হলে সিরিয়াসহ আরবদের কোনো সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হয় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পর গর্জে ওঠা দুটি পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন জমি ভাগাভাগির মতো আরব এলাকার বণ্টন প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়ে। বৈশ্বিক পরিসরে তারা ন্যাটো এবং ওয়ারশ চুক্তি সম্পাদন করে, যার আরব সংস্করণ সেন্টো এবং এজাতীয় চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের মার্শাল পরিকল্পনায় গ্রিস এবং তুরস্ককে সাহায্যের ঘোষণা দেওয়া হয় ও এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিকন ব্যবস্থা কার্যকর থাকে। মূলত অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তার মাধ্যমে দুটি পরাশক্তি আফ্রো-এশীয় এলাকার ভাগাভাগির কাজে জড়িয়ে পড়ে।

স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পরও সেই ভাগাভাগির প্রক্রিয়া বন্ধ হয়নি; বরং ভিন্ন অবয়বে একইভাবে আগের শোষণ প্রক্রিয়া চালু রয়েছে।

আরব বসন্তের শুরুতে বোঝা যাচ্ছিল, বৈশ্বিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে আরব মুসলিমরা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। তিউনিসিয়ার একনায়ক গদি ছেড়েছেন, মিসরের একনায়ক জনতার কাছে হেরেছেন। লিবিয়ার একনায়কের করুণ মৃত্যু হয়েছে। একে একে আরব রাষ্ট্রগুলোর একনায়ক শাসকদের যে মসনদ, যা দীর্ঘ বছর ধরে পরাশক্তিদ্বয়ের সহায়তায় গড়ে উঠেছিল, চুর চুর করে তা ভেঙে যেতে শুরু করে। ওই দেশগুলোর শোষিত-বঞ্চিত-নির্যাতিত মানুষগুলো গণতন্ত্রের মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার আশায় বিভোর হয়ে ওঠে। কিন্তু অচিরেই তাদের সেই প্রত্যাশা বুদ্বুদের মতো উবে যায়। আনন্দের বেলুনগুলো আকাশে উড়তেই চুপসে যায়। ফুটো হয়ে ভেঙে পড়ে। মিসরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ মুরসিকে কারাবরণে যেতে হয়, গণতান্ত্রিক দল ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিসকে কোণঠাসা করা হয়, এর নেতাকর্মীরা সামরিক ও বিচারিক আমলাদের নিপীড়নে জর্জরিত হয়। লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফির মৃত্যু হলেও সেখানে গণতন্ত্রায়ণের পথ রুদ্ধ করা হয়। তথাকথিত ঐকমত্যের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার সঙ্গে না আছে ঐকমত্য, আর না আছে জনগণের যোগসূত্র। গণতন্ত্রের নামে ইরাকের একনায়ক সাদ্দামকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলেও সেখানকার রাষ্ট্রটিকে বেসামাল করে রাখা হয়। ইরাক এখন আরব বিশ্বের ক্ষত-বিক্ষত, ভেঙে চৌচির হওয়া একটি জীর্ণ রাষ্ট্র, হার্ভার্ড তাত্ত্বিক হান্টিংটন যাকে ‘ছিন্ন-ভিন্ন রাষ্ট্র’ বা ‘টর্ন কান্ট্রি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

আরব বিশ্বে আরব বসন্তের সবচেয়ে অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে সিরিয়ার ভাগ্যে। সিরিয়ার একনায়ক হাফিজ আল আসাদ ছিলেন পাশ্চাত্যের পরিচিত মিত্র, সেক্যুলার রাজনীতিক। একই ধারায় তাঁর পুত্র এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। সেক্যুলার হয়েও, প্রগতিশীল হয়েও বাশার রাখতে পারছেন না তাঁর গদি। আরব বসন্তের ঝিরিঝিরি বাতাস সিরিয়ায় প্রবিষ্ট হয়েছে চৈত্রের দাবদাহে, চৈতী লু হাওয়া ওলটপালট করে দিচ্ছে সিরিয়ার মাটি, মানুষ ও প্রকৃতিকে।

প্রশ্ন হলো, কেন এমন হলো? কী হতে যাচ্ছে ভবিষ্যতে? কী আছে সিরিয়ার নির্যাতিত জনগণের ভাগ্যে? কী আছে শরণার্থীদের কপালে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে হুগভেল্ট, ফ্রাংক, ওয়ালার স্টেইন, কার্ডোসো, ফ্যালেটটো প্রমুখ ছকবিন্যাস তাত্ত্বিকদের তত্ত্ব, বিশ্লেষণ ও দর্শনের মধ্যে।

সিরিয়াসহ অন্য আরব রাষ্ট্রগুলোর জনগণ মূলত বৈশ্বিক ধনতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব এবং ভূখণ্ড ভাগাভাগির লড়াইয়ের প্রত্যক্ষ শিকার। সে কারণে এ সমস্যা সমাধানে ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং অন্য স্টেকহোল্ডারদের একতাবদ্ধ প্রচেষ্টার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। সে ক্ষেত্রে বৈশ্বিক ঐকমত্য প্রয়োজন। কিন্তু সবচেয়ে প্রয়োজন ওই রাষ্ট্রগুলোর ঐক্য, যারা প্রত্যক্ষভাবে বৈশ্বিক শোষণপ্রক্রিয়ার শিকার।

সিরিয়ার ওপর নতুন করে অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা সমস্যাটিকে ব্যাক গিয়ারে ছুড়ে দিচ্ছে। আবার শান্তি প্রচেষ্টার মোড়কে রাশিয়া তার আরব-আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় উন্মত্ত। আরবরা এ ব্যাপারে শতধাবিভক্ত। বিশ্ব শক্তিগুলোর সমীকরণ বোধগম্য। কিন্তু আরবরা কেন বিভক্ত? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ারও কেউ নেই। তাই সিরিয়া সমস্যা সমাধানে প্রকৃতির হস্তক্ষেপ হয়তো অপেক্ষা করছে।

 

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

mramin68@yahoo.com


মন্তব্য