kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো । ধারাবাহিক

বিশেষ অতিথির সম্মানে দাঁড়ানোর বিধান

৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বিশেষ অতিথির সম্মানে দাঁড়ানোর বিধান

১০০. সে [ইউসুফ (আ.)] তার মাতা-পিতাকে উচ্চাসনে বসিয়েছে। তারা সবাই তার সম্মানে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। সে বলল, হে আমার পিতা! এটিই আমার আগের স্বপ্নের ব্যাখ্যা। আমার প্রতিপালক তা সত্যে পরিণত করেছেন। অবশ্যই তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, (বিশেষভাবে) যখন তিনি আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছেন এবং শয়তান আমার ও আমার ভাইদের সম্পর্ক নষ্ট করার পরও আপনাদের মরু অঞ্চল থেকে এখানে এনে দিয়েছেন। আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা তা নিপুণতার সঙ্গে করেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়। [সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ১০০ (দ্বিতীয় পর্ব)]

তাফসির : আলোচ্য আয়াতে পিতা-মাতার সঙ্গে ইউসুফ (আ.)-এর সাক্ষাৎ-পরবর্তী বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। হজরত ইউসুফ (আ.) তাঁর পিতা-মাতাকে রাজপ্রাসাদের ভেতরে নিয়ে যান। তিনি তাঁদের রাজকীয় সম্মাননা দিয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য সিজদায় অবনত হয়েছেন।

এটি ছিল সম্মান প্রদর্শনের সে যুগের রীতি।

এটা ছিল তৎকালীন মিসরীয় সমাজের সংস্কৃতি। সম্মান প্রদর্শনের ইসলামী রীতির সঙ্গে এর পার্থক্য আছে। ইসলামের নির্দেশনা হলো, ‘তোমরা প্রত্যেক মানুষকে তার স্তর অনুযায়ী সম্মান করবে। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৪২)

দূর থেকে আগত বিশেষ মেহমানের জন্য দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানানোর প্রথাও আগে থেকে প্রচলিত। কোনো ব্যক্তির জন্য দাঁড়ানোর কয়েকটি পর্যায় রয়েছে—এক. মজলিসের সরদার উপবিষ্ট, আর উপস্থিত বাকি সবাই দাঁড়ানো। এটি ইসলামী শরিয়তে নিষিদ্ধ। হাদিস শরিফে এটাকে অনারবিদের সংস্কৃতি বলে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হজরত আবু উমামা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) লাঠি হাতে নিয়ে আমাদের দিকে অগ্রসর হয়েছেন। আমরা তাঁকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম। তখন তিনি ইরশাদ করেন, তোমরা অনারবিদের মতো পরস্পরকে সম্মান দেখিয়ে দাঁড়িয়ে যেয়ো না। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫২৩০)

দুই. আগত ব্যক্তি যদি এমন হয়, যে নিজেকে সবার ঊর্ধ্বে মনে করে। অহমিকায় সে তার জন্য সবার দাঁড়ানো কামনা করে, এমন ব্যক্তির জন্য দাঁড়ানো যাবে না। একবার হজরত মুয়াবিয়া (রা.) হজরত ইবনে জুবায়ের ও ইবনে আমেরের কাছে গিয়েছেন। তাঁকে দেখে ইবনে আমের উঠে দাঁড়ান। কিন্তু ইবনে জুবায়ের (রা.) দাঁড়াননি। তখন হজরত মুয়াবিয়া (রা.) বলেন, বসে যাও, কেননা আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে শুনেছি, যে ব্যক্তি নিজের জন্য মানুষ দাঁড়িয়ে যাওয়া কামনা করে, সে যেন জাহান্নামে তার বাসস্থান বানিয়ে নেয়। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫২২৯)

তিন. সফর থেকে আগত ব্যক্তির আগমনে আনন্দ প্রকাশ করে তার জন্য দাঁড়ানো মুস্তাহাব। হজরত আয়েশা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, ফাতেমা (রা.) যখনই রাসুল (সা.)-এর কাছে আসতেন, রাসুল (সা.) তাঁর দিকে দাঁড়িয়ে অগ্রসর হতেন, চুমু খেতেন। তিনি তাঁকে নিজের জায়গায় বসাতেন। (সুনানে তিরমিজি : হাদিস ৩৮৭২)

চার. কোনো ব্যক্তির সফলতার ওপর আনন্দিত হয়ে অভিনন্দনের জন্য দাঁড়ানোও মুস্তাহাব। (ফাতহুল মুলহিম : ৩/১২৭)। এ বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে, হজরত কাব ইবনে মালেক (রা.) একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বলেন, আমি মসজিদে প্রবেশ করলে তালহা (রা.) আমার দিকে আনন্দিত হয়ে বসা থেকে উঠে দৌড়ে এগিয়ে এসেছেন এবং অভিনন্দন জানিয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৪১৮)

পাঁচ. কোনো ব্যক্তির বিপদে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে এগিয়ে যাওয়াও মুস্তাহাব। (ফাতহুল মুলহিম : ৩/১২৭)

ছয়. স্বাভাবিক অবস্থায় আগত ব্যক্তিকে সম্মান করে দাঁড়ানো জায়েজ। (ইলাউস সুনান : ১৭/৪২৯)

হজরত আবু সাইদ খুদরি (রা.) সূত্রে বর্ণিত, বনু কুরাইজার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত সাদ ইবনে মুয়াজ (রা.)-কে ডেকে পাঠিয়েছেন। সাদ (রা.) একটি গাধায় চড়ে এসেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর ব্যাপারে বলেন, তোমরা তোমাদের নেতা সাদের দিকে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যাও। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৭৬৮)

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য