kalerkantho


পরিবহন ধর্মঘট ও জনদুর্ভোগ

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সড়ক দুর্ঘটনায় প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ, সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজনের মৃত্যুর মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া বাসচালক জামির হোসেনের মুক্তির দাবিতে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রথমে চুয়াডাঙ্গায় এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে দক্ষিণাঞ্চলের ১০ জেলায় ধর্মঘট ডাকে পরিবহন শ্রমিকরা। এরপর ২৭ ফেব্রুয়ারি খুলনায় প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠকের পর ওই দিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে ১০ জেলার ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।

এদিকে ঢাকার সাভারে ট্রাকচাপা দিয়ে এক নারীকে হত্যার দায়ে ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকার এক আদালত ট্রাকচালক মীর হোসেনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। এরপর ওই রাতেই এ দুজন গাড়িচালকের মুক্তির দাবিতে ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে সারা দেশে ধর্মঘট শুরু করে পরিবহন শ্রমিকরা আর এ ধর্মঘট চলে ১ মার্চ বিকেল পর্যন্ত। দেশব্যাপী প্রায় দুই দিনের এ ধর্মঘটের কারণে দেশের অসংখ্য মানুষকে চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হয়। এমনকি রোগীবাহী অ্যাম্বুল্যান্সকেও রাস্তা দিয়ে যেতে দেয়নি পরিবহন শ্রমিকরা। দেশব্যাপী এ ধর্মঘটের প্রথম দিন রাতে ঢাকার গাবতলীতে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সৃষ্ট সংঘর্ষে চারজন পুলিশ সদস্য আহত হওয়াসহ ৩০-৪০টির মতো যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সরকারের এক মন্ত্রীর বাসায় এ ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত হয়। দোষী গাড়িচালকদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত রায় দিয়েছেন। তাহলে এ ক্ষেত্রে জনগণকে কেন দুর্ভোগ পোহাতে হবে? আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের ডাকা ধর্মঘটে জনভোগান্তির ঘটনা কি আদালত অবমাননা নয়? আইনের দৃষ্টিতে এ ধরনের পরিবহন ধর্মঘট আহ্বান এবং নৈরাজ্যকর ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করার ঘটনা নিঃসন্দেহে আদালত অবমাননার শামিল। গণমাধ্যম ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ঘাতক বাসটির গতিনিয়ন্ত্রক যন্ত্রটি বিকল ছিল। আদালতে বিআরটিএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পিড গভর্নর সিল ‘টেম্পার’ করা হয়েছিল। এই একই বিষয় ধরলে কয়টি বাসে পাওয়া যাবে? আবার বাসচালক জামিরের ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ ২০০৮ সালে শেষ হয়ে গিয়েছিল। এরপর তিনি নবায়নের জন্য কথিত মতে, যে দরখাস্ত দাখিল করেছিলেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে বিআরটিএ তাঁকে একটি স্লিপ দিয়েছিল। কিন্তু আদালতে প্রমাণিত হয়েছে যে ওই স্লিপটি ভুয়া ছিল। তাহলে তিনি কি ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে ভুয়াবাজি করেননি? তা ছাড়া ওই বাসের ফিটনেস সার্টিফিকেটও ছিল না। আর এভাবে সব বাস ও বাসচালকের ক্ষেত্রে খোঁজ নিলে শেষ পর্যন্ত যা দেখা যাবে তা হবে ‘ঠগ বাছতে গা উজাড়’-এর মতো অবস্থা। এবং এ ক্ষেত্রে এটিই হবে আসল ও প্রকৃত চিত্র। তাহলে এত অনিয়ম ও দুর্নীতিকারী বাসচালক নামক ঘাতককে রক্ষা করার নামে দেশব্যাপী জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কি উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়? পাশাপাশি জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কি আদালত কর্তৃক আদালত আবমাননার অভিযোগে শাস্তি দেওয়া যায় না?

একটি প্রবাদ আছে, ‘কপালের লিখন না যায় খণ্ডন’। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে নিয়মিতভাবে ঘটে চলা দুর্ঘটনাগুলো কি এ দেশের জনগণের কপালের লিখন? যদি কপালের লিখন হয়, তাহলে তা খণ্ডনীয় নয়। কারণ ওই যে ‘কপালের লিখন না যায় খণ্ডন’। আবার সড়ক দুর্ঘটনাগুলোকে যদি এ দেশের পরিপ্রেক্ষিতে না দেখে যদি উন্নত দেশের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে উন্নত দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার এ দেশের তুলনায় অনেক কম। তাহলে কি কপালের লিখন দেশভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে?  নিশ্চয় না এবং তা হওয়ারও কথা নয়। মূলত এ ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো এ পার্থক্যের সৃষ্টি করছে তা হচ্ছে, সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থার ধরন, চালকদের দক্ষতা, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, চালকদের ওভারটেকিং করার মানসিকতা থাকা, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনগণের সচেতনতার অভাব, ট্রাফিক আইন না মানা প্রভৃতি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কি এভাবেই ঘটতে থাকবে? আর আদালত কর্তৃক এ ব্যাপারে দোষী চালকদের শাস্তি দিলে পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘট আহ্বান করে জনদুর্ভোগ তৈরিসহ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে? এই অবস্থা কোনোভাবেই চলতে পারে না এবং তা মোটেও চলতে দেওয়া যায় না। সুতরাং সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারসহ সবার পক্ষ থেকে অতিদ্রুত সমাধানের পথ খুঁজে বের করাসহ তার বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনে রাখতে হবে, সড়ক দুর্ঘটনা অপ্রতিরোধ্য কোনো কঠিন বিষয় নয়। এ জন্য দরকার ইতিবাচক চিন্তা, সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণসহ তার যথাযথ বাস্তবায়ন। সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম যে বিষয়গুলো দায়ী হিসেবে পরিলক্ষিত হয় তা হচ্ছে, সঠিক পরিকল্পনাহীন অনুপযুক্ত সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ, নির্দিষ্ট লেন ধরে গাড়ি না চালিয়ে সড়কের মধ্যখান দিয়ে চালকদের গাড়ি চালানো, রাস্তায় বিপজ্জনক বাঁক থাকা, রাস্তার ত্রুটিপূর্ণ নকশা থাকা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চালানো, চালকদের বেপরোয়া গতিসহ ভুলপথে বেপরোয়া যান চালানো, বেশি গতির গাড়িগুলোর অপেক্ষাকৃত কম গতির ছোট গাড়িগুলোকে ওভারটেকিং করার মনোভাব থাকা, রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী পথচারীদের ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, রাস্তার ফুটপাত ব্যবহার না করে রাস্তার মধ্যখান দিয়ে চলাচল করা, রাস্তা পারাপারের জন্য ওভারব্রিজ থাকলেও তা ব্যবহার না করে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হওয়ার মানসিকতা থাকা, রাস্তা ও ফুটপাতে দোকানপাট সাজিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা, দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ট্রাফিকব্যবস্থা, রাস্তায় চলাচলের জন্য যে সুনির্দিষ্ট নিয়ম-রীতি রয়েছে তা না মানার প্রবণতা থাকা ইত্যাদি। অবিলম্বে এসব অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানোর পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চালকদের হতে হবে বেশি দক্ষ, হতে হবে সতর্ক। পাশাপাশি গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বলা, মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে গাড়ি চালানোর বিষয় পরিহার করাসহ চালকদের ‘ওভারটেকিং’ করার মানসিকতাও পরিহার করা প্রয়োজন। এ ছাড়া জনগণকেও ট্রাফিক আইন ও রাস্তায় চলাচলের আইন-কানুন যথারীতি মেনে চলতে হবে। এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট কঠোরতার সঙ্গে ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ অপরিহার্য। তা ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দেশের সার্বিক সড়কব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানোসহ চালকদের দক্ষতা বিচার করে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে যেন কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি না হয় সে বিষয়টিও নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। আর সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনা বা শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা থাকাও আবশ্যক। এসবের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন গণমাধ্যম, সুধীসমাজ, সরকারসহ আপামর জনগণের একযোগে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসা উচিত। আর উপরোক্ত পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলেই দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো মৃত্যুফাঁদের পরিবর্তে হয়ে উঠবে নিরাপদে চলার পথ; যা আমার, আপনার, সবারই একান্ত কাম্য।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

kekbabu@yahoo.com


মন্তব্য