kalerkantho


কণ্টকাকীর্ণ যাত্রাপথ থেকে শিক্ষা ও শিক্ষার্থীকে রক্ষা প্রয়োজন

এ কে এম শাহনাওয়াজ

৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



কণ্টকাকীর্ণ যাত্রাপথ থেকে শিক্ষা ও শিক্ষার্থীকে রক্ষা প্রয়োজন

কালের কণ্ঠ ‘আজকের লেখাপড়া’ বিষয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এগুলোর শিরোনাম যথাক্রমে ‘চাকরি জোটে না উচ্চশিক্ষায়’, ‘মুখস্থে ভর করেই বিশ্ববিদ্যালয় পার’ ও ‘মানহীন কারিগরি শিক্ষায় বাড়ছে অদক্ষ কর্মী’। এই তথ্যসমৃদ্ধ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো উপস্থাপন করেছেন শরীফুল আলম সুমন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষা কারিকুলাম নিয়ে একটি নৈরাজ্য চলছে অনেক দিন থেকে। এ দেশে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাই যেন রাজা। অনেকটা অনৈতিহাসিকভাবে ইতিহাস লেখার মতো। ইতিহাস বিশেষজ্ঞদের অভিমত, কালে কালে ইতিহাসের নানা ঘটনা সৃষ্টিতে রাজনীতিকদের ভূমিকা থাকে। আর এসব ঘটনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে ইতিহাস নির্মাণ করেন ইতিহাসবিদরা। রক্ষণশীল ইতিহাসবিদরা এ কারণেই বলেন, একমাত্র পেশাজীবী ইতিহাসবিদরাই ইতিহাস লিখবেন। কারণ ইতিহাস লিখনপদ্ধতি—বিশেষ করে ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই করে উপস্থাপনের প্রশিক্ষণ ইতিহাসবিদেরই থাকে। অন্যরা ইতিহাস লিখলে ইতিহাসের শব ব্যবচ্ছেদ হয়ে যায়।

অথচ আমাদের দেশে ইতিহাসের ঘটনা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখেন রাজনীতিকরা আবার ক্ষমতার জোরে তাঁরাই ইতিহাস লিখে ফেলেন। ফলে প্রায়ই ইতিহাসের ঘরে লালবাতি জ্বলে।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাপনায়ও এমনই বাস্তবতা আমরা সাম্প্রতিককালে দেখতে পাচ্ছি। শিক্ষাবিদ—বিশেষ করে দীর্ঘকাল শিক্ষা গবেষণায় যাঁরা যুক্ত ছিলেন তাঁরা সুচিন্তিত মতামত প্রকাশের সুযোগ তেমন পান না। কখনো কখনো আমলা বিশেষজ্ঞ হয়ে যান। এরও কারণ আছে, বিদেশে শিক্ষাবিষয়ক সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে শিক্ষক-গবেষকের যাওয়ার কথা থাকলেও ক্ষমতার জোরে এসবে আমলারাই চলে যান বেশি। প্রমোদভ্রমণের পাশাপাশি যেটুকু জ্ঞান আহরণ করেন তাতে নিজেকে বিশেষজ্ঞ বিবেচনা করতে থাকেন। এই আধাখেঁচড়া জ্ঞানকে তাঁরা ক্ষমতার দাপটে কারিকুলামে প্রয়োগ করেন। নৈরাজ্যটি শুরু হয় সেখান থেকে। শুনেছিলাম, শিক্ষানীতিতে জেইসি পরীক্ষার কথা থাকলেও পিইসির কথা ছিল না। একজন ক্ষমতাশালী আমলা নাকি ক্ষমতার দাপটে তা ঢুকিয়ে দেন। শিক্ষাবিদদের এখন এ ক্ষেত্রে অবসর নেওয়ার দশা। হাস্যকর হলেও এ কথা শুনতে হয় আগেকার বৃত্তি পরীক্ষার বিকল্পে নাকি পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষার বিধান রাখা হয়েছে।

শুরুতে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বাস্তবতায় আমাদের অনেক কিছু ভাবার অবকাশ তৈরি করেছে। এ দেশের সব শিক্ষার্থীকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে কেন? ইউরোপের দেশগুলোতে ইন্টারমিডিয়েট পর্যায় পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষা শেষ করে নিজের ইচ্ছা ও রুচি অনুযায়ী বিভিন্ন ট্রেড কোর্স আর ডিপ্লোমা করে কর্মজীবনে চলে যায়। খুব সামান্যই যারা গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থাকতে চায় তারা ভর্তি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অনেক বেশি ব্যয়সাধ্য সেখানে।

আমাদের দেশেও সীমিতভাবে কারিগরি শিক্ষার সুযোগ আছে। কিন্তু এর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠে এসেছে কালের কণ্ঠ’র প্রতিবেদনে। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হুট করে মানসম্মত পাঠদানের পরিবেশ তৈরি করতে পারে না। এখানে পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষক, পরিচালনা পরিবেশ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রশ্নটি জড়িয়ে আছে। আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার তো সীমা নেই। এমন প্রশ্ন এলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক একটি উদাহরণ আমার যুক্ত করতে ইচ্ছা করে। প্রায় ৪০ বছর আগের কথা বলছি। তখন বিশ্ববিদ্যালয় নবীন। অল্প কটি বিভাগ আর অল্প কটি হল। আলবেরুনী হলের ছাত্র আমি। এটি ছাত্রদের প্রথম হল। যেকোনো হলের চেয়ে এর নির্মাণশৈলী আলাদা। চারটি ব্লকে আলাদা আলাদা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। একেক দিকে চারটি করে কক্ষ আর একটি করে উঠোন। বোঝা যায় একটু বেশি অর্থ খরচ হয়েছে এ হল বানাতে। কিন্তু মুশকিল হতো বর্ষাকালে। মুষলধারায় বৃষ্টি হলে ছাদে এক হাঁটু পানি জমে পুকুর হয়ে যেত। পানি বেরোনোর কোনো পথ রাখা হয়নি। চিলেকোঠার দরজা ঠেলে পানি নেমে ভাসিয়ে দিত হল। জেনেছি, শীতপ্রধান শুষ্ক কোনো দেশের মডেল হুবহু ব্যবহার করা হয়েছে এখানে। এ দেশের জলবায়ুকে বিবেচনায় আনা হয়নি। পানি নামার পাইপ ছিল না ছাদে। তাই এ বিপত্তি।

এ দেশের প্রাথমিক শিক্ষাও হয়ে গেছে তেমন। দেশের আনুষঙ্গিক নানা বাস্তবতা ভুলে বিদেশি মডেল অনুকরণ করে সব কিছু না ঘরকা না ঘাটকা করে ফেলছি। সংশ্লিষ্ট বয়সসীমার শিক্ষা গবেষণায় যুক্ত প্রাজ্ঞ মানুষের পরামর্শ গুরুত্ব না পেয়ে বিষয়সংশ্লিষ্ট নন অথচ নামি কেতাদুরস্ত শিক্ষক, আমলা, প্রভাবশালী ‘রাজনৈতিক’ বিশেষজ্ঞ বিদেশ ঘুরে এসে বা রুদ্ধদ্বারে সভা করে নীতি প্রণয়ন করে ফেলেছি। ফলে অবয়ব দেখছি ভালো; কিন্তু অধিক বর্ষণে সব ভাসিয়ে নিচ্ছে।

অদ্ভুত সব নীতি চাপিয়ে কেড়ে নিচ্ছি শিশুর শৈশব। ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র’ হওয়ার সুযোগ নেই এ সময়ের শিশুদের। প্রকৃতিকে দেখার সুযোগ কোথায় তাদের। ঢাকার এক নামি স্কুলে (ইংরেজি মাধ্যম নয়) ক্লাস ওয়ানে পড়া এক ছাত্রীর মা দুঃখ করে বলছিলেন, আপনারা তো প্রথম শ্রেণিতে পড়তে পড়তে আর খেলতে খেলতে বেড়ে উঠেছিলেন। ওদের খেলার সময় নেই। মেয়েটির প্রধান পাঠ্য বিষয় পাঁচটি। আরো পাঁচটি অতিরিক্ত ইংরেজি বই। বাধ্য হয়ে এই বয়সে ওকে প্রাইভেট শিক্ষকের কাছেও যেতে হয়। এত চাপে ওর বিষণ্ন চেহারা দেখে খুব কষ্ট হয় মায়ের। চাপ সামাল দিয়ে এই শিশুদের জ্ঞান অর্জন সম্ভব হয় না। পরীক্ষায় উগরে দিয়ে আসে। নতুন ক্লাসের চাপে আগের দুঃসহ স্মৃতি সব ভুলে যায়। দুর্ভাগ্য এসব শিক্ষার্থীর—শিক্ষা যে আনন্দের বিষয় তা জানা হলো না।

এরপর আবার ছকবন্দি সৃজনশীল প্রশ্নের চাপ তো আছেই। স্কুল শিক্ষক আমার এক ছাত্রী সেদিন আমার পরামর্শ চাচ্ছিল একটি বই লেখার জন্য। স্কুলে বাচ্চাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তৃতা বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য ১০০টি বিষয় ও এক পৃষ্ঠা করে বক্তৃতা লিখে বইটি প্রস্তুত করতে চায়। আমি হেসে বললাম, ছাত্র-ছাত্রীদের মেধাচর্চা করে সৃজনশীলতা প্রকাশের বদলে এখন তো গাইডই পড়তে পারছে। তুমি এখন উপস্থিত ক্ষেত্রে কথা বলার ক্ষমতাটাকেও হরণ করতে চাও? আমি তো দেখছি পরীক্ষা আর বইয়ের চাপ শিশুদের স্বাভাবিক সৃজনশীলতা তৈরির জায়গাটিই নষ্ট করে দিচ্ছে। এই শিশুই তো একটি ছককাটা বলয়ে ঘুরতে ঘুরতে এ ও এ প্লাস পেয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ি দিচ্ছে। ফলে কালের কণ্ঠ’র প্রতিবেদনে যখন ‘চাকরি জোটে না উচ্চশিক্ষায়’, ‘মুখস্থে ভর করেই বিশ্ববিদ্যালয় পার’ ধরনের বাস্তবতা তুলে ধরা হয় তখন অবাক হওয়ার অবকাশ থাকে না। গোড়ায় গলদ রেখে মস্তিষ্কের উর্বরতা আশা করব কেমন করে!

অসুস্থ রাজনৈতিক অক্টোপাস এখন কফিনে শেষ পেরেক মারছে বিশ্ববিদ্যালয়ে।

আমাদের ক্ষমতাপ্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর বিশ্বাস, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ও ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আধিপত্য বজায় রাখতে হবে। তাই এখন এখানে জ্ঞানচর্চা আর জ্ঞান সৃষ্টির বদলে পেশিশক্তি প্রদর্শন ও কূটকৌশল চর্চা হচ্ছে বেশি। বাহ্যত যতই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থাকুক, কুশলী চালে পাণ্ডিত্যের বিচারে নয় এ সময় রাজনৈতিক যোগ্যতা আর আনুকূল্যের বিচারে অনেক ক্ষেত্রে উপাচার্য নিয়োগ হচ্ছে। তাঁরা নিয়োগকর্তাদের আদেশ মানতে বাধ্য। তাই নতুন শিক্ষকের জন্য সতর্কভাবে নিয়োগ কমিটি গঠন করে। সেখানেও বিষয়-অভিজ্ঞ নিরপেক্ষ শিক্ষকের জায়গা নেই। প্রায়ই দলীয় আজ্ঞাবহ শিক্ষকদের অধিকাংশ সময় বেছে নিতে হয়। ফলে রাজনৈতিক রংবিহীন মেধাবী আর মননশীল তরুণের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে গেছে। এভাবে জ্ঞান সৃজনের কেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় এর গরিমা হারিয়ে হয়ে পড়ছে ম্লান-বিবর্ণ। এসব কারণেই সম্ভবত এখন নবীন শিক্ষকদের অনেকের জ্ঞানচর্চায় একনিষ্ঠ হওয়ার আগ্রহ নেই। রাজনৈতিক গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা নিয়ে অহর্নিশি ব্যস্ত থাকতে হয়। এ কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ক্লাস না নেওয়া মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। নিজেদের একাডেমিক দুর্বলতার কারণে শিক্ষক ক্লাসে সপ্রতিভ হতে পারছেন না। ছকবাঁধা প্রশ্নে পরীক্ষার বৈতরণী পার করাচ্ছেন শিক্ষার্থীদের। ফলে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থী মুখস্থ বিদ্যার জোরেই বিশ্ববিদ্যালয় পার হচ্ছে। তাদের পরবর্তী সময় জাতির বোঝা হওয়ার অবকাশই থেকে যায়।

ফিরে আসি কালের কণ্ঠ’র প্রতিবেদনের অসোয়াস্তিতে। তবে উচ্চশিক্ষায় চাকরি না জোটার সবচেয়ে বড় কারণ প্রার্থীর তুলনায় চাকরির সীমিত সুযোগ থাকা। অসংখ্য প্রার্থীর মধ্যে ২ থেকে ৫ শতাংশেরই চাকরি পাওয়ার সুযোগ থাকে। উল্লিখিত শিক্ষা সংকটের পরও নিজ চেষ্টায় অন্তত ৫ থেকে ১০ শতাংশ মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী জীবনযুদ্ধে নিজেদের প্রস্তুত রাখে। তার পরও চাকরির নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব ও অবৈধ তদবিরে এ জায়গার আসনসংখ্যাও কাটা পড়ে যায়। অর্থাৎ সামগ্রিক নৈরাজ্য থেকে কোনো মহলই বাদ পড়ছে না।

শিক্ষাক্ষেত্রে হাজারো নৈরাজ্যে এখন অশনিসংকেতই শুধু দেখতে পাচ্ছি। দু-চারজন মেধাবী শিক্ষার্থীর সাফল্য আমাদের আশাবাদী করে ঠিকই, কিন্তু সার্বিক চিত্রটি নৈরাশ্যের কথাই শোনায়। আমাদের মনে হয়, সব সংকটের মূলে রয়েছে অসুস্থ রাজনীতির অমার্জিত খেলা আর নীতি নির্ধারণে অপাত্রের দাম্ভিক পদচারণ। শিক্ষা ভাবনা ও নীতি নির্ধারণ যথাযোগ্য শিক্ষক-গবেষকদের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে। এক এক ক্ষমতাবানের ভাইরাসাক্রান্ত গবেষণাগারে গিনিপিগ হওয়ার হাত থেকে আমাদের শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে হবে। স্বাভাবিকভাবে মেধাচর্চার সুযোগ পেলে আমাদের সন্তানরা সব ক্ষেত্রেই নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে পারবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

 

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com


মন্তব্য