kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো । ধারাবাহিক

পরিবারের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত ইউসুফ (আ.)

৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



পরিবারের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত ইউসুফ (আ.)

১০০. সে [ইউসুফ (আ.)] তার মাতা-পিতাকে উচ্চাসনে বসিয়েছে। তারা সবাই তার সম্মানে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে।

সে বলল, হে আমার পিতা! এটিই আমার আগের স্বপ্নের ব্যাখ্যা। আমার প্রতিপালক তা সত্যে পরিণত করেছেন। অবশ্যই তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, (বিশেষভাবে) যখন তিনি আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছেন এবং শয়তান আমার ও আমার ভাইদের সম্পর্ক নষ্ট করার পরও আপনাদের মরু অঞ্চল থেকে এখানে এনে দিয়েছেন। আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা তা নিপুণতার সঙ্গে করেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়। [সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ১০০ (প্রথম পর্ব)]

তাফসির : হজরত ইউসুফ (আ.) শহরের বাইরে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের স্বাগত জানিয়েছেন। এ বিষয়ে বর্ণনা ছিল আগের আয়াতে। আলোচ্য আয়াতে মা-বাবার সঙ্গে ইউসুফ (আ.)-এর সাক্ষাৎ-পরবর্তী বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। হজরত ইউসুফ (আ.) তাঁর মা-বাবাকে প্রাসাদের ভেতরে নিয়ে যান।

তিনি তাঁদের রাজকীয় আসনে বসিয়েছেন। কিন্তু তাঁর মা-বাবা ও ভাইয়েরা তাঁকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য সিজদায় অবনত হয়েছেন। এটি ছিল সম্মান প্রদর্শনের সে যুগের রীতি। এ বিষয়ে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘এ সিজদা ছিল কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনসূচক। এটি ইউসুফ (আ.)-এর উদ্দেশ্যে ছিল না, তা ছিল আল্লাহর উদ্দেশ্যেই। ’

তাফসিরের বিভিন্ন কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ইবাদত বা উপাসনামূলক সিজদা প্রত্যেক নবী-রাসুলের শরিয়তেই কেবল আল্লাহর জন্য নির্ধারিত ছিল। আল্লাহ ছাড়া অন্য যেকোনো কিছুর জন্য তা বৈধ ছিল না। তবে সম্মানসূচক সিজদা পূর্ববর্তী বিভিন্ন নবী-রাসুলের শরিয়তে বৈধ ছিল। কিন্তু এটি শিরকের সিঁড়ি হওয়ার কারণে ইসলামী শরিয়তে তা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফের হাদিসে বলা হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা বৈধ নয়। (মা’আরেফুল কোরআন)

পবিত্র কোরআনে এসেছে : ‘নিশ্চয়ই এই মসজিদগুলো (সিজদাগুলো) একমাত্র আল্লাহর জন্য। ’ (সুরা : জিন, আয়াত : ১৮)

ইয়াকুব (আ.) সিজদা থেকে ওঠার পর ইউসুফ (আ.) তাঁর বাবাকে বলেন, ‘বাল্যকালে আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম চন্দ্র-সূর্য ও ১১টি নক্ষত্র আমাকে সিজদা করছে। আজ আমার সেই স্বপ্নই যেন বাস্তবায়িত হলো। চন্দ্র-সূর্য হলো আমার মা-বাবা আর ১১টি নক্ষত্র হলো আমার ১১ ভাই। ’ এরপর হজরত ইউসুফ (আ.) মিসরে তাঁর ঘটনাবহুল জীবনের বিভিন্ন দিক পরিবারের লোকদের খুলে বলেন।

ইউসুফ (আ.)-এর অতীত জীবন তিন ভাগে বিভক্ত। প্রথম পর্বে ভাইদের অত্যাচার ও হত্যাচেষ্টা। দ্বিতীয় পর্বে মা-বাবার কাছ থেকে দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ। তৃতীয় পর্বে কারাগারে কষ্ট। ইউসুফ (আ.) সেই অতীত ঘটনার পরিবর্তে প্রতিটি পর্বে আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করেছেন। যেমন—তিনি কেন কারাগারে গেলেন, কী কষ্ট পেলেন, তা উল্লেখ না করে কারাগার থেকে মুক্তিলাভের কথা বলেছেন। ভাইয়েরা তাঁকে কূপে নিক্ষেপ করে হত্যাচেষ্টা করেছিল। আগেই তিনি তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। এখানে তিনি সে কথা উল্লেখ করেননি। তা ছাড়া দীর্ঘ বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে তিনি শয়তানকে দোষারোপ করেছেন। বাবাকে সম্বোধন করে বলেছেন, আল্লাহ আপনাকে গ্রাম থেকে মিসরে নিয়ে এসেছেন। ইয়াকুব (আ.)-এর বাসভূমি কেনান ছিল অনুন্নত গ্রাম। সেখানে স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনের সুযোগ-সুবিধা কম ছিল। শহুরে জীবনের বাসিন্দা করায় তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। এটাই নবী-রাসুলদের বৈশিষ্ট্য। তাঁরা যেকোনো দুঃখে-কষ্টে শুধু ধৈর্য ধারণই করেন না, সব সময় আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কোনো নবী-রাসুলের জীবনে এমন ইতিহাস নেই, যেখানে তাঁরা আল্লাহর ওপর ক্ষুব্ধ বা অকৃতজ্ঞতাসুলভ কোনো আচরণ করেছেন।

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য