kalerkantho


বাংলাদেশের উন্নয়নের নেপথ্যে

শাকিল আহমেদ ও তৌহিদ এলাহী

৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত প্রাইস ওয়াটার্স কুপারস (পিডাব্লিউসি)  বাংলাদেশকে ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর ৩০তম ধনী দেশের মধ্যে আর ২০৫০ সালের মধ্যে ২৩তম ধনী দেশের মধ্যে থাকার ভবিষ্যদ্বাণী করেছে। এমন খবরে স্বাভাবিকভাবেই গর্বে মন ভরে ওঠে।

আমাদের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে দুর্বার গতিতে। দুই দশক ধরে ৬-এর ওপরে স্থিতিশীল জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার, হাতের নাগালে মুদ্রাস্ফীতি, দেশের উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি, ভোগ বৃদ্ধি, রপ্তানি বৃদ্ধি, কৃষিজ উন্নয়ন প্রভৃতি দেশকে উন্নত দেশের দিকে ধাবিত করছে। কেন এত ধনাত্মক মাত্রা আমাদের প্রায় প্রতিটি খাতে, কী আমাদের জীবনযাত্রার প্রতিটি দিককে এভাবে উৎসাহিত করছে—এসব কিছুর নেপথ্যে কোন শক্তি কাজ করছে তার একটি অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা এ লেখায় বলা হয়েছে।

অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী, আমাদের জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত আমরা সাধারণত দুটি দিক চিন্তা করে নিই। একটি হলো আমাদের ভেতরকার বিভাব বা ইচ্ছা বা উপলব্ধি (Perception), যা বয়সের ও সামাজিক জীবনযাত্রার মান অনুযায়ী আমাদের মধ্যে গড়ে ওঠে। প্রত্যেক মানুষের কোনো কিছু থেকে উপলব্ধি ওই মানুষের চিন্তাচেতনার ওপর নির্ভর করে। যেহেতু মানুষের চিন্তাচেতনা আলাদা, তাই উপলব্ধিও আলাদা। এ কারণে একই সম্পদ ও জ্ঞান থাকার পর মানুষ ভিন্ন জিনিসে বিনিয়োগ করে, একই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকে বিদ্যার আলোয় আলোকিত হয় আর অনেকে শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়ে অন্ধকারেই থেকে যায়। একই কারণে পৃথিবী এত বিচিত্রময়।

আরেকটি দিক হলো মানুষের ক্ষতির আশঙ্কা (Risk)। অনেকে ক্ষতির আশঙ্কা একটু বেশি করে। অনেকে মোটামুটি আশঙ্কা করে। অনেকে কোনো আশঙ্কা না করে অনেক ঝুঁকি নিতে পারে। এটাও আমাদের অভিজ্ঞতা আর পারিপার্শ্বিকতার ওপর নির্ভর করে। এ কারণে অনেকে ঋণ নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে, অনেকে তাদের জমা টাকা থেকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে। অনেকে অলস টাকা থাকা সত্ত্বেও করে না। এখানে প্রথম ধরনের লোকজন হচ্ছে লাভের জন্য খুবই ঝুঁকি নিতে আগ্রহী। দ্বিতীয় ধরনের লোকজন তাদের সাধারণ জ্ঞান অনুযায়ী নিজেদের নিরাপদ রেখে ব্যবসা করে। আর অনেকে লাভ থাকলেও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে চায় না।

আমাদের দেশে প্রথম ধরনের লোকজনের চেয়ে দ্বিতীয় আর তৃতীয় ধরনের লোকজন বেশি। এর প্রমাণস্বরূপ আমরা আমাদের বর্তমান শেয়ারবাজারের কথা বলতে পারি। এখন শেয়ারবাজারে ভালো কম্পানিতে বিনিয়োগ করলে আপনি ব্যাংকে জমা রাখার চেয়ে বেশি লাভ পাবেন অনায়াসে; কিন্তু তার পরও করবেন না, কারণ আমাদের ২০১০-১১ সালের শেয়ারবাজারে ক্ষতির কথা এখনো মনে আছে। ক্ষতির আশঙ্কা মানুষের মধ্যে আসে কোনো ফলাফলের অনিশ্চয়তা থেকে। এখন আমরা দেখেছি, অনেকেই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছে, আবার অনেকে তাদের সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসে গেছে। এত অনিশ্চয়তা থাকলে মানুষের ক্ষতির আশঙ্কাও অনেক বেশি থাকে।

যদি আমরা শেয়ারবাজারের ফলাফলের এমন অনিশ্চয়তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম, তাহলে সবার মধ্যেই এ বাজার সম্পর্কে একটি ইতিবাচক ধারণা জন্ম নিত, আর মানুষ ওখানে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হতো; কিন্তু বিনিয়োগ করত কি না তা আমরা বলতে পারি না। কারণ বিনিয়োগ করাটা মানুষের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। আমরা ক্ষতির আশঙ্কা কমাতে পারি; কিন্তু মানুষের ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এটা করাও যায় না।

আমরা যদি ওই একটি উপাদান ক্ষতির আশঙ্কাকেই ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করতে পারি, আমাদের সব অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব।

যখন কৃষকদের মধ্যে তাদের উত্পাদিত পণ্যের মূল্য নিয়ে কোনো আশঙ্কা থাকে, তাহলে তারা সেই পণ্য কম তৈরি করে। এ ক্ষেত্রে ওই পণ্যের জন্য অন্য যেকোনো দিক, যেমন—উত্পাদন কস্ট, ফলনের ঝুঁকি, এমনকি লাভের হার থেকেও এই মূল্য নিশ্চয়তার দিকটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব উদাহরণস্বরূপ, আমাদের দেশের কৃষকরা ধান চাষ করতে বেশি পছন্দ করে তার একমাত্র কারণ হলো, কৃষিজ পণ্যের মধ্যে ধানের মূল্য অনেকখানি স্থিতিশীল। এ ক্ষেত্রে সরকারের মূল্য স্থিতিশীল রাখার পদক্ষেপগুলো যেমন খোলাবাজারে চাল বিক্রি, ভরা মৌসুমে সরকারিভাবে চাল ক্রয় আর খরা মৌসুমে সরকারিভাবে চাল বিক্রি প্রভৃতি অবশ্যই ভালো ভূমিকা পালন করেছে। এই স্থিতিশীল মূল্যব্যবস্থা কৃষকদের মনে আস্থা তৈরি করে এবং তারা আরো বেশি উত্পাদন করতে আগ্রহী হয়। সুতরাং এই আস্থা আমাদের ধানের উত্পাদনশীলতা অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু অনেক ফসল আছে, যা ধানের চেয়ে বেশি লাভজনক; কিন্তু কৃষকরা তাতে আগ্রহী হয় না, তার অন্যতম প্রধান কারণ ওই ফসলগুলোর মূল্য ধানের মতো স্থিতিশীল না। সরকারের ধানের মূল্য স্থিতিশীল রাখার পদক্ষেপ, সব ফসলের মূল্যের ওপর রাখা সম্ভব না। অর্থাৎ মূল্য স্থিতিশীল রাখার পদক্ষেপ ক্ষতির আশঙ্কা দূর করে আর উত্পাদনশীলতা বাড়ায়।

সরকারি পদক্ষেপ তৈরি করছে জনগণের মনে আস্থা, আর তা বয়ে নিয়ে আসছে সাফল্য। এভাবে প্রমাণিত হয়, কোনো ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য এই আস্থা মূল ভূমিকা পালন করে। তাই আমাদের এই উন্নতির ধারার পেছনেও মূল ভূমিকা পালন করছে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা। সরকারের অবিরত অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি করছে তার বিনিয়োগের সঠিক মুনাফার আস্থা, আর উদ্যোক্তাদের দিচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোগের সাফল্যের আস্থা, যা আমাদের অর্থনীতিকে দুর্বার গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

দেশে বর্তমান উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন কার্যক্রমগুলো যদি দেখি, তাহলে ধারণা আরো পরিষ্কার হবে। পদ্মা সেতু নির্মাণ বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে। গবেষকদের হিসাব মতে, পদ্মা সেতুর নির্মাণ বাংলাদেশের জিডিপি বার্ষিক ১.২৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি করবে। এ পদক্ষেপ পরিবহন, সংরক্ষণ ও যোগাযোগ খাতের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে। আমাদের দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মধ্যে তাদের পণ্য বিক্রির আর সঠিক মূল্যের আস্থা বৃদ্ধি পাবে।

পরিবহন খাতে আরেকটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হচ্ছে মেট্রো রেল । ২০২০ সালের মধ্যে মেট্রো রেলের নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে, প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৬০ হাজার লোক চলাচল করতে পারবে; যা ঢাকা শহরকে অসহনীয় যানজট থেকে মুক্তি দেবে, কর্মঘণ্টা বৃদ্ধি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

রূপপুরে বাংলাদেশের প্রথম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়িত হলে প্রায় দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে যোগ হবে। এতে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা অনেকাংশে দূর হবে। আরেকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হচ্ছে, প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন। সিঙ্গাপুর মডেল ফলো করে সমুদ্রবন্দরের সুবিধা নিয়ে নিজেদের উন্নত করতে পারি। কর্ণফুলী টানেল, শখানেক ইপিজেড, সমুদ্র ও নদীবন্দরগুলোর আধুনিকায়ন বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবে।

এ কার্যক্রমগুলো সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে ‘আস্থা’ তৈরি করেছে।   ক্ষতির আশঙ্কা থেকে মুক্তির আস্থা সহজে তৈরি করা যায় না। কিন্তু খুব সহজে নষ্ট করা যায়। উপরোল্লিখিত শেয়ারবাজারের উদাহরণ এটা প্রমাণ করে। ইতিহাসও তা-ই বলে। সুতরাং  সরকারের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হবে মানুষের মধ্যে এই আস্থাটা বজায় রাখা এবং এ জন্য সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। যদি চলমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং সামগ্রিক এই আস্থার পরিবেশ বজায় থাকে, তাহলে প্রাইস ওয়াটার্স কুপারসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যদ্বাণী ফলে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ বেশি দূরের পথ নয়।

লেখকদ্বয় : শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স, এমবিএ,

আইবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

myshakil@live.com, towheed_elahi@yahoo.com


মন্তব্য