kalerkantho


অগ্নিঝরা মার্চ ও পতাকা উত্তোলন

আ স ম আবদুর রব

২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



অগ্নিঝরা মার্চ ও পতাকা উত্তোলন

বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আর বাঙালি জাতির জীবনে সোনালি দিন হচ্ছে ১৯৭১ সালের মার্চের অগ্নিঝরা দিনগুলো।

নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম আর আন্দোলনের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে একাত্তরের গৌরবময় দিনগুলো আমরা পেয়েছিলাম।

একদিকে বাঙালির নন্দিত নেতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে উজ্জীবিত হয়ে স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়েছে, অন্যদিকে বাঙালির স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার জন্য তত্কালীন ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠে সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে ‘স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস’। বাঙালি জাতির অধিকার ও সংগ্রামকে কেন্দ্র করে এই দুই ধারার কর্মকাণ্ডে শেখ মুজিব ছিলেন অবিসংবাদিত নেতা। ছয় দফা ও ১১ দফাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ এবং মওলানা ভাসানীর সহায়তায় ১৯৬৯ সালে রচিত হয় গণ-অভ্যুত্থান। সে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু জেল থেকে মুক্ত হন এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নিরঙ্কুশ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান পূর্বঘোষিত সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করার পর গর্জে উঠল ছাত্র-জনতা। আমি তখন জগন্নাথ কলেজ ছাত্রসংসদ নির্বাচনের পরিচিতি অনুষ্ঠানে ছিলাম। তবে আমাদের ধারণা ছিল, পাকিস্তানি শাসকরা এ রকম কিছু একটা করতে পারে এবং আমাদের প্রস্তুতিও ছিল। সংসদ স্থগিত—এ ঘোষণা শোনার পরপরই ছাত্র-জনতার এক জঙ্গি মিছিল বের করি।

তত্ক্ষণাৎ কায়েদে আজম কলেজের নাম পরিবর্তন করে সোহরাওয়ার্দী কলেজ রাখা হয়। এ মিছিলে স্লোগান ওঠে ‘ইয়াহিয়ার ঘোষণা—মানি না-মানি না’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর—বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। ছাত্র-জনতার এ মিছিল যখন স্টেডিয়ামে আসে তখন ‘এমসিসি’র ক্রিকেট খেলা চলছিল। আমরা সে খেলা ভণ্ডুল করে দিই এবং মিছিলসহ হোটেল পূর্বাণীতে যাই ও পাকিস্তানি পতাকা পুড়িয়ে দিই। বঙ্গবন্ধু তখন হোটেল পূর্বাণীতে অবস্থান করছিলেন। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আবদুল কুদ্দুস মাখন এক বিশাল মিছিল নিয়ে বায়তুল মোকাররম আসার পর আমরা পল্টন ময়দানে যাই এবং পাকিস্তানপন্থীদের (মাওলানা ফরিদ আহম্মেদের) সভা ভেঙে ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্র-জনতার সমাবেশের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করি। সে মোতাবেক রাতে নিউক্লিয়াসের বৈঠকে ২ মার্চ স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করার সিদ্ধান্ত হয়।

২ মার্চ ১৯৭১

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্র-জনতার এক বিশাল সমাবেশে মুক্তিকামী মানুষের সঙ্গে আমি স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করি। পতাকা উত্তোলন করার সময় জনসমুদ্রে সভাপতিত্ব করেন নূরে আলম সিদ্দিকী। পতাকা উত্তোলন করার সময় পাশেই ছিলেন শাজাহান সিরাজ, আবদুল কুদ্দুস মাখনসহ ছাত্রলীগের অন্য নেতারা।   এই পতাকারও পেছনের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭০ সালের ৭ জুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইকবাল হল (বর্তমান জহুরুল হক হল)। ১১৬ নম্বর কক্ষ। এই কক্ষে বসে স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল আলম খানের পরিকল্পনা ও নির্দেশেই আমি, শাজাহান সিরাজ, কাজী আরেফ আহমেদ, মার্শাল মনি, হাসানুল হক ইনু স্বাধীনতার পতাকা তৈরির পরিকল্পনা করি। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পতাকা তৈরির পরিকল্পনা সব ঠিকঠাক। কিন্তু আমরা কেউ আঁকতে জানি না। তখন সম্ভবত শাজাহান সিরাজ বললেন, কুমিল্লা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শিবনারায়ণ দাস ভালো আঁকতে পারেন। শিবনারায়ণ দাসকে আনা হলো। সবাই মিলে আলোচনা করে পতাকার কাঠামো তৈরি করি। সবুজ জমিনে লাল সূর্যের ভেতর সোনালি রং ও মানচিত্র অঙ্কন করেন শিবনারায়ণ দাস। কামরুল আলম খান খসরুসহ অন্যরা পতাকা নির্মাণে জড়িত ছিলেন।

পতাকা উত্তোলনের পর থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে ওঠে ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ’। এই পরিষদের চার নেতা—নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আবদুল কুদ্দুস মাখন ও আমি ৩ মার্চ পল্টনের জনসভায় ‘স্বাধীন-সার্বভৌম’ বাংলাদেশের কর্মসূচি ঘোষণা করি। ইশতেহারটি পাঠ করেন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে শাজাহান সিরাজ। ইশতেহারের ঘোষণায় বলা হয়—

১. ৫৪ হাজার ৫০৬ বর্গমাইল বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকার সাত কোটি মানুষের আবাসিক ভূমি হিসেবে স্বাধীন ও সার্বভৌম এ রাষ্ট্রের নাম ‘বাংলাদেশ’।

২. স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ সংগীতটি ব্যবহৃত হবে।

৩. উপনিবেশবাদী পাকিস্তানি পতাকা পুড়িয়ে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে হবে।

৪. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক।

৫. ‘জয় বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

এ ছাড়া স্বাধীনতার ইশতেহারে স্বাধীন বাংলা সরকারের কাঠামো, স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন কর্মপন্থা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মকৌশল ও পদ্ধতির দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।

৩ মার্চ ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে স্বাধীনতাকামী ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশের একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু উপস্থিত হন। তাঁর সামনেই স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার পক্ষে চার ছাত্রনেতা—নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ ও আবদুল কুদ্দুস মাখন স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার শপথবাক্য পাঠ করেন। শপথ শেষে ‘জয় বাংলা’ বাহিনীর ডিপুটি চিফ কামরুল আলম খান খসরু আনুষ্ঠানিকভাবে গান ফায়ার ও হাসানুল হক ইনু পতাকা উত্তোলন করেন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হয়।  

মার্চের ৩ তারিখ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিএলএফের চার নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে স্বাধীনতা আন্দোলন বিষয়ে আলোচনা হয়। মার্চের ৪ তারিখে বঙ্গবন্ধু বিএলএফের চার নেতা সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদকে ডেকে ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে গঠিত আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড সম্পর্কে অবহিত করেন। বঙ্গবন্ধু জানান, তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড গঠিত হয়েছে। ৫ মার্চ ৭ মার্চের ভাষণের বিষয় নিয়ে প্রথমে বিএলএফের হাইকমান্ড সিরাজুল আলম খানসহ চার নেতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আলোচনা হয়। ৬ মার্চ রাত ১২টায় বিএলএফ ‘হাইকমান্ড’-এর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আবার আলোচনা হয়। সেদিন গভীর রাতে ৭ মার্চের ভাষণ বিষয়ে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়।

পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা, ৭ মার্চের ভাষণের নির্দেশনা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র ভিত্তি রচিত হয়েছে। এর পরও ঘোষণার আর কি বাকি থাকে? কিভাবে রাষ্ট্রের নামকরণ বাংলাদেশ নির্বাচিত হলো, কিভাবে জাতির আত্মপরিচয় ও পতাকা নির্মিত হলো, কিভাবে জাতীয় সংগীত নির্ধারিত হলো, কিভাবে বঙ্গবন্ধুকে সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করা হলো, কারা জয় বাংলা স্লোগান নির্ধারণ করেন, কিভাবে বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রদান করা হয়—এগুলো অনেকেরই জানা নেই।

বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে ‘আর আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলা’র আহ্বান জানিয়েছেন। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ সুতরাং জাতির অসহযোগ আন্দোলনকে সশস্ত্র আন্দোলনের দিকে নিয়ে যায়। জাতির এই লৌহকঠিন ঐক্যবদ্ধ প্রস্তুতির কারণেই তখনকার সেনাবাহিনী থেকে বিদ্রোহ করেন বাঙালি বীর সন্তানরা, এমনকি সুদূর পাকিস্তান থেকেও মৃত্যুকে উপেক্ষা করে সেনাবাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। জনগণের অন্তরাত্মার প্রস্তুতি অনুভব করেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বিদ্রোহ করার নৈতিক শক্তি তাঁরা পেয়েছেন।

জাতিভিত্তিক একটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় রাজনৈতিক সংগ্রাম ও জাতির সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, ‘নিউক্লিয়াস’ ও ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড, গণতান্ত্রিক ও সশস্ত্রযুদ্ধের বীরত্বব্যঞ্জক ঘটনাবলি ও ত্যাগের ইতিহাসকে গোপন করে রাখাই হবে অপকৌশল। অগ্নিঝরা মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের সময় দিনের প্রতিটি ঘণ্টা, প্রতি ২৪ ঘণ্টা ও যতই ২৬ মার্চ ঘনিয়ে আসছিল ততই তখনকার জনগোষ্ঠীর মধ্যকার ছাত্র-যুবসমাজের অদম্য ও সাহসী প্রত্যয় সব কিছু অতিক্রম করে স্বাধীনতার জন্য শেষ লড়াই সশস্ত্রযুদ্ধ সংগঠিত করার প্রস্তুতি নিয়েছিল, তা-ও প্রকাশিত হওয়া প্রয়োজন। ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসের পরিবর্তে ‘বিএলএফ’ ও ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ’-এর পক্ষ থেকে প্রতিরোধ দিবস পালিত হয় এবং সারা দেশের ঘরে ঘরে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলিত হয়। আমরা ছাত্ররা ভোরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ছাদে, হাইকোর্ট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পতাকা উড়িয়ে দিই। দুপুরে জয় বাংলা বাহিনীর পক্ষে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর হাতে স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলে দিই। ২৩ মার্চ গভীর রাতে ‘নিউক্লিয়াস’ ও ‘বিএলএফ’-এর নেতাদের চার ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক হয়। পরদিন ২৪ মার্চ সকালে অনির্ধারিতভাবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়ার বৈঠকের জন্য তত্কালীন গণভবনে বঙ্গবন্ধু রওনা হন। আমি গাড়ির এক পাশে কালো পতাকা আর অন্য পাশে স্বাধীন বাংলার পতাকা বেঁধে দিই।

২৫ মার্চের ভয়াল রাত

২৫ মার্চ বাঙালি জাতির জীবনে এক ভয়ংকর রাত। গভীর রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কটি হলে নির্বিচারে হত্যা চালায়। রোকেয়া হল ও শামসুন নাহার হলে ছাত্রীদের ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন। রাজারবাগে নির্মমভাবে হত্যা করে বাঙালি পুলিশ সদস্যদের। নিরস্ত্র বাঙালি সশস্ত্র হয়ে ওঠে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীন-সার্বভৌম ‘জাতি-রাষ্ট্র’ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ।

লেখক : রাজনীতিবিদ


মন্তব্য