kalerkantho


জেনি টোলির ‘লেডি জাস্টিস গল্প’

সাব্বির খান

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



জেনি টোলির ‘লেডি জাস্টিস গল্প’

‘জেনি টোলি’ আমার এক গ্রিক বান্ধবী। সে ২০০০ সালে অতিথি ছাত্রী হিসেবে সুইডেনের অরেব্রু ইউনিভার্সিটিতে এসেছিল ‘আইন’ পড়তে। এক অনুষ্ঠানে পরিচয়। তারপর অনেকবার দেখা হয়েছে। একসঙ্গে ক্যাফেতে আড্ডা দিয়েছি। সে গ্রিক রান্না করে খাইয়েছে, আমিও বাঙালি খাবার খাইয়েছি। কখনো তাকে সুইডিশ ভাষা থেকে অনুবাদ করে বিভিন্ন বিষয় বুঝিয়েছি। সে-ও সুযোগ পেলেই আমাকে আইন বোঝাত। এভাবেই একটু একটু করে বেশ সখ্য গড়ে উঠেছিল আমাদের মধ্যে। আমার সাবজেক্ট আইন না হলেও বন্ধুত্বের জন্য তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

জেনির সঙ্গে অনেক আলাপ হলো সেদিন ফোনে।

আলাপের একপর্যায়ে গ্রিসের পৌরাণিক বিভিন্ন গল্পের কথা জানতে চাই তার কাছে, বিশেষ করে লেডি জাস্টিসের কথা। আমি জানতে চাই, লেডি জাস্টিস কি মূলত একটি ধর্মীয় অনুভূতি থেকে সৃষ্টি, নাকি সম্পূর্ণ প্রতীকী অর্থে তাঁকে বিবেচনা করে গ্রিকবাসীরা। আমি জানতে চাই, কেন বিশ্বের সাতটি মহাদেশের প্রায় সব বিচার বিভাগে জাস্টিস লেডির ভাস্কর্য অথবা ছবি শ্রদ্ধার সঙ্গে রাখা হয়। আমার এ প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর না দিয়ে সে কিছুটা ঘুরিয়ে গভীর থেকেই বলার চেষ্টা করে। তার বর্ণনায় উঠে আসে এমন এক ভাবাবেগ, যাকে ঐশ্বরিকও বলা যাবে না, আবার রূপকথা বললেও ঢালাও বলা হবে। জেনির আবেগে লেডি জাস্টিস তাঁদের আদি বাপ-দাদার বংশধরের মতো মনে হয়, যাঁদের অবদান গ্রিকরা কৃতজ্ঞতা আর শ্রদ্ধার সঙ্গেই আগলে রাখে!

লেডি জাস্টিস মূলত দেবী থেমিস নামেই পরিচিত ছিলেন। গ্রিক ভাষায় থেমিস শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘অর্ডার’। তাঁর নামের ভিন্নার্থে ‘সুবিচারও’ বোঝানো হয়ে থাকে। আধুনিক বিশ্বের আইন ও আইন ব্যবস্থা তাঁর কাহিনি ও ভাবধারা থেকেই উদ্ভূত হয়েছে। পুরাণের বর্ণনায় তাঁর উত্থান বর্ণিত হয়েছিল খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৮০০ বছর আগে টাইটান নামের এক দেবতা হিসেবে। সে সময় সব দেব-দেবীই আইনের সিদ্ধ পথে ক্ষমতার অধিকারী হতেন এবং প্রাকৃতিক বা জাগতিক বিশ্বের ক্রমানুসারে থেমিস ছিলেন সেই অর্থে একজন ‘দেবী’। অর্থাৎ তাঁর আদেশে ও আয়োজনেই ঘটত ঋতুর পরিবর্তন, যেমন শীতের পরে গ্রীষ্ম, গ্রীষ্মের পরে বসন্ত ইত্যাদি। তিনি চাষাবাদ, যুদ্ধ, প্রেম, বিবাহ ইত্যাদি বিষয়ের ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়া ছাড়াও সব ধরনের করণীয়র ব্যাপারেও বলতেন।

মজার ব্যাপার হলো, ঐতিহ্যগতভাবে প্রাচীনকালের পুরুষাধিপত্য বিরাজমান একটা সমাজব্যবস্থায় থেকেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ‘একজন’ ও ‘ভবিষ্যদ্বাণী, পরামর্শ ও আইনবিষয়ক’ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী অত্যন্ত ক্ষমতাধর কর্তৃপক্ষীয় একজন একচ্ছত্র অধিপতি। তাঁর সময়ে তিনিই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি, যিনি আইন ও প্রকৃতির ব্যাপারে সর্বেসর্বা ও সর্বশেষ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ। তাঁর ওপরে কথা বলার কেউ ছিলেন না। তাঁর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পরে প্রভাবিত করেছিল অনেক কাল্পনিক গল্পের দেব-দেবীদেরও, যার নজির দেখতে পাওয়া যায় প্রায় ২২ খ্রিস্টাব্দে রোমান মুদ্রায়, যেখানে তিনি ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হন।

এ পর্যন্ত বলার পর আমি জেনিকে থামিয়ে জানতে চাইলাম, লেডি জাস্টিসের যে ভাস্কর্য আমরা আধুনিক বিশ্বে দেখতে পাই, সেটা কি অরিজিন্যালি লেডি জাস্টিসের? নাকি শিল্পীর কল্পনাপ্রসূত কোনো শিল্পকর্ম! জেনি হেসে উত্তর দিয়েছিল, “আসলে একজন শিল্পীর গবেষণার জন্য যে চাক্ষুষ কিছু বিষয়ের প্রয়োজন হয়, সে ধরনের কিছু তো অবশ্যই ছিল এবং তা খ্রিস্টের জন্মের বহু আগে থেকেই। গবেষণার ক্ষেত্রে থেমিসের ‘আপন বোন অথবা সৎ বোন’ নিরূপণটাই ছিল গবেষকদের জন্য মূল চ্যালেঞ্জের বিষয় এবং এ জন্য গবেষকরা প্রথমত আফ্রোদিতি বা গ্রিকদের প্রেমের অধিষ্ঠাত্রী দেবী নির্ণয়ের বিষয়টিই মুখ্য হিসেবে ধরে কাজ শুরু করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে একাধিক পন্থায় একজন গবেষক আফ্রোদিতি বা গ্রিকদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। প্রাচীন আফ্রোদিতি বা গ্রিকদের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর অসংখ্য ভাস্কর্য ও চিত্রকলা রয়েছে খ্রিস্টের জন্মের বহু আগে থেকেই, যার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে প্রায় একই বা কাছাকাছি সাদৃশ্যের একটা অবয়ব কল্পনা করা ও সেরূপে ভাস্কর্য নির্মাণ করাই ছিল শিল্পীর সৃজনশীলতা তুলে ধরার মূল চ্যালেঞ্জের চাবিকাঠি। শিল্পী এ ক্ষেত্রে কতটুকু সফল হয়েছিলেন তা আমরা দেখতে পাই আধুনিক বিশ্বে থেমিস বা লেডি জাস্টিসের যে ভাস্কর্য রয়েছে তার গ্রহণযোগ্যতা ও কদরের ওপরে। ” ‘আমার মনে হয়, লেডি জাস্টিসের যে অবয়ব আমরা ভাস্কর্যে দেখতে পাই, হাজার হাজার বছর আগের লেডি জাস্টিস ছিলেন তাঁর চেয়েও অনেক সুন্দরী’, বলে জেনি বিরতি নেয়। জেনির টিপ্পনীর সুরে বলা শেষের কথাটার ব্যাখ্যা জানতে চাইলে সে উত্তর দিল, “আদ্যিকালের পুরুষতান্ত্রিক একটি সমাজে একজন ন্যায়বিচারক নারীর কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা কি দৃষ্টান্ত হিসেবে ‘অপূর্ব’ নয়!” টিপ্পনী বুঝতে পেরে আমিও হেসে দিই।

এ বিষয় নিয়ে আরো কিছুক্ষণ আলাপ করি আমরা। লেডি জাস্টিসের ভাস্কর্যের গঠনাকৃতি নিয়েও আলাপ হয়। এ ব্যাপারে জেনির জ্ঞান ও পড়াশোনা আমাকে অবাক করে। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যাই—Contraposto হচ্ছে মানব দেহের বা অবয়বের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য ভর বা ওজন। খ্রিস্ট জন্মের ৩৬০ বছর আগে গ্রিক ভাস্কর পলিক্লেইটোস ভাস্কর্য নির্মাণের ক্ষেত্রে এই ভারসাম্যজনিত ওজন নির্ণয়ের দক্ষতা অর্জন বা আবিষ্কার করেছিলেন, যার সফল প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই থেমিসের ভাস্কর্য নির্মাণের ক্ষেত্রে। জেনি বেশ উৎসাহ নিয়ে আমাকে বলতে থাকে, লেডি জাস্টিসের ক্ষেত্রে দেখা যায় ভাস্কর্যের একটি পায়ে বেশি ভর দেওয়া এবং অন্যটি বেশ কিছুটা রিলাক্সড বা ভারহীন অবস্থায়, যা ভাস্কর্য নির্মাণে অবয়বের ভারসাম্য ধরে রাখা তত্ত্বেরই সুস্পষ্ট নজির বলে প্রতীয়মান হয়। ভাস্কর্যের পেছন দিকটা ও বাহু কিছুটা বাঁকা হয়ে মিশে গেছে একদিকের নিতম্ব ও পায়ের অবস্থান বরাবর, যা লেডি জাস্টিসের অবয়ব ফুটিয়ে তুলেছে সম্পূর্ণ চাপমুক্ত (ঝঃত্বংং-ষবংং) দেহভঙ্গির স্বাভাবিকতায়। তাঁর দেহ ভারসাম্যতা ও দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা বুঝিয়ে দিচ্ছে সুস্পষ্ট ঋজুতা, যেখানে ফুটে উঠেছে একটি ঘূর্ণায়মান বিশ্বের যেকোনো পরিস্থিতিকে সহজভাবে মোকাবিলা করার দৃঢ় প্রত্যয়। দুই পাশে ঝোলানো খোঁপাকৃতির বাঁধা দুটি বেণি মাথার দুই পাশে খুব কাছ থেকে দৃশ্যমান হয়ে আছে। শিল্পীর এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চুলের কম্পোজিশনটি মূলত ‘বিচারিক প্রক্রিয়াকে গোপন না রাখার’ সিম্বল হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি মুখ্য বৈশিষ্ট্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ভাস্কর্যে, যার মধ্যে বাঁধা চোখ, তলোয়ার ও দাঁড়িপাল্লা—তিনটি অত্যন্ত উচ্চ মার্গীয় প্রতীকী সরঞ্জাম। দাঁড়িপাল্লা এ ক্ষেত্রে চিত্রায়িত করে উভয় দিকের ন্যায়বিচারের ভারসাম্যতাকে, যাকে ‘ন্যায়বিচারের মানদণ্ড’ হিসেবেও উল্লেখ করা যেতে পারে। তলোয়ার প্রতিনিধিত্ব করে আইনের কার্যকারিতা প্রয়োগের ব্যবস্থা হিসেবে। বাঁধা চোখ সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত প্রতীক। এর আবির্ভাব ঘটেছিল প্রথমত পনেরো শতকে। বাঁধা চোখের প্রতীকী অর্থ হচ্ছে নিরপেক্ষতা, অর্থাৎ ‘কোনো ধরনের সম্পদ, রাজনীতি, জনপ্রিয়তা বা অখ্যাতি ইত্যাদি দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত প্রদান করা। এভাবেই শেষ হয় লেডি জাস্টিসের আকৃতির ব্যাখ্যাসহ বর্ণনা।

সেদিনের মতো ফোন রেখে দিয়ে আমার মনোজগতে হাতড়ে বেড়াই কিছু প্রশ্নের উত্তর, যা জেনি টোলির পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয় বলে আর জিজ্ঞেসও করিনি। জেনি লেডি জাস্টিসকে গ্রিক সভ্যতার অধুনা সংস্কৃতির আলোকে যেভাবে তুলে ধরেছিল, তা থেকে আমার একটা কথাই বারবার মনে হয়েছে, ‘রূপকের ব্যবহার এই পৃথিবীতে নতুন কিছু নয়। সহজ করে কিছু শিখতে গেলেও রূপকের বহু ব্যবহার আমরা হতে দেখি প্রায় সব ক্ষেত্রেই এবং প্রতিদিন। অথচ একটি আদালতের সামনে ন্যায়বিচারের প্রতীক লেডি জাস্টিসের ভাস্কর্যকে ধর্মীয় আবেগে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য কোনো যুক্তি খুঁজে পাই না। ’ মায়া হয় হাজার বছর আগের কাল্পনিক এক নারীর জন্য। জেনির টিপ্পনীর কথাটা আবারও মনে পড়ে যায়, “আদ্যিকালের পুরুষতান্ত্রিক একটা সমাজে একজন ন্যায়বিচারক নারীর কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা কি দৃষ্টান্ত হিসেবে ‘অপূর্ব’ নয়!” মনে মনে বিড়বিড় করে স্বীকার করি, ‘সত্যিই অপূর্ব!’

 

লেখক : সুইডেনপ্রবাসী সাংবাদিক


মন্তব্য