kalerkantho


উচ্চ আদালতে বাংলা

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ফেব্রুয়ারিতে ‘উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা’ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হবে না—এ যেন কল্পনাতীত বিষয়। তর্কটা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

রূপ পেয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসের অবধারিত চর্চায়। এটা অস্পষ্ট, ঠিক কী কারণে এত তর্ক-বিতর্ক। কারণ বিষয়টির প্রয়োগে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে বৈকি। কিন্তু  সংবিধান বা প্রচলিত আইনে কোথাও অস্পষ্টতা নেই।

সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। এই ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দিতে ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ প্রণীত হয় ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন’।   তাতে  সর্ব ক্ষেত্রে বাংলা চর্চায় বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। বলা হয়, বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া বাংলাদেশের  সর্বত্র তথা সরকারি অফিস, আদালত, আধাসরকারি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান সব ক্ষেত্রে নথি, চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে [ধারা-৩(১)]। ওই বাধ্যবাধকতা উচ্চ আদালতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

কারণ সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ মতে, ‘আদালত অর্থ সুপ্রিম কোর্টসহ যেকোনো আদালত’। ১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭(২) ধারা এবং ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৫৮ ধারা সরকারকে আদালতের ভাষা নির্ধারণের দায়িত্ব দিয়েছে। ১৯৮৭ সালের আইনের  ৩(১) ধারার নির্দেশনা সরকারকে এ দায় থেকে মুক্তি দিয়েছে।

অন্যদিকে সংবিধানের প্রস্তাবনায় মৌলিক মানবাধিকার ও সুবিচারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ৩৫(৩) অনুচ্ছেদ মতে, ‘প্রকাশ্য বিচারলাভ’ ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির মৌলিক অধিকার। আদালতে ইংরেজি চর্চায় কি ওই অধিকার কতটা রক্ষিত হয়? কারণ ইংরেজি না জানা বা না বোঝা আসামির কাছে ‘প্রকাশ্য বিচার’ আর গোপন বিচার তো একই কথা।   আদালতের একটি রায় বা আদেশ একটি জীবনকে বদলে দিতে পারে। একটি পরিবার বা সমাজকে তছনছ করে দিতে পারে। তাই বিচারপ্রার্থী জনগণের অবশ্যই ওই রায় বা আদেশ অনুধাবনের সুযোগ থাকতে হবে। তা ছাড়া  আদালত বা বিচারপ্রক্রিয়া বা বিচারিক আয়োজন—সবই আসছে জনগণের ‘বিচার পাওয়ার অধিকার’কে সমুন্নত ও সুসংহত করতে। শুধু ভাষাগত দুর্বোধ্যতায় সেই বিচারপ্রার্থী জনগণ যদি ওই রায় বা আদেশে বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশাধিকারই না পায়, তবে তা কতটুকু ‘প্রকাশ্য বিচার’? তাতে মৌলিক অধিকারই বা কতটুকু সমুন্নত হয়?

বোধগম্য ভাষায় বিচারলাভ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকারও বটে। বিচারপ্রার্থীর অধিকার সম্পর্কে জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর)-এর ১৪(৩)  ধারায় বলা হয়েছে, ‘কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হলে ওই অভিযোগের প্রকৃতি ও কারণ দ্রুত ও বিস্তারিতভাবে সে বোঝে এমন ভাষায় তাকে জানাতে হবে। আদালতে ব্যবহৃত ভাষা যদি সে বুঝতে বা বলতে না পারে; তবে  তাকে বিনা মূল্যে দোভাষী দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে’। বাংলাদেশ ওই চুিক্ততে স্বাক্ষর করলেও পালনে নেই পূর্ণ ও কার্যকর আগ্রহ।

১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইনের ১(২) ধারায়  আইনটি ‘অবিলম্বে বলবৎ হইবে’ বলা হয়। ৩(২) ধারার ভাষ্য, কর্মরত ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বাংলা ব্যতীত অন্য ভাষায় আবেদন বা আপিল করলে তা বেআইনি ও অকার্যকর গণ্য হবে। ৩(৩) ধারার হুঁশিয়ারি, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এই আইন অমান্য করলে তা হবে অসদাচরণ। তজ্জন্য তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা  ও আপিল বিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাস্তবতা হলো, বিগত ৩০ বছরেও ওই ‘অবিলম্বে বলবৎ হইবে’ বলবৎ হয়নি। মালয়েশিয়ার সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ ও ১৯৬৩ সালের জাতীয় ভাষা আইনের ৮ ধারা মতে, আদালতের আরজি, আপিল, রায়  ইত্যাদি মালয়েশিয়ান ভাষায় লেখা বাধ্যতামূলক। তাই ইংরেজিতে লেখার কারণে ২০০৯ সালের ১০ অক্টোবর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আনোয়ার ইব্রাহিমের দায়ের করা আপিল মালয়েশিয়ার কোর্ট অব আপিল খারিজ করে দিয়েছিলেন। একই বিধান থাকলেও বাংলাদেশের আদালতে এমন ঘটনা এখনো আকাশকুসুম। তা ছাড়া বাংলা ব্যবহার না করার কারণে কোনো কর্মকর্তার শাস্তিও এখানে দিবাস্বপ্নের মতো বিষয়।

বাংলা ভাষা প্রচলন আইনের ৪ ধারা, বাংলা প্রচলনে প্রয়োজনে সরকারকে বিধি প্রণয়ন করতে বলেছে।

আদালতে বাংলার চর্চা দিন দিন বাড়ছে। দিন দিন তা ভাষাবান্ধব হয়ে উঠছে। নিম্ন আদালতে ইংরেজিতে লেখা বা বলার কারণে কোনো কিছুকে ‘বেআইনি’ বা ‘অকার্যকর’ ঘোষণা করা না হলেও;  সেখানে আরজি, আবেদন, আপিল লেখা সাক্ষ্যগ্রহণ-জেরা, সওয়াল-জবাব, যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন, রায় লেখাসহ গোটা বিচার প্রক্রিয়ায় বাংলার ব্যবহার বা প্রতাপই বেশি।

হাইকোর্ট বিভাগ বা আপিল বিভাগে এখনো ইংরেজিতে আবেদন বা আপিল বা রায় লেখা হয়। তবে যুক্তিতর্ক, বক্তব্য উপস্থাপনে আইনজীবী বা বিচারকরা হরদম বাংলা ব্যবহার করছেন। ২০১২ সালে হাইকোর্ট রুলস চালু হওয়ার ৩৯ বছর পর ও বাংলা ভাষা আইন প্রচলনের ২৫ বছর পর; হাইকোর্টে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় দরখাস্ত করার বিধান সংযুক্ত হয় (আপিল বিভাগের রুলস এখনো এ বিষয়ে নিশ্চুপ)। তার ভিত্তিতে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের দাবিতে ইউনুস আলী আকন্দ রিট করেন। ওই আবেদনটি ছিল বাংলায় লেখা। উভয় বিভাগের কার্যতালিকা বাংলায় হলেও নোটিশ ও আদেশ সব এখনো ইংরেজিতে। তবে হাইকোর্টে বিভিন্ন সময় বাংলায় নোটিশ ও আদেশ প্রদানের ঘটনা ঘটছে। এ ক্ষেত্রে মাননীয় বিচারপতি ড. কাজী রেজা-উল হকের  নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের উদ্যোগ ও অবদান দৃষ্টান্তমূলক। সবচেয়ে বড় সমস্যাটা রায় নিয়ে। বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, বিচারপতি কে এম ফজলুর রহমান, সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক বাংলায় রায় লিখে আইনগত দায়িত্ব পালন এবং প্রশংসা কুড়ালেও ওই ধারায় ছেদ পড়েছে। বাংলায় রায় লেখার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে বিচারপতি খায়রুল হক বলেন, সাধারণ মানুষ যাতে এই রায়ের বিষয়বস্তু বুঝতে পারেন। এ নিয়ে চায়ের দোকানে, চুলার পাশে বসেও যাতে আলোচনা করতে পারে। জন মার্শালকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘The Judicial department comes home in its effects to every mans fireside.’

বিচার প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউিট উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৮ সালের ১ মার্চ সর্বস্তরের আদালতে বিচারকরা যাতে নিপুণভাবে বাংলায়  রায় লিখতে পারেন সে জন্য ওই ইনস্টিটিউটকে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন।

সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ন্যায়বিচার যদি সদ্গুণ হয় এবং জনগণের কল্যাণই যদি এর কাজ হয়, তবে তা জনগণের ভাষায়ই হওয়া উচিত’। জানি, অনুবাদ জটিলতা, দক্ষ অনুবাদক বা পর্যাপ্ত পরিভাষার ঘাটতি এ ক্ষেত্রে পথের কাঁটা। কোনো কিছু শুরু করাটাই কঠিন। সেটা আমরা করেছি। আশা করি, সব কাঁটা সরিয়ে আমাদের উচ্চ আদালত ভাষাগতভাবে শিগগিরই জনতার আদালত হয়ে উঠবে।

লেখক : আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট

aftabragib@yahoo.com


মন্তব্য