kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো । ধারাবাহিক

ইউসুফ (আ.)-এর জামা নিয়ে ভাইদের প্রত্যাবর্তন

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ইউসুফ (আ.)-এর জামা নিয়ে ভাইদের প্রত্যাবর্তন

৯৩. তোমরা আমার এ জামাটি নিয়ে যাও এবং তা আমার পিতার মুখমণ্ডলের ওপর রেখো, তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন। আর তোমাদের পরিবারের সবাইকে আমার কাছে নিয়ে এসো।

৯৪. অতঃপর যাত্রীদল যখন (মিসর থেকে) বেরিয়ে পড়ল, তখন তাদের পিতা বলল, তোমরা যদি আমাকে অপ্রকৃতিস্থ মনে না করো, তাহলে বলছি, আমি ইউসুফের ঘ্রাণ পাচ্ছি। (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯৩-৯৪)

তাফসির : আগের আয়াতে আলোচনা করা হয়েছিল, বৈমাত্রেয় ভাইয়েরা হজরত ইউসুফ (আ.)-কে চিনতে পেরে তাদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। ইউসুফ (আ.) প্রতিশোধ নিতে পারেন—এ আশঙ্কায় তারা ভীষণভাবে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু হজরত ইউসুফ (আ.) তাদের সঙ্গে অত্যন্ত বিনম্র আচরণ করেন এবং তাদের পাপ মুক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন।

পিতা ইয়াকুব (আ.) ইউসুফ (আ.)-এর বিরহ-বেদনায় কাঁদতে কাঁদতে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। নিজের পরিচয় প্রকাশের পর ইউসুফ (আ.) ভাইদের বাড়ি ফেরার সময় বলেন, তোমরা আমার এই পোশাকটি নিয়ে বাবার মুখের ওপর রেখে দেবে। এতেই তাঁর দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। তখন তিনি এখানে চলে আসতেও সক্ষম হবেন। তিনি ভাইদের পরিবারের সব সদস্যকে নিয়ে মিসরে চলে আসতে বলেন।

লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, পিতা ইয়াকুব (আ.)-কে নিয়ে আসতে তিনি সরাসরি কিছু বলেননি। তিনি শুধু এটুকু বলেছেন, আমার পোশাকটি বাবার মুখের ওপর রেখে দিলে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন। সরাসরি পিতাকে মিসরে চলে আসার নির্দেশ তিনি দেননি। কেননা সেটাও এক ধরনের শিষ্টাচার পরিপন্থী কাজ। পিতা ইয়াকুব (আ.) মিসরে চলে আসার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা ছিল দৃষ্টিশক্তিহীনতা, এই জামা পাঠানোর মাধ্যমে সেই প্রতিবন্ধকতা দূর হয়।

পিতা ও পুত্রের মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। রক্তের টান বা রক্তের বন্ধন বলে একটা কথা আছে। ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা যখন তাঁর পরিধানের জামা সঙ্গে নিয়ে মিসর ত্যাগ করে, তখন সিরিয়ার কেনান নগরীতে বসে ইয়াকুব (আ.) পরিবারের লোকদের উদ্দেশে বলতে লাগলেন, ‘আমি বুড়ো হয়ে গেছি। দৃষ্টিশক্তিও লোপ পেয়ে গেছে। তোমরা যদি আমাকে বোকা বা অপ্রকৃতিস্থ বলে মন্তব্য না করো, তাহলে শোনো, আমি ইউসুফের ঘ্রাণ পাচ্ছি। ’ মিসর থেকে কেনানের মাঝখানে দূরত্ব বিষয়ে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, তা ছিল ওই সময়ে আট দিনের পথ। হাসান বসরি (রহ.)-এর মতে, ৮০ ফরসখ অর্থাৎ প্রায় আড়াই শ কিলোমিটার। স্বাভাবিকভাবেই লোকজন বলল, ইউসুফের মৃত্যুর এত বছর পর তাঁর বেঁচে থাকার আশা করা বা তাঁর ঘ্রাণ অনুভব করা স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়।

হজরত ইয়াকুব (আ.) আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্বাচিত সম্মানিত নবী ছিলেন।   মোজেজা বা অলৌকিক ক্ষমতাবলে তিনি ইউসুফ (আ.)-এর ঘ্রাণ পেয়েছিলেন। এটি তাঁর ক্ষেত্রে খুবই স্বাভাবিক ছিল। তিনি ডেকে যাদের সামনে এ কথা প্রকাশ করেছিলেন, তারা ছিল সাধারণ মানুষ। সংগত কারণেই তাদের কাছে ইয়াকুব (আ.)-এর এই উপলব্ধি সত্য ও বাস্তবসম্মত মনে হয়নি। ফলে তারা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ইয়াকুব (আ.)-এর এই দাবি শুনে মন্তব্য করে—আল্লাহর কসম, আমরা দেখছি, আপনি এখনো সেই পুরনো বিভ্রান্তিতেই ডুবে আছেন। আপনার ইউসুফ এত দিন কিভাবে বেঁচে থাকে, আর আপনিই বা এখন তাঁর ঘ্রাণ পাচ্ছেন কিভাবে?

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য