kalerkantho


রাষ্ট্রভাষার জন্য সাত দশকের লড়াই

মোস্তাফা জব্বার

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



রাষ্ট্রভাষার জন্য সাত দশকের লড়াই

রাষ্ট্রভাষার দাবিতে রক্ত দেওয়ার বয়স ৬৫ বছর হলেও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি উঠেছিল এখন থেকে ৭০ বছর আগে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পাকিস্তানের জন্মের আগেই ১৯৪৭ সালে সেই দাবি তুলেছিলেন।

এরপর ১৯৪৮ সালে সেটি পাকিস্তানের পরিপ্রেক্ষিতে আরো জোরালো হয় এবং ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়ে আমরা রাষ্ট্রভাষার দাবির স্বীকৃতি পাই। কিন্তু ২০১৭ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিককে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন করতে না পারার জন্য হতাশা ব্যক্ত করতে হয়েছে। ৬৫ বছর আগে স্বীকৃতি পেলেও, বাংলার নামে একটি দেশ প্রতিষ্ঠিত হলেও কার্যত বাংলা কোনো রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হতে পারেনি। ইংরেজির পর উর্দুর সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে যখন বাংলা ভাষাভিত্তিক একটি দেশই আমরা তৈরি করে ফেলেছি, তখন দুনিয়ার একমাত্র বাংলা ভাষাভিত্তিক এই রাষ্ট্রে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পাবে, সেটি অতি স্বাভাবিক বিষয় ছিল। কিন্তু সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেলেও বাংলা জীবনাচারে রাষ্ট্রভাষা হতে পারেনি। বরং এই রাষ্ট্র এখন বাংলা ভাষার বিপরীত স্রোতে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে। রাষ্ট্রভাষার দাবির ৭০ বছর পর এবারের একুশে দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তরুণ প্রজন্মকে ‘বাংরেজি’ না বলার আহ্বান জানিয়েছেন। ইংরেজি উচ্চারণে বিকৃত বাংলা না বলার আহ্বান তাঁর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা শুধু বাংরেজি বলে না, বাংরেজি লেখেও। রোমান হরফে বাংলা লেখার পাশাপাশি রোমান হরফ দিয়ে বাংলায় রূপান্তর করে অশুদ্ধ ও বিকৃত বাংলা লেখা এখন গৌরবের বিষয়। যাঁরা এসব কাজে সহায়তা করেন তাঁদের একুশে পদক দেওয়ার দাবিও ওঠে। সরকারের ভেতরে রোমান হরফে বাংলা লেখার প্রচলন জোরদার হচ্ছে। বাংলা যুক্তাক্ষর কঠিন ও জটিল এবং রোমান হরফ দিয়ে সেটি প্রকাশ করা সহজ—এমন ধারণা নতুন প্রজন্মকে গিলে খাচ্ছে। কার্যত তাদের মানসিক রোগগ্রস্ততার জন্য বাংলা ভাষা ক্রমেই রোমান হরফের দখলে যাচ্ছে। বাংলা ভাষা ও বর্ণমালায় অনীহার বিষয়টি আরো প্রকট নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। উচ্চ আদালতের রায় কবে বাংলায় পাওয়া যাবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিচারকদের ইংরেজি বলা বা লেখাও সম্ভবত তাঁরা নিজেরা টাইপ করেন না বরং কম্পিউটার অপারেটররাই টাইপ করে। বাংলাটা কেন একইভাবে হবে না? অন্যদিকে পুরো জাতিকে এমন একটি ধারণা দেওয়া হচ্ছে যে ইংরেজি না জানলে এই বিশ্বায়নের যুগে দুনিয়াতেই টিকে থাকা যাবে না। সরকার থেকে শুরু করে মা-বাবা-শিক্ষাবিদ-ব্যবসায়ীদের ধারণা ইংরেজি জানলেই বিদ্বান হয় বা স্মার্ট হয়। দেশের চাকরি বাজারের অবস্থাটি এমন মনে করা হয় যে ইংরেজি জানলে চাকরি যেমন দ্রুত জোটে, তেমনি বেতন বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু আমরা জার্মানি-ফ্রান্স-জাপান-কোরিয়া-চীনকে ইংরেজি না জেনেই দুনিয়ায় দাপটের সঙ্গে টিকে থাকতে দেখছি। এমনকি থাইল্যান্ড-ভিয়েতনামও  রোমান হরফের দাসত্ব গ্রহণ করেনি। উত্তর আমেরিকায় স্প্যানিশের দাপট ইংরেজির চেয়ে বেশি। অথচ দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের শিক্ষা-বিচার-বেসরকারি শিল্প-বাণিজ্য বা ধনীদের জীবনধারা রোমান হরফের দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি।

অন্য দেশের কথা বাদ দিলেও আমাদের প্রতিবেশী ভারত রোমান হরফের দাসত্ব করতে গিয়ে চরম জটিল একটি অবস্থায় পড়েছে। ভারতের রাষ্ট্রভাষা কার্যত ইংরেজি। হিন্দির বাইরে প্রাদেশিক ভাষাগুলোকে রাজ্যের ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হলেও ভারতের সব প্রান্তের সব রাজ্যের ভাষা মূলত ইংরেজি। তথ্য-প্রযুক্তি খাতে ভারত ইংরেজি শেখার ওপর আরো বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু ভারতের দুর্ভাগ্য যে ম্যাকেঞ্জি নামের একটি বিশ্বখ্যাত সংস্থা ২০১৭ সালে বিস্ময়কর একটি তথ্য দিয়েছে। তাদের মতে, ভারতে ইংরেজি জানা এই তথ্য-প্রযুক্তিবিদদের জ্ঞানের আয়ু আর মাত্র পাঁচ বছর। পাঁচ বছরে ভারতের তথ্য-প্রযুক্তি জানা মানুষদের অর্ধেক অচল হয়ে যাবে বলে ম্যাকেঞ্জি মনে করে। তাদের ইংরেজি জ্ঞান বেঁচে থাকার সহযোগী হতে পারছে না। ম্যাকেঞ্জির বক্তব্যে এটি স্পষ্ট হওয়া উচিত যে ইংরেজি নয়, প্রযুক্তিগত জ্ঞানই হচ্ছে বিশ্বায়নের দুনিয়াতে টিকে থাকার হাতিয়ার। মাতৃভাষায় সেই জ্ঞান যে সহজে ও দ্রুতগতিতে আয়ত্ত করা যায়, সেটি যত সহজে আমরা অনুভব করব ততই মঙ্গল।

২০১৭ সালে এসে বাংলা নিয়ে আমাদের আশাবাদের জায়গাও রয়েছে। এমন খবরও এবার আমরা জেনেছি যে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ শতাংশতে বাংলা না পড়ানো হলেও বিশ্বের শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার চর্চা হচ্ছে। বিদেশিরা বাংলা শিখছে এবং বাংলা ভাষার গুরুত্ব তাদের নতুন করে এই ভাষা শিখতে আগ্রহী করছে। আমরা জানি, এরই মধ্যে আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওন বাংলা ভাষাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। এসব পরিপ্রেক্ষিতের বাইরেও যে বিষয়টি খুবই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত সেটি হচ্ছে, ঢাকাসহ সারা দেশে ২০১৭ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির অভাবনীয় উদ্যাপন দেখেছি আমরা। বইমেলা বা বর্ণমেলার স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ ছাড়াও বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনার অভাবনীয় বিকাশ ও বিস্তার বাংলাভাষীদের জন্য গর্বের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আমার জানা মতে, এমন অভূতপূর্ব গণজাগরণ এর আগে কখনো দেখা যায়নি। আমরা ১৯৬৯-৭০-৭১-৭২ সালে যেমনটা দেখেছিলাম, এবারের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ যেন সেসবকে ছাপিয়ে গেছে। যদিও আমি ঠিক জানি না এই গণজাগরণের প্রকৃত কারণ কী, তবে এটি আন্দাজ করেছি যে বাংলা ভাষার মর্যাদার লড়াইকে এই বাংলার সাধারণ মানুষ কখনো গুরুত্বহীনভাবে নেয়নি। সাধারণ মানুষের হয়তো এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে পুঁজিবাদ, বিশ্বায়ন ও ষড়যন্ত্রের কারণে বাংলা তার প্রকৃত মর্যাদার আসনটি পায়নি। তারা তাদের আপন অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে চায় না বলেই রাজপথে তাদের সরব অবস্থান। আমার নিজের মতে, বিষয়টির সঙ্গে আরো একটি অনুষঙ্গ যুক্ত বলে মনে করি। সাম্প্রতিককালে বাঙালির ভাষাই শুধু নয়, তার সাহিত্য-সংস্কৃতিও আক্রমণের শিকার হয়েছে। পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রদায়িকীকরণ ছাড়াও জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও পাকিস্তানীকরণের মুখে বাঙালির রুখে দাঁড়ানোর সময় হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই জাগরণটিই হচ্ছে বাংলার জন্য সবচেয়ে বড় আশাবাদের বিষয়। বাংলা ভাষার জন্মের পর থেকেই বিদেশি ভাষা ও লিপির আগ্রাসনের হাত থেকে এই ভাষাভাষী অতি সাধারণ মানুষ তাকে রক্ষা করেছে। লোকে একে প্রাকৃত ভাষা বলে, কারণ প্রাকৃতরাই এর সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী। এই ভাষার ব্যবহারকারী প্রাকৃতদের চাপ যে কত বিশাল সেটি মিডিয়ার দিকে তাকালে অনুভব করা যায়। লক্ষ করুন, ইংরেজি ভাষায়, রোমান হরফে ডজন ডজন টিভি মিডিয়া চালু হলেও, টিভি ও এফএম রেডিওতে বাংলাকে বিকৃত করা হলেও একটি টিভি চ্যানেলও ইংরেজি ভাষায় চালু হতে পারেনি। কেউ তেমন একটি চ্যানেল চালু করার সাহসও পায়নি। এমনকি ইংরেজি পত্রিকার প্রসারও মুখ থুবড়ে পড়েছে। এই বাংলাদেশেই ইংরেজি নিয়ে গড়ে ওঠা চরম অনাচারের মধ্যেও মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত ছাড়া অন্য কোনো সাধারণ মানুষ রোমান হরফকে তার জীবনে প্রবেশই করতে দেয় না।

আমি মনে করি, রোমান হরফের ক্রীতদাসরাও সাধারণ মানুষের কাতারে নেমে আসতে বাধ্য হবে। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত যেমন ইংরেজিতে সনেট লেখার দুঃস্বপ্ন ছেড়ে মাতৃভাষায় ফিরে এসেছিলেন, তেমনি রোমান হরফ ব্যবহারকারীরাও বাংলা বর্ণমালার বুকে আশ্রয় নেবেন। আমি এটিও মনে করি যে তাঁদের উপলব্ধি এমন হবে, বাংলা ভাষার সঙ্গে অন্য যেকোনো ভাষা শেখার কোনো বিরোধ নেই। খুব সংগত কারণেই আমাদের মূল্যায়ন করা দরকার যে আমাদের মাতৃভাষা ৭০ বছর ধরে রাষ্ট্রভাষা হওয়ার লড়াইয়ে জিতবে কেমন করে। আমি কাজটাকে খুব দুরূহ মনে করছি না। সবচেয়ে জরুরি কাজটি করতে হবে সরকারকে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তরসূরি এই সরকার বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষা প্রচলনবিষয়ক নির্দেশ বাস্তবায়ন করলে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার প্রতিষ্ঠার অধিকাংশ কাজই হয়ে যাবে। সরকারের হাতে বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন আইন রয়েছে, সরকারের কাছে বাংলা প্রচলনবিষয়ক আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। সরকারের দায়িত্ব হলো সেই আইন ও নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা। সরকার সক্রিয় হলে সরকারি অফিস-আদালতে বাংলা প্রচলনে কোনো সংকটই থাকবে না। কোনো অজুহাতে যাতে কেউ বাংলাকে ইংরেজির আবরণ দিতে না পারে সেটি সরকারকেই দেখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বাংরেজি বিষয়ক যে আহ্বান জানিয়েছেন তার জন্য সরকারের ভেতরে রোমান হরফে বাংলা লেখার যেসব প্রবণতা রয়েছে তা বন্ধ করতে হবে। ডিজিটাল করার নামে ইংরেজি দিয়ে বাংলাকে স্থলাভিষিক্ত করার চক্রান্ত প্রতিহত করতে হবে। বাংলা হরফ বা ভাষাকে বিকৃত করার কোনো চেষ্টাকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া যাবে না। অন্যদিকে বাংলা প্রয়োগের প্রযুক্তিগত যেসব সংকট রয়েছে তার সমাধানও এখন সরকারের হাতে রয়েছে। গত ৩ জানুয়ারি ২০১৭ তথ্য-প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা উন্নয়নের জন্য প্রথমবারের মতো সরকার ১৫৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্পটি কার্যত বাংলা ভাষার প্রযুক্তিগত সংকটকে প্রায় পুরোই সমাধান করে দেবে। সব ধরনের স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে সব জাতীয় সম্পদকে যদি একত্রিত করে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয় তবে শত শত বছরে ইংরেজি ভাষা যেসব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করেছে তা বাংলাও মাত্র তিন বছরে অর্জন করতে পারবে। প্রধান বিচারপতির কাঙ্ক্ষিত স্পিচ টু টেক্সটও তখন নাগালে চলে আসবে।

আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি যে সরকারের সদিচ্ছায় আমাদের বাংলাকে পরিপূর্ণভাবে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। ২০২১ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ হওয়ার সময়ই ডিজিটাল বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা দাপটের সঙ্গে তার অস্তিত্ব প্রকাশ করতে পারবে।

 

লেখক : তথ্য-প্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট এবং বিজয় কি-বোর্ড ও সফটওয়্যারের প্রণেতা


মন্তব্য