kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো । ধারাবাহিক

মক্কা বিজয়ের দিন মহানবী (সা.)-এর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মক্কা বিজয়ের দিন মহানবী (সা.)-এর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা

৯২. সে [ইউসুফ (আ.)] বলল, আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন এবং তিনি শ্রেষ্ঠতম দয়ালু।

[সুরা : ইউসুফ, আয়াত : (দ্বিতীয় পর্ব)]

তাফসির : ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁকে রক্ষা করেছেন। ভাগ্য তাঁর এতই অনুকূলে ছিল, পরবর্তী সময়ে তিনি মিসরের বাদশাহ হয়েছেন। কিন্তু ক্ষমতা পেয়েও তিনি ভাইদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নেননি। তিনি তাদের শুধু ক্ষমাই করেননি, তাদের জন্য দোয়াও করেছেন। এটাই নবীদের ইতিহাস। এটাই নবীদের আদর্শ। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনেও এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল।

যেদিন মক্কা বিজয় হয়েছিল, মক্কার অধিবাসীরা ভয়ে একেবারে মুহ্যমান হয়ে পড়েছিল।

ইসলামের মূলোতপাটনে যারা নেতৃত্বভার গ্রহণ করেছিল, অশ্লীল ভাষায় মহানবী (সা.)-কে অজস্র গালাগাল করত, বিষাক্ত বর্শা হাতে তাঁকে হত্যা করতে ওত পেতে থাকত, তাঁর দেহ মুবারক থেকে রক্ত ঝরাত, নামাজে নাড়িভুঁড়ি চাপা দিত, মাতৃভূমি ত্যাগ করতে যারা বাধ্য করেছিল, আজ তারা সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় দলে দলে কাবা প্রাঙ্গণে সমবেত হলো। আজ তাদের সেই দর্প, গর্ব ও আস্ফাালন নেই। ১০ হাজার মুসলিম বাহিনী দ্বারা বেষ্টিত হয়ে আজ তারা শিয়ালের মতো লেজ গুটিয়ে দুরুদুরু বুকে চেয়ে আছে দয়ার সাগর মহানবী (সা.)-এর ফয়সালার দিকে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা নগরে প্রবেশের দুটি পথ দিয়েই সৈন্য প্রবেশ করানোর সিদ্ধান্ত নেন। হজরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনীকে মক্কার নিচু পথে নগরে প্রবেশের নির্দেশ দেন। অবশিষ্ট বাহিনী নিয়ে স্বয়ং রাসুল (সা.) মক্কার উঁচু পথ ধরে নগরে প্রবেশ করেন। বিনা বাধায় রক্তপাতবিহীন তিনি হাজুন নামক স্থানে পৌঁছে বিজয় পতাকা উড্ডয়ন করানোর নির্দেশ দেন।

তিনি সরাসরি চলে যান কাবাগৃহে। একপর্যায়ে মহানবী (সা.) কাবাঘর থেকে বের হয়ে এলেন। তিনি দরজার উভয় পাশের কপাটে হাত রেখে এক নাতিদীর্ঘ হৃদয়গ্রাহী ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ‘তোমাদের প্রতি আজ কোনো অভিযোগ নেই। যাও! তোমরা সবাই মুক্ত। ’ শুধু তা-ই নয়, কাফির নেতা আবু সুফিয়ানের গৃহে যে ব্যক্তি আশ্রয় নেবে, তাকেও তিনি ক্ষমা করেন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আশ্রয় নেবে, সে নিরাপদ থাকবে। ’ (আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৪০৫, ৪০১)

নবীজি (সা.)-এর অপূর্ব করুণা দেখে ভীতসন্ত্রস্ত মক্কাবাসী অভিভূত হয়ে পড়ে। সজল নয়নে নির্বাক হয়ে মহামানবের মুখপানে তাকিয়ে থাকে। এমনও কি হতে পারে? জীবনভর যাঁকে শত্রু ভেবেছে, যাঁকে নিঃশেষ করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছে, তাঁর এই বদান্যতা, করুণা ও কোমলতা দেখে কৃতজ্ঞতায় অভিভূত হয় মক্কাবাসী। তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে নবীজি (সা.)-এর চরণতলে নিজেদের সঁপে দেয়। তারা উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করতে থাকে—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। ’ এ সময় যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেন, হজরত আবু বকর (রা.)-এর পিতা হজরত আবু কুহাফা (রা.) তাঁদের অন্যতম। তাঁর ইসলাম গ্রহণে মহানবী (সা.) যারপরনাই খুশি হয়েছিলেন।

মহানবী (সা.)-এর এই সাধারণ ক্ষমা পরবর্তী সময়ে যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। যারা ছিল এত দিন তাঁর রক্তপিয়াসী, তারাই হলো এখন তাঁর দেহরক্ষী। মক্কা বিজয়ের মাত্র ১৯ দিন পর সংঘটিত হুনাইনের যুদ্ধে নওমুসলিম কুরাইশরা বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে চিরদিনের জন্য মিথ্যার ওপর সত্যের জয় হয়। অন্ধকারের ওপর আলোর জয় হয়। প্রমাণিত হয় ইসলাম তলোয়ারের জোরে নয়, উদারতা ও মানবতার জয়গান গেয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলছে।

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য