kalerkantho


জাতি গঠনে মেধার মূল্যায়ন অপরিহার্য

ড. মো. নাছিম আখতার

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



এমপিওভুক্ত কলেজ বা স্কুলে চাকরির জন্য ডোনেশনের নামে যে টাকা লেনদেন হতো তার কলেবর ছিল যেমন বৃহৎ, তেমনি ক্ষুদ্র নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মেধা। অর্থাৎ টাকার সঙ্গে মেধার সম্পর্ক ছিল ব্যস্তানুপাতিক। এতে হয়তো পরিচালনা পর্ষদ বা বিশেষ কোনো গোষ্ঠী লাভবান হয়েছে কিন্তু দেশের শিক্ষাব্যবস্থা হয়েছে শতছিন্ন ও হতদরিদ্র। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে বর্তমান সরকারের সাহসী ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ সুশিক্ষিত জাতি গঠনে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করে। বর্তমান সরকারের যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলো এমপিওভুক্ত স্কুল ও কলেজে কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষক নিয়োগ প্রদান পদ্ধতি চালুকরণ। কিন্তু দৈনিক কালের কণ্ঠ’র ২৭.১২,২০১৬ তারিখের ‘সংসদ ভবনে কলেজের নিয়োগ পরীক্ষা’ শিরোনামে প্রকাশিত খবর আবার আমাদের বিচলিত করে। খবরে প্রকাশ, নিয়োগে আট লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে এবং নিয়োগ নির্বিঘ্ন করতে ডামি প্রার্থীরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিষয়টি যদি সত্য হয়, অর্থাৎ শর্ষের মধ্যে যদি ভূত থাকে তাহলে এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের পাঠদানের উৎকর্ষ সাধনে সরকারের অপরিহার্য উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।

দেশ গড়ার প্রত্যয়ে মেধাকে প্রাধান্য দিতেই হবে। পৃথিবীর পরিবর্তনের মূল শক্তি হলো মেধা, নিষ্ঠা ও সততা। এই তিনটি গুণ হলো কোনো জাতি বা দেশ গঠনের মূল উপাদান।

এগুলো অগ্রাহ্য করে সাময়িক সাফল্য আসতে পারে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির জন্য প্রয়োজন মেধার সঠিক মূল্যায়ন। বিষয়টি উপলব্ধি করেই পশ্চিমা বিশ্ব টাকার বিনিময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে মেধা আমদানি করছে। টাকা রোজগারের অনেক রাস্তা আছে; কিন্তু দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল ভিত্তিতে দাঁড় করিয়ে টাকা উপার্জন কতটা যুক্তিযুক্ত, তা সচেতন মহলের ভাবার বিষয় হতেই পারে। ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখের ডেইলি সান পত্রিকায় খবরের শিরোনাম ছিল, SSC certificates on sale! খবরে প্রকাশ, একটি জালিয়াতচক্র টাকার বিনিময়ে সুযোগসন্ধানী ভুয়া ছাত্রদের মধ্যে কারিগরি শিক্ষার সার্টিফিকেট বিক্রি করছে। শিক্ষায় যখন এ ধরনের অসাধুতা বিরাজ করছে, তখন ভাবতে হবে এই শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড নাকি জাতির জন্য গুরুদণ্ড!

আমার সন্তান ২০১৪ সালে পিইসি ফাইনাল পরীক্ষা দেয়। পরীক্ষার আগের রাতে মায়েদের ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করতে যে পরিমাণ ব্যস্ত থাকতে দেখেছি এবং ওই প্রশ্নগুলো রাত জেগে কোমলমতি ছাত্রদের যেভাবে মুখস্থ করাতে দেখেছি, তাতে কোমলমতি ছাত্রদের নৈতিক বিকাশের বিষয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। শুধু তাই নয়, এতে মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তাদের মধ্যে বিরাজ করে একধরনের হতাশা। এই হতাশাগ্রস্ত জনগোষ্ঠী নিয়ে দেশ খুব বেশি দূর এগোতে পারবে বলে মনে হয় না।

গত ২৬ ডিসেম্বরের একটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। আমার বড় বোন ছিলেন জেলা সমবায় অফিসার, যিনি বর্তমানে অবসরে আছেন। আমার নানি নামকরা হোমিও ডাক্তার ছিলেন। বড় বোন নানির সান্নিধ্যে বড় হয়েছেন। তাই তাঁরও ইচ্ছা হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারি পড়ে মানুষের সেবা করবেন। প্রথম বর্ষ পরীক্ষা দিতে গিয়ে তিনি যে অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন, তার ভাষাতেই বিষয়টি উপস্থাপন করলাম—‘পরীক্ষা দিতে গিয়ে দেখি আমি ছাড়া সবাই বই খুলে লিখছে। ম্যাজিস্ট্রেট যখন আসছেন ছাত্ররা তাদের বই লুকিয়ে ফেলছে। ম্যাজিস্ট্রেট চলে গেলে আবার বই খুলে লেখা শুরু করছে। পরীক্ষার পর অপেক্ষাকৃত তরুণ একজন শিক্ষার্থী আমাকে উদ্দেশ করে বলল যে খালাম্মা আপনাকে কদমবুসি করা উচিত, এত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আপনি সুযোগের সদ্ব্যবহার করলেন না!’ এখান থেকে প্রতীয়মান হয়, একজন অনৈতিক মানুষও বোঝে কোনটি সঠিক আর কোনটি অন্যায়।

শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে সরকারের ঐকান্তিক চেষ্টা ও নিরলস পরিশ্রম অব্যাহত রয়েছে। ২০১৭ সালের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কেন্দ্রসচিবের প্রতি জরুরি নির্দেশনা আমাদের দৃষ্টি কাড়ে। পরীক্ষাকেন্দ্রের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক ডিভাইস বহন বা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। শুধু কেন্দ্রসচিব ক্যামেরাবিহীন মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন। ’ এরই প্রতিফলন ঘটেছে ৬ ফেব্রুয়ারি দৈনিক জনকণ্ঠে ‘মোবাইল নিয়ে হলে প্রবেশ, ভালুকায় ৬ শিক্ষককে অব্যাহতি’ শিরোনামের খবরটিতে।

উন্নত বিশ্বে মেধাবী মানুষ পঙ্গু হলেও তার মেধাশক্তির সুফলটুকু নেওয়া হয়। স্টিফেন হকিংস এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রসিদ্ধ বিদ্যাপীঠ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা অধ্যাপক। বর্তমানে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তিনি হাঁটাচলা করতে ও কথা বলতে পারেন না। কিন্তু ইংরেজ জাতি তাঁর চিন্তাভাবনা কম্পিউটারের মাধ্যমে পড়ে নিজেদের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করছে। আর আমরা হাঁটছি ঠিক উল্টো পথে। টাকার বিনিময়ে জ্ঞানী বা মেধাবী প্রার্থীকে সুযোগ না দিয়ে সুযোগ করে দিচ্ছি একজন স্বল্প মেধার প্রার্থীকে। ফলে সার্বিকভাবে কমছে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা। আর প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে যেহেতু দেশ, তাই সঙ্গে সঙ্গে দেশও হারাচ্ছে সৃজনশীল কর্ম সম্পাদনের সক্ষমতা।

ডিজিটাল বাংলাদেশের মাহেন্দ্রক্ষণে যেকোনো পরীক্ষাকেন্দ্রকে ডিজিটাল মনিটরিংয়ের আওতায় এনে শিক্ষার মান প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত করা সম্ভব। অর্থাৎ পরীক্ষার হলগুলো যদি কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা ও মাল্টিমনিটরিং ডেস্কটপের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা যায় তাহলে পরীক্ষায় যেকোনো ধরনের অসদুপায় অবলম্বন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। দেশ পাবে তার কাঙ্ক্ষিত মানের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, যাদের মেধা ও প্রজ্ঞায় উদ্ভাসিত হবে দেশের প্রতিটি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। মেধার মূল্যায়নে স্বচ্ছ শিক্ষাব্যবস্থাই হোক জাতি গঠনের অন্যতম নিয়ামক।

লেখক : ডিন, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ ও বিভাগীয় প্রধান, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর


মন্তব্য