kalerkantho


সব প্রক্রিয়া মেনেই এগোচ্ছে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার

আব্দুল বাসেত মজুমদার

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সব প্রক্রিয়া মেনেই এগোচ্ছে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়। এটি ছিল জাতির জীবনের অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায়। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোটের দুঃসহ অত্যাচার-অনাচার ও দুর্নীতির পরিপ্রেক্ষিতে দেশের মানুষ নিজের অধিকার আদায়ের জন্য নির্বাচনের মাধ্যমে ২০০৮ সালে মহাজোটকে দেশ পরিচালনার ম্যান্ডেট দিয়েছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করার মাত্র ৪৭ দিনের মাথায় এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এ ঘটনায় সর্বমোট ৭৪ জন প্রাণ হারান, যাঁর মধ্যে ৫৭ জন ছিলেন দেশের সূর্যসন্তান সেনা কর্মকর্তা। এটি সহজে অনুমেয়, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী অপশক্তি নবগঠিত সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্যই এ ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত করার লক্ষ্যেই ওই নারকীয় ঘটনা ঘটে। আমরা লক্ষ করেছি, এ ঘটনার সঙ্গে বেশ কিছু রাজনৈতিক নেতার সংশ্লিষ্টতাও তদন্তে উঠে আসে, যাঁরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। বিচারের রায়ে তাঁদের সাজা হয়। তাই এটি স্পষ্ট যে সরকারকে বিব্রত করতে এটি একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত ছিল।

এ রকম ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে কেউ ঘটানোর সাহস না পায়, সে জন্য দ্রুত ন্যায়বিচারের উদ্যোগ নেয় সরকার।

আমরা লক্ষ করেছি, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর সরকার কালবিলম্ব না করে তিন পর্যায়ে ওই ঘটনার তদন্তকাজ সম্পন্ন করে, যা হলো বিডিআর কর্তৃক তদন্ত, সেনাবাহিনী কর্তৃক তদন্ত এবং জাতীয় তদন্ত। তদন্ত শেষে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কয়েকটি দাবি উত্থাপিত হয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল বিদ্রোহের বিচার সামরিক আইনে করা। সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে সেনা কর্মকর্তাদের সব দাবি পূরণ করেছে। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়াকে সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখার জন্য সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে ২০০৯ সালের ১৭ আগস্ট রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের কাছে রেফারেন্স প্রেরণ করেন এই বিচারের বিষয়ে মত নেওয়ার জন্য। এরপর সুপ্রিম কোর্টে ১০ জন সিনিয়র আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ করা হয়।

অ্যামিকাস কিউরিদের মধ্যে সাতজনই সেনা আইনে বিডিআরের বিচার সম্ভব নয় বলে সরাসরি মতামত দেন। অন্য একজন রেফারেন্সটি ফেরত পাঠানোর মতামত দিলেও তিনি সেনা আইনে বিডিআরের বিচার সম্ভব নয় উল্লেখ করেন। বাকি দুজন সেনা আইনে বিচার সম্ভব বলে মত দেন। তবে তাঁরা প্রচলিত আইনেও বিচার সম্ভব বলে উল্লেখ করেন। প্রায় সব অ্যামিকাস কিউরিই বিডিআর সুশৃঙ্খল বাহিনী কি না, এ বিষয়ে তাঁদের মতামত দেন। বেশির ভাগ অ্যামিকাস কিউরির মতেই ১৫২ ধারার অধীনে বিডিআর সুশৃঙ্খল বাহিনী। কিন্তু বিডিআর সুশৃঙ্খল বাহিনী হলেও তাদের বিচার সেনা আইনে করা সম্ভব নয়। কারণ ৫ ধারা অনুসারে যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে তার ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেওয়া যায় না। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট বিডিআর বিদ্রোহ ও বিদ্রোহজনিত হত্যার বিচার সেনা আইনে সম্ভব নয় বলে রাষ্ট্রপতির কাছে মত দিয়েছেন।

বিদ্রোহে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২০০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানার ততকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একটি হত্যা মামলা করেন। সিআইডির বিশেষ সুপার আবদুল কাহহার আকন্দ মামলাটি তদন্ত করেন। তাঁকে সহযোগিতা করেন ২০০ কর্মকর্তা। ৫০০ দিন তদন্তের পর ২০১০ সালের ১২ জুলাই এ আদালতে হত্যা ও অস্ত্র বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র জমা দেয় সিআইডি। এতে ৮২৪ জনকে আসামি করা হয়। পরে অধিকতর তদন্তে আরো ২৬ জনকে অভিযুক্ত করে বর্ধিত অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। সব মিলে আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৫০।

এরপর শুরু হয় মামলার বিচারকাজ। এত বড় একটি ঘটনার বিচার বলা চলে বেশ অল্প দিনেই সম্পন্ন করা গেছে। এই বিচারে সবাইকে সমান সুযোগ দিয়েছেন আদালত। ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর হত্যাকাণ্ডের মামলার রায় ঘোষিত হওয়ার মধ্য দিয়ে ইতিহাসের ন্যক্কারজনক হত্যাকাণ্ডের কলঙ্ক মোচন হয়। পিলখানায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার দায়ে ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনের ফাঁসির আদেশ হয়। বিএনপির নেতা নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ পিন্টু ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীসহ ১৬১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজার আদেশ হয়েছে ২৬২ জনের। রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় খালাস পেয়েছে ২৭১ জন।

পৃথিবীর ইতিহাসে আসামির সংখ্যা বিবেচনায় এত বড় বিচার কার্যক্রম কোথাও কখনো অনুষ্ঠিত হয়নি। সংগত কারণেই এ বিচারকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রশ্নাতীত করার লক্ষ্যে কিছুটা সময় লেগেছে। এরই সুযোগ নিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট এই বিচার বাধাগ্রস্ত করার লক্ষ্যে বিরতিহীনভাবে নানা অপপ্রচার চালিয়ে গেছে। এমনকি তারা ক্ষমতায় গেলে বিজিবির নাম পরিবর্তন করে আগের নাম এবং পোশাক বহাল রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে বলেও জানা যায়। বিজিবিতে ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের বিদ্রোহ বন্ধের জন্য বর্তমান সরকার ‘বিজিবি অ্যাক্ট-২০১০’ সংসদে পাস করেছে, যা আর্মি অ্যাক্টের অনুরূপ। এ আইনে বিদ্রোহের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিএনপি-জামায়াত জোট বিডিআরের বিচারসংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন অপপ্রচার চালিয়ে সেনাবাহিনী এবং দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চক্রান্তে জড়িত ছিল। তাঁদের অনেকেই ওই সময় সেনাবিধি ৫ মোতাবেক সেনা আইনে এ বিদ্রোহের বিচারের বিরোধিতা করেছিলেন।

বিশেষ আদালতে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। কোনো ফৌজদারি আদালতে কারো ফাঁসি হলে ওই আসামির মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা ও দায়রা জজ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার বরাবর চিঠি দেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা মোতাবেক দেওয়া এই চিঠিতে ফাঁসির রায়ের অংশবিশেষ তুলে ধরে বলা হয়, হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে এই মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করার আদেশ হয়। তাই হাইকোর্টের সদয় অনুমোদনের জন্য মামলার কাগজপত্র, সিডি, মূল নথি ও যাবতীয় প্রসিডিংস পেশ করা হয়। এরপর শুধু মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা সাত দিনের এবং যাবজ্জীবনসহ অন্য দণ্ডপ্রাপ্তরা রায়ের কপি প্রাপ্তির ৬০ দিনের মধ্যে আপিল দায়ের করার সুযোগ পান। দণ্ডিতরা হাইকোর্টে আপিল করেছেন। এই আপিল নিষ্পত্তির লক্ষ্যে হাইকোর্টের একটি বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করেছেন প্রধান বিচারপতি। এসব আপিল শুনানির জন্য ডেথ রেফারেন্স প্রস্তুত হওয়ার পর শুনানি চলছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এই বিচার সবচেয়ে বড় ধরনের ঘটনা। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এবং সুপ্রিম কোর্টের ক্ষেত্রেও। হাইকোর্টে বেশ কিছুদিন ধরে দায়ের হওয়া আপিলের শুনানি চলছে। এখানে বিচার সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে দফায় দফায় শুনানি চলছে। প্রত্যেক দণ্ডিত আসামি নিজ নিজ পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করেছেন হাইকোর্টেও। সেই আইনজীবীরাও তাঁদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন। হাইকোর্টে আপিল শুনানির ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় উঠে এসেছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে কোনো চাক্ষুষ সাক্ষী আছে কী নেই, যেসব সাক্ষীর সাক্ষ্যতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল দণ্ডের রায় দিয়েছেন, তা কতটুকু আইনসম্মত—এসব বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে হাইকোর্টে।

হাইকোর্টের শুনানিতে একটি বিষয় উত্থাপিত হয়েছিল, এ ঘটনার পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র আছে কি না। এই ষড়যন্ত্রকে বলা হয় ‘ক্রিমিনাল কনস্পিরেসি’। সেই ষড়যন্ত্রের বিষয়ে আইনজীবীরা বিশদ আলোচনা উত্থাপন করেছেন আদালতে। এসব প্রেক্ষাপটে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীসহ ভারতে আরো কয়েকটি হত্যা মামলার উদ্ধৃতি উঠে এসেছে শুনানিতে। হাইকোর্টে শুনানি এখনো চলছে। এই আপিল শুনানিতে আইনের আরো কিছু নতুন বিষয় নিয়ে যুক্তিতর্ক শুরু হয়েছে। সেগুলো এখনো চলছে। আপিলের এই চুলচেরা শুনানির দ্বারা এটিই প্রতীয়মান হয় যে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনার ন্যায়বিচার হবে। কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন সাজা না পায়, আর কোনো দোষী ব্যক্তি যেন পার না পায় সেটিই সবার প্রত্যাশা।

এই বিচারের আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে বিচার সম্পন্ন হতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকারের সৎ উদ্দেশ্যের কারণেই এই বিচার সঠিকভাবে চলমান। এই বিচার সঠিকভাবে পরিচালিত হওয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী এটিই প্রমাণ করেছেন, দেশে কোনো বিচারহীনতার সংস্কৃতি থাকবে না।

আরেকটি বিষয় আলোকপাত না করলেই নয়, এ দেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে জাতি অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। জাতির জনককে হত্যার পর দেশ পাকিস্তানপন্থীদের হাতে চলেছে দীর্ঘদিন। জাতির জনককে হত্যার পর তার বিচার যাতে না করা যায়, সে জন্য ইনডেমনিটি অ্যাক্টও করা হয়েছিল, যা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। জাতির জনক হত্যাকাণ্ড যেমন ইতিহাসের বর্বরতম ঘটনা, তেমনি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধে আইন করাও ইতিহাসের বর্বরতম ঘটনা। জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এ দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি নির্মূলের কাজ শুরু করেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে জাতির জনক হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধে ইনডেমনিটি অ্যাক্ট বাতিল করা হয়। এরপর শুরু হলো জাতির জনক হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া।

২০০১ সালে আবারও ক্ষমতায় আসে দেশবিরোধী শক্তি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসায় আবার সেই বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করা হয়। আওয়ামী লীগ মানেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি নির্মূল করার দল। শেখ হাসিনা মানেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি নির্মূল করার নেত্রী। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে এ দেশে যারা ৩০ লাখ লোককে শহীদ করেছিল, দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠন করেছিল, কোটি বাঙালিকে ঘরছাড়া করেছিল, তারা ছিল বিচারের আওতার বাইরে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ২০১০ সালে আইন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে একাত্তরের সেই ঘাতকদের বিচারের আওতায় আনতে সক্ষম হয়।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য একমাত্র উপযুক্ত নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান চিরস্মরণী হয়ে থাকবে। জাতির জনক হত্যাকাণ্ডের বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে হাজারো বাধা এসেছে। তেমনি বাধা ছিল পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বিচারেও। কোনো হুমকির পরোয়া না করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে জাতিকে রক্ষা করেছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা।

লেখক : বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য

অনুলিখন : রেজাউল করিম


মন্তব্য