kalerkantho


ওষুধশিল্পের টিউমার অপারেশন

মুনীরউদ্দিন আহমদ

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ওষুধশিল্পের টিউমার অপারেশন

ভেজাল, ক্ষতিকর ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি দেশের ৮৪টি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞ কমিটি গুণগত মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনে ব্যর্থ হওয়া ২০টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল এবং ১৪টি কম্পানির সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদনের অনুমতি বাতিলের সুপারিশ করে। কিন্তু এ সুপারিশ বাস্তবায়িত না হওয়ায় হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ রিট আবেদন করে। রিট আবেদনের ওপর শুনানি শেষে আদালত গত বছরের ৭ জুন ওই সব কম্পানিকে ওষুধ উৎপাদন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন এবং রুল জারি করেন। রুলে ৩৪টি কম্পানির লাইসেন্স ও অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদনের অনুমোদন কেন বাতিল ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। এরপর কয়েকটি কম্পানির পক্ষ থেকে হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়। সম্প্রতি উচ্চ আদালত ৩৪টি কম্পানির ওষুধ উৎপাদন বন্ধের আদেশ বহাল রেখেছেন। এর মধ্যে ২০টি কম্পানির সব ধরনের ওষুধ উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

আদালতের সাম্প্রতিক যুগান্তকারী আদেশে আমরা সন্তোষ প্রকাশ করছি।

সংসদীয় কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার ৩৪টি ওষুধ কম্পানিকে আগেই কালো তালিকাভুক্ত করেছিল। কিন্তু কম্পানিগুলো ভেজাল, ক্ষতিকর ও নিম্নমানের ওষুধের উৎপাদন চালিয়ে যেতে সব রকম অপচেষ্টা ও কৌশলই খাটিয়েছিল। এমনকি কোনো কোনো কম্পানি সর্বোচ্চ আদালতের এক দফা নিষেধাজ্ঞাও আমলে নেয়নি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কিংবা বিভিন্ন পর্যায়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তা বা নেতার মাধ্যমে নিজেদের কালো তালিকার বাইরে রাখার অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে গেছে কম্পানিগুলো। বৃথা হয়ে গেছে সেই অপচেষ্টা। আদালতের এই যুগান্তকারী রায় জনমনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে। আমাদের দাবি, সরকার তথা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে এই আদেশ যথাযথভাবে কার্যকর করতে হবে। ৩৪টি কম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মানে এই নয় যে ওষুধশিল্প জঞ্জালমুক্ত হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞ কমিটি কালো তালিকাভুক্ত আরো ২৮ ওষুুধ কম্পানির বিরুদ্ধেও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে। এসব কম্পানির কোনো কোনোটি বিভিন্ন ফন্দিফিকির বের করে ওষুধ উৎপাদনের চেষ্টা চালাচ্ছে। সরকারের উচিত হবে, সব দুর্নীতিবাজ ও মুনাফালোভী ওষুধ কম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।

সরকারের নিষ্ক্রিয়তার কারণে অনেকগুলো ওষুধ কম্পানির কাছে এ দেশের মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে। একটু ভাবুন, মুমূর্ষু রোগী বাঁচার আকুতি নিয়ে ওষুধ সেবন করে। কিন্তু সেই ওষুধ যদি নকল, ভেজাল বা ক্ষতিকর হয়, তাহলে পরিণতি কী হয়? মৃৃত্যু ত্বরান্বিত ও অবধারিত হয়। বাংলাদেশে ২৭৮টি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৪০টি মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন করে বলে আমরা জানি। বাকি ওষুধ মানসম্মত না হওয়ায় রোগ সারানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। আবার ভেজাল ওষুধও তৈরি হয় প্রচুর। ইটের গুঁড়ার সঙ্গে নানা ধরনের কেমিক্যাল মিশিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের ভেজাল ওষুধ। বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এমন কিছু ভেজালকারী প্রতিষ্ঠান ধরা পড়েছে, যেগুলো ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, সিরাপসহ ৮০ থেকে ৯০ ধরনের ওষুধ তৈরি করত। অথচ অধিক লাভজনক হওয়ায় দোকানগুলোতে এসব ওষুধই বেশি বিক্রি করতে দেখা যায়, বিশেষ করে গ্রামগঞ্জে। এর পরিণতি কী হচ্ছে? অনেক সময়ই দেখা যায়, ওষুধে কাজ হয় না, তখন বারবার ওষুধ বদলাতে হয়। কিন্তু ভেজাল ওষুধের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া তো দেহে ঠিকই হয় এবং রোগীর জন্য তা হয়ে দাঁড়ায় প্রাণঘাতী। আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি ১৯৯২ ও ২০০৯ সালের মর্মান্তিক ও বিয়োগান্ত ঘটনাগুলোর কথা। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বিষাক্ত প্যারাসিটামল খেয়ে কেবল শিশু হাসপাতালেই দুই হাজার ৭০০ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। ২০০৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রিড ফার্মাসহ তিনটি ওষুধ কম্পানির বিষাক্ত প্যারাসিটামল সিরাপ পান করে ২৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। কিছুদিন আগে রিড ফার্মার বিরুদ্ধে করা মামলায় পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণের অভাবে সব অভিযুক্ত খালাস পেয়ে যায় এবং সেটা সম্ভব হয়েছিল ঔষধ প্রশাসনের গাফিলতির কারণে। এ মামলার পুরো ব্যর্থতাই ঔষধ প্রশাসনের। কারণ মামলার আলামত সঠিক স্থান থেকে জব্দ করা হয়নি। মামলার নিয়ম অনুসারে মামলার আলামত সংগ্রহ করে চার ভাগে বিভক্ত করতে হয়। জব্দকৃত আলামত যে রিড ফার্মার, তারও কোনো প্রমাণ ছিল না। এ ছাড়া প্রকৃত সাক্ষীকে আদালতে ডাকা হয়নি। আলামত সঠিকভাবে উপস্থাপন না করায় আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে বলে আদালত আসামিদের খালাস দিয়ে দেন।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ২৭৮টি অ্যালোপ্যাথিক, ২২৪টি আয়ুর্বেদিক, ২৯৫টি ইউনানি ও ৭৭টি হোমিওপ্যাথিসহ ৮৫৪টি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দেশে ২০১৫ সালে ওষুধ বিক্রি হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে কম করে হলেও ৩০০ কোটি টাকার ওষুধ ভেজাল হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে তৈরি নকল, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে বাজার ছেয়ে গেছে। নকল ও ভেজাল ওষুধ বাজারজাত করায় শুধু জটিল রোগব্যাধি নয়, ঘটছে মৃত্যুর মতো ঘটনাও। সারা দেশে ২৭৮টি ওষুধ কম্পানি প্রায় ২৫ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদন করছে। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৫০টি ছাড়া বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো নকল ও নিম্নমানের ওষুধ তৈরি করেছে। বাতিলকৃত কম্পানির নামসহ ওষুধগুলোর নাম ঘন ঘন প্রকাশ করা না হলে চিকিৎসকরা সেসব ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লিখবেন, রোগীরাও তা সেবন করবে। এতে রোগী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তার ওপর শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও নিম্নমানের ওষুধ গ্রহণের ফলে জটিল সংক্রামক রোগসহ অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগ না সারার কারণে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। এর দায়দায়িত্ব কে নেবে। এটা হতে দেওয়া যায় না। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা অতীতে বলেছিলেন, ‘বিভ্রান্তির দিকে না তাকিয়ে চিকিৎসকরা বরং বড় বড় ওষুধ কম্পানির ওষুধ লিখলেই তো পারেন, কারণ বড় কম্পানিগুলোতে মানসম্পন্নভাবেই ওষুধ প্রস্তুত হয়ে থাকে। এ ছাড়া দেশে সব মিলিয়ে যে ওষুধ উৎপাদন বা বাজারজাত হয়ে থাকে, এর মধ্যে ৮০ শতাংশই মানসম্পন্নভাবে হয় বলে তাঁদের ধারণা। বাকি মাত্র ২০ শতাংশের মতো ওষুধ নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। আর এই ২০ শতাংশ নিম্নমানের ওষুধ যারা তৈরি করে, সেসব কম্পানির তেমন পরিচিতিও নেই। এগুলো বুঝেশুনে ওষুধ লিখলে আর খেলে কোনো বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে না। ’ তিনি চিকিৎসকদের বিভ্রান্তির দিকে না তাকিয়ে বড় বড় ওষুধ কম্পানির ওষুধ প্রেসক্রাইব করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, বড় বড় ওষুধ কম্পানি গুণগত মানসম্পন্ন ওষুধ প্রস্তুত করে থাকে। বাকি কম্পানিগুলো নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন করে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা হিসেবে তিনি যে অভিমত ব্যক্ত করেছেন, তার কি আইনগত বৈধতা আছে? চিকিৎসকরা যদি শুধু বড় কম্পানির ওষুধ প্রেসক্রাইব করেন, তাহলে বৈধ লাইসেন্সপ্রাপ্ত ছোট কম্পানিগুলো গুণগত মানসম্পন্ন ওষুধ তৈরি করা সত্ত্বেও বাজারে টিকে থাকতে পারবে না। এটা কি প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণ হয়ে গেল না। দেশে ২৭৮টি কম্পানির মধ্যে ৪০ থেকে ৫০টি গুণগত মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদন করে বলে ধরা হলে বাকি সব ওষুধ কম্পানিকে নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন করার কারণে বন্ধ করে দেওয়া দরকার। এসব কম্পানির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসক ও রোগীদের এসব কম্পানির ওষুধ প্রেসক্রাইব করা এবং গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকার জন্য পরামর্শ দেওয়া কি মেনে নেওয়া যায়? অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের মতে, ‘বাজারজাতকৃত ২৫ হাজার ব্র্যান্ডের ২০ শতাংশ নিম্নমানের ওষুধের সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচ হাজারের মতো। পাঁচ হাজারের মতো নিম্নমানের ওষুধ বাজারে প্রচলিত রাখাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। গ্রামগঞ্জের কথা বাদই দিলাম। বাংলাদেশের শহরগুলোতেও আমাদের সব চিকিৎসক ওষুধ নির্বাচনে সব সময় নৈতিকতা ও ওষুধের মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন না। অক্সফামের মতো করে বললে এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, নকল ও ভেজাল ওষুধের দোহাই দিয়ে ‘বিগ ফার্মা’ বা বড় বড় কম্পানির প্রমোটাররা এসব কম্পানির ওষুধ কেনার জন্য এ দেশের অসহায় দরিদ্র মানুষকে প্রলুব্ধ করে।

বাজারে প্রচলিত বেশির ভাগ ব্র্যান্ডের ওষুধই ঔষধ প্রশাসনের কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই অবাধে বাজারে প্রবেশ করছে। ফলে রোগীরা আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি গুরুতর শারীরিক ক্ষতিরও শিকার হচ্ছে। এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় প্রাণহানিরও আশঙ্কা রয়েছে। দেশে প্রায় সোয়া দুই লাখ ওষুধের দোকান রয়েছে। এর মধ্যে লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ৬০ হাজার দোকানের। অবশিষ্টগুলোর কোনো লাইসেন্স নেই। ফলে তারা অবাধে নকল ওষুধ বিক্রি করছে। নকল, ভেজাল বা নিম্নমানের ওষুধ গ্রহণের ফলে শরীরে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়ার কারণে অনেক সময় নানা ধরনের বিভ্রান্তি দেখা দেয়। এসব বিভ্রান্তির কারণে মূল কার্লপ্রিট নকল, ভেজাল বা ক্ষতিকর ওষুধের পরিবর্তে আমরা আমাদের স্বাস্থ্যের অবনতি বা মৃত্যুর জন্য অন্য সব নির্দোষ উপাদানকে দায়ী করে বসি। ওষুধ যখন সেবন করা হয়, তখন বোঝার উপায় থাকে না ওষুধটি নকল বা আসল। ওষুধ সেবনের পর কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া না গেলে রোগী ভাবে, তার রোগ নির্ণয় ঠিক হয়নি। তখন রোগী অন্য ডাক্তারের কাছে যায়, বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে গিয়ে আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত হয়। নকল-ভেজাল ওষুধের কারণে শরীরে কোনো বিষক্রিয়া বা ক্ষতিকর অবস্থার সৃষ্টি হলে তাকে ওষুধের অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করে রোগীকে অন্য ওষুধ প্রদান করা হয়। মূল দোষী সেই ভেজাল ওষুধটি বরাবরই দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়। অনেক ক্ষেত্রে নকল, ভেজাল ও ক্ষতিকর ওষুধের কারণে কারো স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে বা মৃত্যু হলে দোষ হয় রোগের, নতুবা ডাক্তারের অথবা হাসপাতালের। আমরা খুব কমই ভাবি, নকল, ভেজাল, নিম্নমানের ওষুধের কারণে বিশ্বের বেশির ভাগ রোগী মারা যায়। কেবল জনবল সংকটের কারণে নকল ও ভেজাল ওষুধ প্রতিরোধে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না বলে জানিয়েছে ঔষধ প্রশাসন। জনবল সংকটের কথাটি নতুন নয়। ঔষধ প্রশাসন পরিদপ্তর প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জনবল সংকটের কথা আমরা শুনে আসছি। ঔষধ প্রশাসন পরিদপ্তর অধিদপ্তরে পরিণত হয়েছে অনেক দিন আগে। এখনো সেই জনবল সংকট!

তবে ওষুধশিল্পে সাফল্যও ঈর্ষণীয়। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সূত্র মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের ২৭৮টি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ কম্পানি এক হাজার ৫০০ জেনেরিকের ২৫ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদন করছে। দেশে পাঁচটি বহুজাতিক কম্পানির একটিও শীর্ষস্থানীয় ১০টি কম্পানির অন্তর্ভুক্ত নয়। ওষুধ উৎপাদন, স্থানীয় চাহিদা পূরণ ও বিদেশে ওষুধ রপ্তানির ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি কম্পানিগুলো রীতিমতো এক অপ্রতিরোধ্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে। আইএমএস হেলথের পরিসংখ্যান মোতাবেক বাংলাদেশের প্রথম ১০টি শীর্ষস্থানীয় কম্পানি ওষুধের মোট চাহিদার ৬৮.৫৫ শতাংশ, শীর্ষস্থানীয় ২০টি কম্পানি ৮৫.৭৩ শতাংশ এবং শীর্ষস্থানীয় ৩১টি কম্পানি ৯৪.১ শতাংশ উৎপাদন করে থাকে। বাকি সব কম্পানি উৎপাদন ও বাজারজাত করে মাত্র ৫.৯ শতাংশ ওষুধ। শীর্ষস্থানে থাকা স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ওষুধের মোট চাহিদার ১৯.২১ শতাংশ, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে থাকা ইনসেপ্টা ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস দখলে রেখেছে যথাক্রমে ১০.৪২ এবং ৮.৪৭ শতাংশ ওষুধ উৎপাদন।

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কম্পানিগুলো স্থানীয় বাজারে প্রাধান্য বিস্তার করা ছাড়াও ওষুধ রপ্তানিতে দিন দিন অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে উঠছে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে ১১৩টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করা হয়। মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও কেনিয়া হচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধের মূল আমদানিকারক দেশ। তবে ৫০টি দেশে বাংলাদেশ নিয়মিত ওষুধ রপ্তানি করে থাকে। ২০১৫ সালে সাত কোটি ২৬ লাখ ডলারের ওষুধ বিদেশে রপ্তানি করে বাংলাদেশের ওষুধ কম্পানিগুলো। খুশির খবর, বাংলাদেশের ওষুধ আমদানিকারক দেশ হিসেবে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের নামও তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ওষুধের গুণগত মান। বাংলাদেশের ওষুধের গুণগত মান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণ খুবই সীমিত ও সীমাবদ্ধ। দেশে মাত্র দুটি ওষুধের মান যাচাইয়ের গবেষণাগার রয়েছে। এই গবেষণাগারে আধুনিক যন্ত্রপাতি, সুযোগ-সুবিধা ও অভিজ্ঞ লোকবলের ঘাটতি রয়েছে। ঘাটতি রয়েছে সদিচ্ছা, দায়বদ্ধতা, জবাবদিহি ও নৈতিকতার। এই দুটি গবেষণাগারে বছরে মাত্র চার থেকে পাঁচ হাজার ওষুধের মান যাচাই করা সম্ভব। অথচ দেশে প্রতিবছর প্রতি ব্যাচে কম করে হলেও ২৫ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদিত হয়। সুতরাং দেশে উৎপাদিত সিংহভাগ ওষুধের গুণগত মান যাচাইয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কোনো ভূমিকা থাকে না। মানসম্পন্ন ওষুধের পূর্বশর্ত হলো—বায়োইকুইভ্যালেন্স (Bioequivalence) যাচাই করা। বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা উন্নত বিশ্বে ওষুধ রপ্তানিরও পূর্বশর্ত। এই পরীক্ষা দেশে হয় না বলে শীর্ষস্থানীয় কম্পানিগুলো উন্নত বিশ্বে ওষুধ রপ্তানিতে চরম বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। এ ছাড়া জাতীয় নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বা ন্যাশনাল রেগুলেটরি অথরিটি হিসেবে বাংলাদেশের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও এফডিএ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে স্বীকৃতি দেয় না। সরকারি ওষুধ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এবং মান যাচাইকারী গবেষণাগার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও এফডিএর অনুমোদন পেলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের ওষুধ খাতের রপ্তানি বাজার ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুতকারকরা। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও এফডিএর অনুমোদন লাভের জন্য জাতীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এবং মান যাচাইকারী গবেষণাগারকে আন্তর্জাতিক মানে পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নের পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো উদ্যোগ এখনো আমরা দেখতে পাচ্ছি না। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কম্পানিগুলো তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ওষুধের মান বজায় রাখার ব্যাপারে সচেষ্ট। কিন্তু বেশির ভাগ কম্পানির সেই সামর্থ্য নেই বলে অতি সম্প্রতি ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনের কারণে ৩৪টি দেশি কম্পানির লাইসেন্স বাতিল করা হলো। এর আগেও অনেক কম্পানির বিরুদ্ধে একই কারণে বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

 

লেখক : অধ্যাপক, ফার্মাসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

drmuniruddin@gmail.com


মন্তব্য