kalerkantho


পাঠ্যবহির্ভূত বই পড়ার সময় কোথায়!

এ কে এম শাহনাওয়াজ

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পাঠ্যবহির্ভূত বই পড়ার সময় কোথায়!

একটি নামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম। ৩৬ জন ছাত্রছাত্রী উপস্থিত। তাদের মধ্যে দুজন ছাত্রী পেলাম, যারা একুশের বইমেলা বলে যে কিছু আছে তা কখনো শোনেনি। সাতজন ছাত্রছাত্রী কথাটা শুনেছে বটে, তবে মেলাটি কোথায় হয় জানে না। একজন বাণিজ্য মেলার সঙ্গে বইমেলা গুলিয়ে ফেলল। ৯ জন বইমেলা কোথায় হয় জানে, কিন্তু কখনো যায়নি। বাকি ১৭ জন বইমেলায় এক-দুবার গেছে। তাদের ছয়জন কখনো বই কেনেনি। বাকিরা একটি-দুটি করে বই কিনেছে। বইমেলা সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই সেই দুজন ছাত্রীর একজন স্বীকার করল, বাড়িতে কখনো বইমেলা সম্পর্কে আলোচনা শোনেনি। ফেব্রুয়ারি মাস এলে পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনে বইমেলা নিয়ে নানা কিছু লেখা হয়, দেখানো হয়।

কিন্তু এ জগতের সঙ্গেও তাদের পরিচয় কম। সংবাদপত্র পড়া হয় না অনেকেরই। আর টেলিভিশন দেখার চেয়ে মোবাইল ফোনের দামি পর্দায় নানা আনন্দ খুঁজে নেওয়ায় তারা অভ্যস্ত বেশি। বইমেলায় কখনো যায়নি—এমন এক ছাত্রী সোজাসাপ্টা বলে ফেলল, এসব ‘একস্ট্রা’ বই পড়ার সময় কোথায় তাদের!

শেষ মন্তব্যটি খুবই তাত্পর্যপূর্ণ মনে হয়েছে আমার কাছে। মানলাম অনেকেরই বই পড়ার মতো পারিবারিক প্রণোদনা নেই, পরিবেশও নেই। তবে তাদের ভাষায় ‘একস্ট্রা’ বই পড়ার সময় সত্যিই খুব কম। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম একটু ভিন্ন। এমনিতেই সেমিস্টার সিস্টেমে খুব তড়িঘড়ি করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিন মাসে (কখনো ছয় মাসের সেমিস্টার) কোর্স পাঠদান আর পরীক্ষা শেষ করতে হয়। আধুনিক বিশ্বের নানা দেশ থেকে সেমিস্টার পদ্ধতি আমদানি হয়েছে। এখন বেসরকারি ও অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গ্রহণ করেছে এই পদ্ধতি। সব পদ্ধতির ভালো-মন্দ আছে। আমার অভিজ্ঞতা বলছে, সেমিস্টার পদ্ধতিতে বিধিবদ্ধ সময়ের মধ্যে পাঠদান ও পরীক্ষা শেষ করা সম্ভব। এতে সেশন জট বেড়ে যাওয়ার সুযোগ কম থাকে। তাড়াতাড়ি সার্টিফিকেট নিয়ে কর্মজীবনে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে শিক্ষার্থী। কিন্তু তিন মাসে ক্লাস পরীক্ষা, টিউটরিয়াল, অ্যাসাইনমেন্ট ইত্যাদি করতে করতে আর কিছু ভাবার সময় থাকে না শিক্ষার্থীদের। নির্ধারিত নোট-হ্যান্ডআউট ছাড়া লাইব্রেরি চর্চার বিশেষ সময় পায় না তারা। বাকি যে সময় থাকে তখন ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগে ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে নান্দনিকতা চর্চা বা জ্ঞানের রাজ্যে বিচরণ করার মতো তথাকথিত ‘একস্ট্রা’ বই পড়ার সময় বের করা শিক্ষার্থীদের জন্য সত্যিই কঠিন।

পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে আমাদের দেশের মতো সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে না। মৌলিক শিক্ষার পর ডিপ্লোমা ধরনের নানা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পর কর্মক্ষেত্রে চলে যায়। আর গবেষণার ক্ষেত্রে যারা থাকতে চায় তারা বিশেষায়িত বিদ্যায় নিজেদের যুক্ত করে। তাই তাদের কারিকুলামই এমন যে সেমিস্টারে ঢুকে অনেক কিছুই পড়ে, তবে কোনো কিছুর গভীরে যাওয়া হয় না। আমাদের বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের (অধুনা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগেও) কারিকুলাম ও সিলেবাস এসব আধুনিক দেশের দর্শনেই পরিচালিত হচ্ছে। এসব অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা পাশ্চাত্য দেশে পাড়ি জমায় ও ক্রেডিট ট্রান্সফার করে চলে যায়, তাদের না হয় একটি জীবন তৈরি হয়, কিন্তু দেশে থাকাদের অনেকেই জ্ঞানের রাজ্যে না ঘরকা-না ঘাটকা হয়ে থাকে।

এখানে আমি ফরাসি দেশের একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ দিতে চাই। গত মে মাসের কথা। আমি প্যারিসের প্রধান রেলস্টেশন গিয়ার দ্য লিয়নের কাছাকাছি এক হোটেলে উঠেছি। এর কাছেই এক মেট্রো রেল স্টেশন থেকে পাতাল রেল ধরে যাচ্ছিলাম ল্যুভর জাদুঘর দেখতে। ভেতরে দরজার ওপরে স্টেশনগুলোর নাম লেখা আছে। দেখলাম ,ল্যুভরের দুই স্টেশন আগে বাস্তিল স্টেশন। নামটি পড়ে আমি শিহরিত হলাম। ১৭৮৯ সালে এই বাস্তিল দুর্গের পতন ঘটিয়েছিল ফ্রান্সের বিপ্লবীরা। প্যারিসের মানচিত্র আমার নখদর্পণে ছিল। আমি সেন নদীর সমান্তরালেই পূর্ব থেকে পশ্চিমে ছুটছি। ল্যুভর জাদুঘরও সেন নদীর কাছে। তাই ঠিক করলাম ফিরতি পথে নদীকে নিশানা ধরে হেঁটে হেঁটে বাস্তিল আসব। দুর্গটি নিশ্চয়ই সংরক্ষিত আছে। এ যাত্রায় দুর্গটি দেখতে হবে।

ফিরতি পথে হেঁটে চলে এলাম বাস্তিলে। মুশকিল হলো, বাস্তিল দুর্গের হদিস পাব কোথায়! এখানে মানুষ ইংরেজি বোঝে না, বলেও না। পর্যটন মৌসুম চলছে। নদীর তীরে পর্যটকের ছড়াছড়ি। নদীর ওপর একটু দূরে দূরে ব্রিজ দিয়ে দুই পারে সংযোগ তৈরি করা হয়েছে। দুই পারেই শহর। তাহলে বাস্তিল দুর্গ কোন পারে হবে? আমি দু-চারজনকে জিজ্ঞেস করে ব্যর্থ হলাম। ভাবলাম, ঐতিহাসিক ‘বাস্তিল ফোর্ট’ শব্দটি শুনে হয়তো কেউ সাহায্য করতে পারে। বারবার ব্যর্থ হয়ে এবার বিকল্প চিন্তা করলাম। ব্রিজগুলোর ওপর অর্ধবৃত্তাকার বাড়তি ঝুলন্ত অংশ আছে। ওখানে চিত্রশিল্পীরা বসে তাদের চিত্রকর্ম বিক্রি করেন। আবার কেউ নিজেদের স্কেচও আঁকাতে পারেন। ভাবলাম, শিল্পীরা নিশ্চয়ই ইতিহাসের খোঁজ রাখবেন। আমি একজন মাঝবয়সী চিত্রকরকে টার্গেট করলাম। যখন তাঁর কাছে পৌঁছলাম তখন দুজন ফরাসি তরুণ-তরুণী এলো তাদের স্কেচ আঁকাতে। মনে মনে খুশি হলাম। এই তিনজন আমাকে সাহায্য করতে পারবে।

কিন্তু অবাক হলাম যখন মনে হলো বাস্তিল ফোর্ট কথাটি আমি যেন প্রথম তাদের শোনালাম। কপাল ভালো, ওরা ভাঙা ইংরেজি বলতে পারছিল। চিত্রকর গম্ভীর হওয়ার ভান করলেন আর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বয়সী তরুণ-তরুণীর মুখাবয়বে বিব্রত হওয়ার ভাব প্রকাশ পেল। বিষয়টাকে সহজ করার জন্য আমি ফ্রেঞ্চ রেভ্যলুশন (ফরাসি বিপ্লব) স্মরণ করিয়ে দিলাম। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, ফ্রান্সের দুই তরুণ-তরুণী ফরাসি বিপ্লবের কথাও যেন প্রথম শুনল। তবে মাথা ঝাঁকালেন চিত্রকর। ফরাসি বিপ্লবের কথা শুনেছেন বটে, তবে বিস্তারিত জানেন না।

এই অভিজ্ঞতা নিয়ে পরে অনেক ভেবেছি এবং জানার চেষ্টা করেছি। একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ও গবেষণার সঙ্গে যারা যুক্ত, তারা ছাড়া সাধারণ শিক্ষিত উন্নত দেশের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ ইতিহাস-ঐতিহ্যের খোঁজ করা যায় এমন গভীরে পৌঁছার মতো কারিকুলামে অবস্থান করে না। তারা উন্নত বিশ্বের প্রজন্ম। স্ব্যচ্ছন্দ্যে জীবন চালানোর মতো নানা উপায় তাদের আছে। এসব অপূর্ণতা দেশ-জাতিকে হয়তো পিছিয়ে দিচ্ছে না। কিন্তু অভিন্ন ধারার কারিকুলামে হাঁটতে গিয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেভাবে পড়াচ্ছে তাতে কী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে আমি বুঝতে পারি না। নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী দেশান্তরী হয়ে বা দেশে থেকে ব্যক্তিজীবনের উত্কর্ষ ঘটাতে পারবে ঠিকই, তবে মাঝারি ধারার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসা শিক্ষার্থীদের বড় অংশ দেশের বোঝায় পরিণত হবে।

এ ধারার আলোচনায় আমার এক মেধাবী ছাত্র তথাকথিত ‘একস্ট্রা’ বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করল এভাবে। কিছুদিন আগে এক জনপ্রতিনিধি স্কাউটের ছেলেদের তৈরি মানবসেতু পাড়ি দিতে স্যুটেড-বুটেড হয়ে শিক্ষার্থীদের ঘাড় মাড়িয়েছেন। হয়তো ছাত্রছাত্রীরাই তাঁকে অনুরোধ করেছে। তিনি হয়তো অনুরোধ রক্ষা না করে পারেননি। সে ক্ষেত্রে জুতা খুলে একটু ক্ষণের জন্য সেতুতে প্রতীকী পা রাখতে পারতেন। কিন্তু দেখা গেল আনন্দচিত্তে তিনি জুতা পায়ে পুরো ‘সেতু’ মাড়ালেন। আমার ছাত্রটির ভাষ্য, এই মেয়র জীবনে হয়তো ‘একস্ট্রা’ বই পড়েননি। তাই মনের সুকুমার বৃত্তিগুলো জেগে ওঠেনি। বিবেকের দরজা খুলতে পারেননি। যদি পারতেন তবে ছাত্ররা অনুরোধ করলেও তিনি উচিত-অনুচিতের প্রশ্নটি নিজের ভেতরে খুঁজে পেতেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের শিক্ষার্থীদের। জীবনের সবচেয়ে বর্ণিল সময়টিতে ওরা সেমিস্টারের চাপে আর ক্লাস পরীক্ষার অক্টোপাস বেষ্টনীতে পরে সুকুমার বৃত্তি জাগিয়ে তুলতে পারছে না। সময়ের তাড়নায় পাঠ্য বইও সংকুচিত হয়ে গেছে। এখন ক্লাস পরীক্ষা ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানা ইলেকট্রনিক আনন্দে যুক্ত হয়ে পাঠভ্যাস ও জ্ঞানচর্চাকে সংকুচিত করে ফেলছে। আমি আতঙ্কের সঙ্গে লক্ষ করছি, দেড়-দুই যুগ আগের বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবী ছাত্রছাত্রী অনেকেই আমার কাছে আসত ক্লাস সংশ্লিষ্ট পাঠ্যবহির্ভূত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে। সেখানে দেশ-বিদেশের সাহিত্য, সমাজ, রাজনীতি, শিল্পকলা নানা বিষয়ে আলোচনা হতো। এসব আলোচনার মধ্য দিয়ে আমিও ওদের কাছ থেকে অনেক কিছু জেনেছি-শিখেছি। আজ তেমন কৌতূহল নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের আসতে দেখি না। কেউ এলেও আলোচনা বেশি দূর এগোয় না। ওদের জানা ও কৌতূহলের জগত্ খুব ছোট হয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষকদের অনেককে দেখে চিন্তা হয়। নিজ বিদ্যায় মেধাবী ফল অর্জন করে এবং আরো নানা কারণ ও শক্তিতে হয়তো শিক্ষক হয়েছেন। কিন্তু ওই ‘একস্ট্রা’ বই পড়া ও জ্ঞানের জগতের খোঁজ করার সুযোগ হয়তো তেমনভাবে পাননি। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক জ্ঞান বিনিময়ের জায়গাটিও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

এ থেকে উত্তরণের উপায় কী! এ নিয়ে ভেবেও আমি কোনো কিনারা করতে পারি না। আমাদের দেশের অগুনতি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী পড়ে। সবারই শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি। হাতে গোনা কয়েকটি খ্যাতিমান বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বাদ দিলে দায়িত্ব নিয়েই বলব, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারা এসব শিক্ষার্থীর বেশির ভাগ খুব দুর্বল ইংরেজি ভাষাজ্ঞান নিয়ে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের শুদ্ধ ইংরেজি লেখার বিষয়টি মানদণ্ডে আনলে পাস করানো দায় হবে। তারাও বলে, ‘আমরা যদি বাংলায় উত্তর লিখতে পারতাম তাহলে আমাদের পড়াটা যেমন বিস্তৃত হতো লিখতেও পারতাম হাত খুলে। ’ কিন্তু ইংরেজি মাধ্যমে বন্দি করে দিয়ে শিক্ষার্থীর বড় অংশেরই না ভাষা শিক্ষা হচ্ছে, না পঠিত বিষয়ের গভীরে পৌঁছতে পারছে। লাইব্রেরিতে যাওয়া তো এই প্রজন্ম প্রায় ভুলতে বসেছে। আমি একটি খ্যাতনামা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্ন করে দেখেছি, নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি ছাড়া ঢাকা শহরে পড়তে যাওয়ার মতো কোন কোন লাইব্রেরি আছে তা ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই বলতে পারে না। আর সে প্রয়োজন ও সময়ও তাদের নেই!

আমার মনে হয়, নানা সংকটের পরও আমাদের চলমান শিক্ষাব্যবস্থায় কোথাও বড় রকমের গলদ আছে। আর রয়েছে দূরদর্শী চিন্তার অভাব। এসব নিয়ে নীতিনির্ধারক মহল যদি এখনই না ভাবে তাহলে আমাদের প্রজন্ম আলোকিত ভুবন পাবে কেমন করে!

 

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com


মন্তব্য