kalerkantho


একুশে ফেব্রুয়ারির ভাবনা

এমাজউদ্দীন আহম

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



একুশে ফেব্রুয়ারির ভাবনা

একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রতিবাদের লাল গোলাপের যে চারাটি রোপিত হয়, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরে তা হয়ে উঠল রক্তরঞ্জিত পতাকা। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের পতাকা। একুশে ফেব্রুয়ারিতে জনতার আন্দোলনের যে ক্ষীণধারা সৃষ্টি হয়, নানা ঘাত-প্রতিঘাতে সঞ্জীবিত হয়ে একাত্তরে দুই কূল ছাপিয়ে তা-ই রূপান্তরিত হয় মুক্তিযুদ্ধের মহাপ্লাবনে

 

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাবছি বাংলাদেশে বাংলা ভাষার মর্যাদা সম্পর্কে। বাংলা ভাষার বর্তমান অবস্থান ও অগ্রগতির স্তর সম্পর্কে। যতই ভাবি, বিষাদে মনটা ভরে ওঠে। রক্তের আলপনা এঁকে যে ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছি বাংলাদেশের রাজকীয় ভাষারূপে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে, সেই ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ ও বিশুদ্ধ উচ্চারণে আমাদের অনীহার অবসান এখনো হয়নি। উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রভূমি বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নতমানের ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও আমাদের দৈন্য প্রকট। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পাঠরত সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীদের মধ্যেও আঞ্চলিকতা-উত্তর শুদ্ধ বাংলা প্রয়োগের ক্ষেত্রও তেমন উর্বর হয়ে ওঠেনি। বাংলা ভাষায় রচিত সৃজনশীল আলেখ্যগুলো এখনো আমরা বিশ্বের জ্ঞান ভাণ্ডারের অপরিহার্য উপাদানরূপে উপস্থাপিত করতে সক্ষম হইনি। বিশ্বের যে ১৯৩টি রাষ্ট্রে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা রূপে ২০০০ সাল থেকে প্রতিপালিত হচ্ছে ও ভাষার দাবিতে বাংলাদেশের সুসন্তান শহীদ বরকত, সালাম, জব্বার ও রফিকদের নাম পরম শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত হচ্ছে, সেসব রাষ্ট্রে বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধ সম্ভারের কিয়দংশও আমরা পৌঁছাতে পারিনি। আমাদের এই দৈন্য কাটিয়ে উঠতে হবে।

আমাদের জাতীয় জীবনের ক্রান্তিকালে আত্মশক্তির উদ্বোধনে যে একুশে ফেব্রুয়ারি জাতীয় মননের এক আকর্ষণীয় স্থাপত্য হিসেবে উদ্ভাসিত হয়েছিল, এমনকি একুশে ফেব্রুয়ারি যেভাবে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এ দেশের জনসমষ্টিকে জাতীয়তার বিস্তীর্ণ মোহনায় সংঘবদ্ধ করেছিল জাতীয় ঐক্যের  এক স্থপতি হিসেবে, তার সঠিক মর্যাদা আমরা এখনো দিতে সক্ষম হইনি। আজকের এই দিনে আমাদের ব্যর্থতার এই অন্ধকার দিকটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করুক—এই কামনা করি।

সত্যি বটে, প্রত্যেক ব্যক্তি মায়ের পরেই সম্ভবত মায়ের ভাষার প্রতি হয় সর্বাধিক অনুরক্ত। মা যেমন নিজের ভাষার অনুভবকে বহন করে চলেন তাঁর রক্তে- মাংসে-মজ্জায়, মাতৃগর্ভস্থ সন্তানও তেমনি বহন করে চলে মায়ের ভাষার গর্বিত উত্তরাধিকার। তাই দেখা যায়, প্রত্যেক মানুষের কাছে তার মায়ের ভাষা অত্যন্ত আপন সম্পদ। এজরা পাউন্ডের কথায়, মাতৃভাষা হলো ‘ওষ্ঠলালিত জীবনের কাকলি’ এবং এই  কাকলি অনুরণিত হয় মাতৃক্রোড়েই। সুরেলা পাখি যেমন সুরলহরী বহন করে তার চঞ্চুতে, মানুষও তেমনি তার শৈশবকাল থেকে মাতৃভাষার লাবণ্য বহন করে চলে তার ওষ্ঠ-পুটে। তার প্রথম শব্দ উচ্চারিত হয় মাতৃভাষায়। এসব কারণে ভাষার প্রতি তার আসক্তি ও অনুরাগ অনেকটা সহজাত। সহজাত বলেই মাতৃভাষার ওপর আধিপত্যবাদী কোনো শক্তির অশুভ চক্রান্ত কোথাও কোনো সময় সফল হয়নি। আরবদের ইরান বিজয় অথবা তুরস্ক বিজয়ের কথা স্মরণ করুন, এই সত্য সূর্যালোকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। ইরানের জনগণ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। গ্রহণ করে পবিত্র কোরআন ও হাদিস। আত্মস্থ করে ইসলামী রীতিনীতি, এমনকি ইসলামী ঐতিহ্য। সাদরে গ্রহণ করে ইসলামী রীতিনীতি, এমনকি ইসলামী ঐতিহ্য, কিন্তু ফারসি ভাষাকে জয় করতে ব্যর্থ হয়। তুরস্কের ইতিহাসও একই রকম। কয়েক শ বছরের শাসন-প্রশাসনের পরে তুর্কিরা আরবদের প্রায় সব কিছু গ্রহণ করেছে, অনেকটা নির্বিচারে। গ্রহণ করে ইসলাম ধর্ম। কোরআনের বাণী। হাদিসের দিকনির্দেশনা। ইসলামের তাহজীব আর আচরণবিধি। কিন্তু ইরানিদের মতো গ্রহণ করেনি তুর্কির পরিবর্তে আরবিকে।

অত দূরে না গিয়ে নিজের দেশের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলেই চলবে। সেন রাজাদের আমলে এই বাংলায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল সংস্কৃত ভাষা। দেবভাষা রূপে এর আগমন ঘটে এ দেশে। এই ভাষায় কথা না বললে অথবা এই ভাষায় না লিখলে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা বক্তা ও লেখকদের চরম শাস্তির বিধানও দিয়েছিলেন। ভয় দেখানো হতো যে সংস্কৃতের পরিবর্তে অন্য ভাষা ব্যবহার করলে ব্যবহারকারী সবচেয়ে বেদনাদায়ক নরক রৌরবে স্থান লাভ করবে। বাংলার জনগণ কিন্তু সংস্কৃত ভাষাকেও পরিত্যাগ করেছে। পরিত্যাগ করেছে এ দেশে পাঠান ও মোগল আমলের প্রায় কয়েক শ বছরের প্রচেষ্টায় প্রবর্তিত ফারসি ভাষাকেও। কোনো ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে কার্যকর ছিল কিছুদিন। কিন্তু তা সব সময় সরকারি পর্যায়ে সীমিত কর্মকাণ্ডের ভাষা হিসেবেই টিকে থেকেছে। কোনো দিন তা জনগণের ভাষা হয়ে ওঠেনি, হয়নি সাহিত্যের ভাষা। হয়নি সংস্কৃতির বাহনও। হয়নি সর্বজনীন শিক্ষার মাধ্যমও। আরব-ইরান থেকে আগত শ্রদ্ধেয় সুফিদের উপদেশ-নির্দেশ গ্রহণ করেছে বাংলার জনগণ। দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। গ্রহণ করেছে ইসলামিক ঐতিহ্য ও নীতিবোধ। কিন্তু ভাষার ক্ষেত্রে বরাবর থেকেছে অনমনীয়। বাংলার মুসলিম সুলতানরা এই সত্য অনুধাবন করেন সঠিকভাবে। তাই তাঁরা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ফারসিকে সংরক্ষণ করেছিলেন বটে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বাংলা ভাষার উন্নয়নের জন্য। উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বাংলা সাহিত্যের অগ্রগতির জন্য। সুকুমার সেনের কথায়, ‘ফারসি  ভাষার আগমনে বাংলা ভাষা একটি  চলমান সহিষ্ণু ভাষায় পরিণত হয়েছে। সেন রাজত্বের সময় সংস্কৃত ভাষা দেবভাষা রূপে সৃজিত হয় এবং প্রশাসনিক কর্মের জন্য সংস্কৃত ভাষার প্রয়োগ হতো। বাংলায় মুসলমানদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ফারসি ভাষা অসাধারণ লালিত্য ও মাধুর্য নিয়ে বাংলা ভাষাকে সুকুমার, সক্ষম ও চলমান ভাষা পরিণত করল। ’

পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকরা কিন্তু এই সত্য উপেক্ষা করেন। বহুবাচনিক পাকিস্তানে জোরপূর্বক ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির পাকিস্তানে সাংস্কৃতিক ঐক্য রচনার জন্য পাকিস্তানে এক ও অভিন্ন ভাষা উর্দু প্রবর্তনে কৃতসংকল্প হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের এসব নীতিনির্ধারক আধুনিক ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য যেসব পদক্ষেপ গৃহীত হয় সেদিকেও কোনো দৃষ্টি দেননি। দিতে আগ্রহীও ছিলেন না। কানাডা ইংরেজি ও ফ্রেঞ্চ—এই দুই ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দান করে। দুই ভাষাকে সমমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে যেভাবে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি মজবুত করা হয়েছে, পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি সেদিকে আকৃষ্ট হয়নি। সুইস ও বেলজিয়ান জাতি যেভাবে দুই বা ততোধিক রাষ্ট্রভাষা নিয়ে যেভাবে জাতীয় ঐক্য সুসংহত করতে সক্ষম হয়েছে সেদিকেও তাঁদের দৃষ্টি পড়েনি। এই প্রেক্ষাপটেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা দাবি তোলেন উর্দুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাকেও পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার।

ভাষা হলো সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যম। ভাষা হলো ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বাহন। সৃজনশীল উদ্যোগ ও অগ্রগতি অর্জনের সহজ-সরল রাজপথ। ভাষার ওপর আঘাত এলে তাই সমগ্র জনসমষ্টিই শঙ্কিত হয়ে ওঠে। হয়ে ওঠে আতঙ্কিত। তখন উদ্যোগ গ্রহণ করে তা প্রতিরোধ করতে। যুক্তিবুদ্ধির আলোকে তা সম্ভব হলে ভালো। তা না হলে এগিয়ে যায় রক্তাক্ত পথে। অগ্রসর হয় আত্মদানের পথে। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনে এই জনপদের ছাত্র-জনতা-বুদ্ধিজীবীদের এই  সংকল্পই প্রতিফলিত সর্বত্র। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি এরই চূড়ান্ত ফল। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি সূচনা মাত্র। এ পথ ধরেই এ জাতির জীবনে আসে পরিপূর্ণতা একুশের প্রায় দুই দশক পরে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর একুশে ফেব্রুয়ারি পরিপূর্ণ হয় ষোলোকলায়। একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রতিবাদের লাল গোলাপের যে চারাটি রোপিত হয়, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরে তা হয়ে উঠল রক্তরঞ্জিত পতাকা। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের পতাকা। একুশে ফেব্রুয়ারিতে জনতার আন্দোলনের যে ক্ষীণধারা সৃষ্টি হয়, নানা ঘাত-প্রতিঘাতে সঞ্জীবিত হয়ে একাত্তরে দুই কূল ছাপিয়ে তা-ই রূপান্তরিত হয় মুক্তিযুদ্ধের মহাপ্লাবনে। একুশের শহীদরা এই অগ্রযাত্রার অগ্রপথিক। মৃত্যুঞ্জয়ী বীর সেনানি। এভাবে একুশ হয়ে ওঠে আত্মশক্তির দৃশ্যমান প্রতীক। এই একুশে ফেব্রুয়ারিকে কি আমরা ভুলতে পারি? ভুলতে পারি না এবং ভোলাও উচিত নয়। ইংরেজি এখন এক আন্তর্জাতিক ভাষা। শুধু জ্ঞানচর্চা, উন্নত পর্যায়ের গবেষণা পরিধিকে বিস্তৃত করার জন্যই ইংরেজি শিক্ষা প্রয়োজন তা-ই নয়, আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যে মণিমুক্তা, শিক্ষা-সংস্কৃতির মূল সুর, জাতীয় চেতনা ও অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকদর্শনকে বিশ্বময় করার জন্যও প্রয়োজন ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা। কিন্তু সবার ওপরে প্রয়োজন হলো সমাজ জীবনের বৃহত্তর উপত্যকায় আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে মর্যাদার আসনে উপস্থাপন করা এবং মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা সমুন্নত করার প্রকৃষ্ট পন্থা হলো ভাষা উন্নয়নের লক্ষ্যে সুসমন্বিত পদক্ষেপ, সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে এর প্রয়োগ, শুদ্ধ ব্যবহার আর বিশুদ্ধ উচ্চারণের মাধ্যমে এর পরিপূর্ণতা আনয়ন, বাংলার মাধ্যমেই সৃজনমূলক আলেখ্যগুলো প্রকাশ ও সঠিক পরিভাষা নির্ধারণ করে প্রাঞ্জল ভাষায় বাংলায় রচিত সব উন্নততর কর্মের বিদেশি ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বময় বাংলা ভাষাকে পরিচিত করা। অন্য দিন না হোক, অন্তত একুশে ফেব্রুয়ারিতে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের দৃষ্টি এদিকে আকৃষ্ট হোক—তা-ই আমার ঐকান্তিক কামনা।

 

লেখক : সাবেক উপাচার্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য