kalerkantho


আসন্ন বিধানসভা ভোট নিয়ে বিজেপির কৌশল

গৌতম রায়

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পাঞ্জাব, মণিপুর ও গোয়ার বিধানসভা ভোট ঘোষিত হয়েছে। ভোট এলেই সাম্প্রদায়িক হিংসার আগুনে হাত আরো বেশি করে তাতিয়ে নেওয়া শুরু হয়ে যায় আরএসএস ও তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা করে মানুষে মানুষে বিচ্ছেদের ভূগোল তৈরি করার কাজটি হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি যত নিপুণভাবে করতে পারে, ততই ভোটের ঝুলি তাদের উপচে পড়ে। ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে মানুষের রক্ত নিয়ে হোলি খেলে বিজেপির সংসদে আসনসংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছিল। সেই সময়েরই মুম্বাই দাঙ্গা বিজেপিকে পরবর্তী সময়ে মহারাষ্ট্রে ক্ষমতায় আসতে সব থেকে বেশি সাহায্য করেছিল। তেমনি গুজরাট গণহত্যা এই নরেন্দ্র মোদিকে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পথটা প্রশস্ত করে দিয়েছিল। সাম্প্রতিক অতীতে মুজফফরনগরের দাঙ্গা একক গরিষ্ঠতার জোরে বিজেপিকে সাউথ ব্লক দখলে সব থেকে বেশি সাহায্য করেছিল।

ডিমানিটাইজেশনের জেরে সাধারণ মানুষের দুর্দশার পাশাপাশি একটি ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি করে, দাঙ্গা লাগিয়ে, হিন্দু-মুসলমানকে আড়াআড়িভাবে বিভক্ত করে উত্তর প্রদেশসহ পাঁচটি রাজ্যের ভোটে জিততে চাইছে বিজেপি। এ নিয়ে অবশ্য বলাবাহুল্য মমতা সম্পূর্ণই নীরব। অখিলেশ যাদব সমাজবাদী পার্টির প্রতীক সাইকেল পাওয়ার পর মমতা টুইট করে তাঁকে অভিনন্দন জানান। আর এই অখিলেশের গত পাঁচ বছরের শাসনকালে উত্তর প্রদেশের আনাচকানাচে যেসব দাঙ্গা হয়েছে, যে দাঙ্গাগুলোতে মূলত জ্বলে গেছে মুসলমান সম্প্রদায়ের বাড়ি, যে দাঙ্গাগুলোতে লুট হয়েছে বেছে বেছে মুসলমানদের দোকান—সেই সময় ধর্মীয় ভাবাবেগ নিয়ে রাজনীতি করতে যাঁরা বিজেপি থেকে কোনো অংশে কম যান না—তাঁরা কেউই একটা শব্দও উচ্চারণ করেননি।

উত্তর প্রদেশ চিরদিনই কেন্দ্রে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে বড় ভূমিকা নিয়ে এসেছে। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া উত্তর প্রদেশ থেকেই দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। কেন্দ্রে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে টিকে থাকার ক্ষেত্রে যে রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ উত্তর প্রদেশের ওপরে রয়েছে, সেই রাজনৈতিক দল দিল্লিতে একটু বাড়তি সুযোগ পেয়েছে। কেন্দ্রে বর্তমানে ক্ষমতাসীন আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির কাছে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি সাম্প্রদায়িকতার প্রচার, প্রসার ও প্রয়োগের লক্ষ্যে উত্তর প্রদেশের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে।

সেই কারণে এখন এই রাজ্যটিই বিজেপির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কংগ্রেসের মতোই বিজেপিও উত্তর প্রদেশে বহুকাল ক্ষমতার বাইরে রয়েছে। ২০০৭ সালের নির্বাচনে সে রাজ্যে জিতেছিল কুমারী মায়াবতীর নেতৃত্বাধীন বহুজন সমাজ পার্টি আর ২০১২ সালে জিতেছিল সমাজবাদী পার্টি। ১৯৮৯ সালে নারায়ণ দত্ত তেওয়ারীর মুখ্যমন্ত্রিত্বের পর থেকে কংগ্রেস সে রাজ্যে সম্পূর্ণভাবে ক্ষমতার বাইরে। তারা জানে, উত্তর প্রদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ অনুযায়ী এককভাবে কংগ্রেসের পক্ষে সে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করা দিবাস্বপ্ন, অথচ ক্ষমতার পরিমণ্ডলের বাইরে থাকাটা কংগ্রেস দলের চরিত্রের সঙ্গে আদৌ যায় না। তাই যেকোনোভাবেই হোক না কেন, ক্ষমতার বৃত্তের ভেতরে টিকে থাকার তাগিদ থেকেই কংগ্রেস নির্বাচনী সমঝোতা করেছে কংগ্রেস দলের সঙ্গে।

অতীতে বিধানসভার ফ্লোর নয়, বিরোধী দলের সরকার উত্খাত করে নিজেদের তাঁবেদার সরকার প্রতিষ্ঠা করতে কংগ্রেসের সহায়ক ছিল এই রাজ্যপালেরই বৈঠকখানা। বামপন্থীরা চিরদিনই বলে এসেছেন, কোনো সরকারের প্রয়োজনীয় গরিষ্ঠতা আছে কি না সেটা প্রমাণিত হোক বিধানসভায়, রাজ্যপালের বৈঠকখানায় নয়। একেই বুঝি বলে ইতিহাসের ট্র্যাজেডি একদা কেরালায় ইএমএস নাম্বুদ্রিপাদের সরকার থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গে যুক্তফ্রন্ট সরকার বা জম্মু-কাশ্মীরে ডা. ফারুক আবদুল্লার সরকার, অন্ধ্র প্রদেশে এনটি রামা রাওয়ের সরকারের ভবিষ্যৎ কেন্দ্রে তত্কালীন কংগ্রেসি সরকারের হুকুমে রাজ্যপালরা নির্ধারণ করে দিয়েছেন বিধানসভায় নয়, নিজের বৈঠকখানায়।

পাঁচ রাজ্যের ভোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই বিজেপি ক্ষমতা দখল করেছে বিধানসভাকে এড়িয়ে অরুণাচল প্রদেশে। মণিপুরে বিধানসভার আসন্ন নির্বাচনকে মাথায় রেখে নতুন বছর পড়ার শুরুতেই পিপলস পার্টি অব অরুণাচলের ৩৩ জন বিধায়ককে নিজেদের দিকে টেনে এনে সে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। গত ২০১৪ সালে অরুণাচলে বিধানসভার ভোট হয়। সেই ভোটে বিজেপি জেতে মাত্র ১১টি আসনে। তখন সরকার করেছিল কংগ্রেস। পিপলস পার্টি অব অরুণাচল তারপর কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের মদদেই কংগ্রেসের বিধায়ক কিনে সেখানে সরকার গড়েছিল।

যে পিপিএ দলকে দিয়ে কংগ্রেস বিধায়ক কিনে নিজেদের তাঁবেদার সরকার করেছিল বিজেপি, মণিপুরের নির্বাচনের মুখে সেই পিপিএ দলেরই বিধায়ক কিনে এখন সরাসরি তারা নিজেরাই সরকার করল। আসামে এককভাবে সরকার করার পর গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দিকেই এখন হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির নজর। আসামের পর মণিপুরে নিজেদের ক্ষমতা কায়েমের লক্ষ্যেই তাই জনাদেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঘোড়া কেনাবেচার ভেতর দিয়ে অরুণাচলে ক্ষমতা দখল করেছে বিজেপি।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপরে সে দেশের সরকারের বর্বরোচিত অত্যাচারের পরিপ্রেক্ষিতে মানবাধিকারের বিষয়টিকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে বিজেপি এখন রোহিঙ্গা মুসলমানদের অনুপ্রবেশের আতঙ্ক তৈরি করে গোটা পূর্ব ভারতজুড়ে একটি সামাজিক মেরুকরণকে তীব্র করে তুলতে চায়। রোহিঙ্গা প্রবেশ বাংলাদেশে বিপদ ডেকে আনবে বলে বাংলাদেশকে তিস্তার ন্যায্য পাওনা জল থেকে বঞ্চিত করা বিজেপি হঠাৎই বাংলাদেশপ্রেমী সাজার চেষ্টা করতে শুরু করে দিয়েছে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আসার ফলে সেখানে বাঙালি মুসলমানের সংখ্যা বাড়বে বলে আরএসএস তাদের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রচার করে চলেছে। গোটা পূর্বাঞ্চলে আরএসএস, বিজেপি প্রচার করে চলেছে, রোহিঙ্গা মুসলমানরা মিয়ানমার থেকে তাড়া খেয়ে দেশের পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন পথ ধরে ভারতে অনুপ্রবেশ করছে।

চলতি আর্থিক বছরের বাজেটেও তাই ক্ষমতা দখলের প্রবণতার ছাপই পরিষ্কার। নয়া উদারনীতির অন্ধ সমর্থক শক্তি তাদের সমর্থনের মূল ভিত বেনিয়া, মুত্সুদ্দি, মধ্যস্বত্বভোগীদের স্বার্থের থেকেও এখন রাষ্ট্রশক্তির প্রতিভূ হিসেবে দেশি-বিদেশি করপোরেট শক্তির প্রতি সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আত্মনিবেদিত। সেই আত্মনিবেদনের প্রতি লক্ষ রেখে কেন্দ্রীয় সরকার তৈরি করেছে বাজেট। যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার লড়াইয়ের সুরাহার বিন্দুমাত্র আশ্বাস নেই। দেশের অর্থনীতিকে বাজারমুখী করার নামে রেলের ভাড়াকেও আগামী দিনে বাজারমুখী করার প্রবণতা কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের প্রথম যুগ্ম বাজেটে আমরা দেখলাম। কৃষকের উন্নতির অনেক গালভরা কথা আমরা দেখলাম। অথচ দেশের কৃষিব্যবস্থার যে ক্রমবর্ধমান সংকট দেশের কৃষিব্যবস্থাকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে, তা থেকে উত্তরণের কোনো দিশা এখানে পাওয়া গেল না।

 

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক


মন্তব্য