kalerkantho


প্রশিক্ষিত প্রতিবন্ধীরা জাতীয় সম্পদ

রিয়াজুল হক

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬১তম অধিবেশনে (১৩ ডিসেম্বর ২০০৬) প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদ অনুমোদন করা হয়। ৫০টি আবশ্যিক ধারা ও ১৮টি ঐচ্ছিক প্রতিপালনীয় বিধিবিধান সংবলিত এ সনদে বৈষম্য, উপেক্ষা, দমন-পীড়ন আর নির্যাতনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা প্রতিবাদ ও সমান অধিকারের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বেশ কিছু মৌলিক মানবাধিকারের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের এই অধিকার সনদের লক্ষ্য হলো সব প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পূর্ণ ও সমান মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা চর্চার প্রসার, সুরক্ষা ও সুনিশ্চিতকরণ। তাদের চিরন্তন মর্যাদার প্রতি সম্মান সমুন্নত করা। বাংলাদেশ ৯১তম রাষ্ট্র হিসেবে এ সনদে স্বাক্ষর ও অষ্টম শরিক রাষ্ট্র হিসেবে অনুস্বাক্ষর করেছে। ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে সারা দেশে প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপের কার্যক্রম শুরু হয়। সমাজসেবা অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণাধীন ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড কন্ট্রোল অব ভলান্টারি এজেন্সিস অ্যান্ড ডিস-অ্যাবিলিটি ডিটেকশন সার্ভে প্রগ্রাম’-এর আওতায় ১২ ধরনের প্রতিবন্ধীর ওপর পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা এখন ১৫ লাখ ১০ হাজার।

বেশ কিছুদিন আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় অদম্য সাহসী এক প্রতিবন্ধীর ঘটনা পড়েছিলাম। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দীগি গ্রামে হতদরিদ্র এক জেলেপরিবারে চুমকি রানী হালদারের জন্ম। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। মাত্র তিন বছর বয়সে চুমকি টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হলে সঠিক চিকিৎসার অভাবে চিরতরে পঙ্গু হয়ে যান।

তাঁর শারীরিক গঠন ঠিক থাকলেও দুটি পা সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়ে। পৃথিবীটা তাঁর কাছে দুঃসহ হয়ে ওঠে। মন বেশি খারাপ হলে বাড়ির পাশে রাস্তায় বসে নিজের করুণ অবস্থার কথা ভাবতে থাকেন। স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নে মনোযোগ দিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি টেইলারিং কাজ শিখে ফেলেন। বাড়িতে বসে তৈরি করছেন সালোয়ার-কামিজ, ব্লাউজসহ মহিলাদের বিভিন্ন রকম পোশাক। এলাকায় সুস্থ-সবল আরো অনেকে এ পেশার সঙ্গে জড়িত থাকলেও চুমকির কাজের মান ভালো হওয়ায় তাঁর কাছে লোকজন বেশি কাজ দেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর কাজের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। চুমকির মনের শক্তি ও কাজ করার মনোবল দেখে ২০১১ সালে সুস্থ-সবল-কর্মঠ পরিতোষ হালদার তাঁকে বিয়ে করেন। এখন স্বামী-সংসার নিয়ে চুমকি ভালো আছেন। শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও তিনি কারো ওপর নির্ভরশীল নন। বরং তাঁর আয়ের ওপর পরিবারের অনেকে নির্ভর করছে।

চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, দারিদ্র্য ও অশিক্ষা হচ্ছে প্রতিবন্ধী হওয়ার মূল কারণ এবং তা দূর করা নিঃসন্দেহে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। প্রয়োজন জাগ্রত চেতনার যথার্থ কর্মসূচি গ্রহণ। এরই মধ্যে প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাহায্যের হাত সম্প্রসারিত করেছে। প্রয়োজনের তুলনায় আয়োজন এখনো সামান্য। মূলত প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নের জন্য বহু ক্ষেত্রবিশিষ্ট ও বহু পেশাভিত্তিক কৌশল প্রয়োজন।

জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, অটিজমসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ২০০৯ সাল থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি তাদের মা-বাবা ও অভিভাবককেও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। এর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত ৪৭২ জন অভিভাবক বা মা-বাবা, অটিস্টিক শিশুসহ তিন হাজার বিভিন্ন ক্যাটাগরির প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা শহরের মিরপুর, লালবাগ, উত্তরা ও যাত্রাবাড়ীতে একটি করে, ছয়টি বিভাগীয় শহরে ছয়টি (রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রংপুর ও সিলেট), গাইবান্ধায় একটিসহ মোট ১১টি স্পেশাল  স্কুল ফর চিলড্রেন উইথ অটিজম চালু করা হয়েছে। এ স্কুল থেকে ১৫০ অটিজম শিশু বিনা বেতনে প্রি-স্কুলিংয়ের সুযোগ পাচ্ছে। মানসিক, শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য তিনটি পৃথক স্কুলসহ রয়েছে তিনটি হোস্টেল। বিশেষ শিক্ষা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজে বিএসএড (ব্যাচেলর অব স্পেশাল এডুকেশন) কোর্স চালু রয়েছে। এ কেন্দ্রে ৩০০ ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া করার সুযোগ পাচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে বিনা মূল্যে ফিজিও থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, হিয়ারিং টেস্ট, ভিজ্যুয়াল টেস্ট, কাউন্সেলিং, প্রশিক্ষণ, সহায়ক উপকরণ ইত্যাদি সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো ভ্রাম্যমাণ ওয়ানস্টপ থেরাপি সার্ভিস (মোবাইল ভ্যানের মাধ্যমে) চালু করা হয়েছে। ৩২টি ভ্রাম্যমাণ থেরাপি ভ্যানের মাধ্যমে সেবা দেওয়া হচ্ছে । প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণ ও উন্নয়নে ২০০২-০৩ অর্থবছর থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত মোট ১০ কোটি ৬৮ লাখ ৫২ হাজার ৪৯০ টাকা (অনুদান সাত কোটি ৭৮ লাখ ৭৭ হাজার ৪৯০ টাকা ও ঋণ দুই কোটি ৮৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা) প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কর্মরত বেসরকারি সংস্থার মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। দেশের প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের ক্রীড়াচর্চা ও শারীরিক ফিটনেস বজায় রাখার লক্ষ্যে সরকার জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকারের এসব উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কিন্তু আরো সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন।

প্রতিবন্ধীরা আমাদের সমাজের বোঝা নয়, তারা আমাদের সম্পদ। কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তুলতে পারলে তাদের দক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তাই সমাজের প্রতিবন্ধীদের জন্য কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে। সেখান থেকেই তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। একজন মানুষ যখন অর্থ উপার্জন করে তখন সে অন্যের বোঝা থাকে না। পরিবারের জন্য কিছু করার মাধ্যমে পরিবার, সমাজ, দেশের জন্য তার অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারবে।

উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য অটিজমবিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল ‘ইউনেসকো-আমির জাবের আল-আহমদ আল-সাবাহ পুরস্কার’ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক জুরি বোর্ডের সভায় সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এটা দেশের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। পয়লা জানুয়ারি বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল ও সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিস-অ্যাবিলিটির (সিএসআইডি) উদ্যোগে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাকরি মেলা ২০১৭ উদ্বোধন করা হয়। অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। এ রকম চাকরির মেলা দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে আরো আয়োজন প্রয়োজন। কারণ একটি দেশ তখনই উন্নত ও কল্যাণকর রাষ্ট্রে পরিণত হয় যখন প্রত্যেক নাগরিকের জন্য যথাযথ সুযোগ-সুবিধা বজায় থাকে।

২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করার পরিকল্পনা মাথায় রেখে সরকার কাজ করছে। দেশের মোট জনসংখ্যার কমপক্ষে ১০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধী। তাই টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে বিপুল এ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

 

লেখক : উপপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

riazul.haque02@gmail.com


মন্তব্য