kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো
ধা রা বা হি ক

পুত্রশোকে কাঁদতে কাঁদতে ইয়াকুব (আ.)-এর দৃষ্টিশক্তি লোপ

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পুত্রশোকে কাঁদতে কাঁদতে ইয়াকুব (আ.)-এর দৃষ্টিশক্তি লোপ

৮৪. পুত্রদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সে [ইয়াকুব (আ.)] বলল, ‘আফসোস ইউসুফের জন্য!’ শোকে তার চক্ষুদ্বয় সাদা হয়ে গিয়েছিল এবং সে ছিল অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট। (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৮৪)

তাফসির : আগের আয়াতে বলা হয়েছিল, হজরত ইয়াকুব (আ.) বিনিয়ামিনের ব্যাপারে পুত্রদের বক্তব্য শোনার পর বলেন, মনে হচ্ছে তোমাদের কুপ্রবৃত্তি আরেকটি নিন্দনীয় কাজকে তোমাদের চোখের সামনে সুন্দররূপে তুলে ধরেছে। ইউসুফকে হারিয়ে আমার যে মর্মজ্বালা, বিনিয়ামিনকে মিসরে রেখে তোমরা তা আরো বাড়িয়ে দিয়েছ। কিন্তু আমি অসহিষ্ণু হতে চাই না। আমি ধৈর্য ধারণ করব। আশা করি, মহান আল্লাহ তাদের সবাইকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনবেন।

আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে, হজরত ইয়াকুব (আ.) পুত্রদের হারিয়ে ভীষণ মানসিক কষ্টে দিনযাপন করছিলেন। মনস্তাপ ও চোখের পানিতে তাঁর চোখ সাদা হয়ে গিয়েছিল। তাঁর দৃষ্টিশক্তি লোপ পেয়েছিল।

বিনিয়ামিনের ক্ষেত্রে তার বৈমাত্রেয় ভাইদের কোনো অশুভ পরিকল্পনা ছিল না। এ ক্ষেত্রে তাদের দোষীও সাব্যস্ত করা যাবে না।

কিন্তু হজরত ইউসুফ (আ.)-এর সঙ্গে তারা যে আচরণ করেছে, ইয়াকুব তা কখনোই ভুলতে পারেননি। এ জন্য তিনি এবারও পুত্রদের কথা বিশ্বাস করতে পারেননি। তার পরও তিনি আল্লাহর ওপর নির্ভর করে ধৈর্য ধারণ করার সিদ্ধান্ত নেন।

ইয়াকুব (আ.) বিষয়টি নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে বিশদ কথাবার্তা বলা থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। তিনি আল্লাহর কাছেই নিজের সব আকুতি বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আদরের সন্তান ইউসুফের স্মৃতিই এখনো ভুলিনি, তাকে হারানোর কষ্টই এখনো দূর হয়নি। অথচ এরই মধ্যে বিনিয়ামিনকে হারাতে হলো। পুত্র ইউসুফ (আ.)-এর শোক সততই তাঁকে ঘিরে রাখত। তিনি বলেছেন, আফসোস! হায় আফসোস! ইউসুফের জন্য আফসোস! এভাবে তিনি অনেক বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি এত বেশি কেঁদেছিলেন যে তাঁর চোখ দুটির স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি লোপ পেয়েছিল। কিন্তু তিনি কারো কাছে নিজের মনোবেদনা প্রকাশ করতেন না। কারো কাছে এই অস্থিরতার কথা বলতেন না। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি নিজের ক্রোধ সংবরণ করে এবং শক্তি থাকা সত্ত্বেও ক্রোধ প্রকাশ করে না, আল্লাহ তাকে বড় পুরস্কার দান করবেন। ’ ইমাম ইবনে জারির (রহ.) এ প্রসঙ্গে আরেকটি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিপদের সময় ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলা শুধু মহানবী (সা.)-এর উম্মতের বৈশিষ্ট্য। যেকোনো বিপদাপদ, দুঃখকষ্ট থেকে মুক্তিলাভের ক্ষেত্রে এ দোয়াটি অত্যন্ত কার্যকর। ইয়াকুব (আ.) কঠিনতর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও ইন্না লিল্লাহি... বাক্যটির বদলে ‘য়া আসাফা আলা ইয়ূসুফা’ বলেছেন। (তাফসিরে ইবনে জারির)

তাফসিরে মাজহারিতে এ বিষয়ে একটি প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বলা হয়েছে, সন্তানের প্রতি ইয়াকুব (আ.)-এর এত ভালোবাসা কেন ছিল? অথচ তিনি আল্লাহর নবী ছিলেন। আর কোরআন শরিফে সহায়সম্পদ ও সন্তানাদিকে ‘ফেতনা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এর জবাবে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ইউসুফ (আ.) সাধারণ কোনো সন্তান ছিলেন না। তাঁর অতুলনীয় সৌন্দর্য, গুণ-গরিমার পাশাপাশি নবীসুলভ পবিত্রতা ও চারিত্রিক সৌন্দর্য ছিল। তাঁর জন্য চিন্তা করা, ভালোবাসায় বিভোর থাকার সঙ্গে পরকালীন বিষয় জড়িত ছিল। তা ছাড়া তাঁদের মধ্যে যা কিছু ঘটেছিল, সবই আল্লাহর মহাপরীক্ষার অংশ ছিল। পিতা-পুত্র দুজনই আল্লাহর নবী ছিলেন। (তাফসিরে মাজহারি)

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য