kalerkantho


ডিজিটাল বাংলাদেশের উপযোগী রাজনীতি চাই

আয়মন আকবর চৌধুরী

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ডিজিটাল বাংলাদেশের উপযোগী রাজনীতি চাই

দ্রুত বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ। শুধু শহর নয়, গ্রামেও লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া।

উন্নয়নের ক্ষেত্রে বৈষম্য কমছে। মাথাপিছু আয় ও সাক্ষরতার হার বাড়ছে, দারিদ্র্য কমে যাচ্ছে। অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্য দিয়ে দ্রুত বদলে যাচ্ছে গ্রামবাংলা। বাংলাদেশ এখন বৈদেশিক সাহায্যনির্ভরতা কমিয়ে নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতুসহ বহু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরেও মাথাপিছু আয় যেখানে ছিল মাত্র ৫৪৩ ডলার, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪৬৬ মার্কিন ডলার। দীর্ঘদিন মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৬ শতাংশের বৃত্তে আটকে ছিল, যা স্বাধীনতার পর এই প্রথম আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বতর্মান সরকার সব রেকর্ড ভেঙে ৭ শতাংশে নিতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি জিডিপির ভিত্তিতে বিশ্বে ৪৪তম। দেশের ৫০ বছর পূর্তিতে ২০২১ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এভাবে এখন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর ঘটছে। শ্রমনির্ভর জাতি থেকে ক্রমান্বয়ে মেধানির্ভর জাতি হিসেবে আমাদের রূপান্তরের অভিযাত্রা সফল করতে সবচেয়ে বেশি দরকার আমাদের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন। মানুষের মধ্যে উন্নয়নের সুফল সমানভাবে পৌঁছে দিতে ডিজিটাল বাংলাদেশের উপযোগী রাজনৈতিক চর্চা প্রয়োজন।

বাঙালি জাতির স্বপ্নপুরুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন লালিত স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলা। সমৃদ্ধ ও উন্নত সেই সোনার বাংলার আধুনিক রূপ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য বাস্তবায়িত হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বেই। তথ্য-প্রযুক্তির যথাযথ ও কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে একটি জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ভিশন-২০২১ ঘোষণা করেন। সঠিক নেতৃত্ব, সাহসিকতা, কৌশল ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা—এই চারটি জিনিস যদি ঠিক থাকে তাহলে যেকোনো জাতি বিপ্লব ঘটাতে পারে। আমাদের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আছে, আছে সাহস। এখন প্রয়োজন কৌশল ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার।

অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, রাজনীতিতে আবার কিসের উদ্ভাবন? অবশ্যই প্রয়োজন। কারণ দেশের যে নতুন প্রজন্ম তারা রাজনীতিতেও উদ্ভাবন চায়। আমি দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী ফোরামের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে আমাদের অর্থনীতির প্রাণশক্তির জোগানদাতা প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের নানা দাবি, আইডিয়ার কথা শুনেছি।

ছাত্রজীবনে যে ছাত্রলীগের রাজনীতিকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ হিসেবে নিয়েছি, ২২ বছর পর দেশে ফিরে কাউকে কাউকে সেই আদর্শচ্যুত হতে দেখেছি। আমার বাবা ভাষাসৈনিক মরহুম গোলাম আকবর চৌধুরী ভাষার জন্য ত্যাগ শিকার করেছেন। মা সংসদ উপনেতা ও প্রাজ্ঞ রাজনীতিক সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। আমি সেই মায়ের সন্তান হিসেবে ১৯৬৬ সালেই রাজনীতিতে যোগ দিয়েছি। এখন শুধু ভাবি, আমরা নতুন প্রজন্মের জন্য রাজনীতিতে কী গুণগত পরিবর্তন আনতে পারি! এই ভাবনার সঙ্গে বাস্তবতার মিল রেখেই কিছু করা সম্ভব।    

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের কারণে আমরা যে বিশাল তরুণ গোষ্ঠী পেয়েছি, তাদের ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে তৈরি করতে হবে। আমাদের স্বল্পমেয়াদি সুবিধার কথা চিন্তা না করে দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশ কোথায় যাবে সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক জ্ঞানে শিক্ষিত করার মাধ্যমে একটি জ্ঞাননির্ভর সমাজ তৈরি করতে হবে। একটা সময় ছিল যখন আমরা জনশক্তি রপ্তানিতে কায়িক শ্রমকে প্রাধান্য দিতাম। কিন্তু আমরা একটি মেধানির্ভর জাতি তৈরি করতে চাচ্ছি। এ জন্য আমাদের তরুণদের কর্মসংস্থান, তাদের চাওয়া-পাওয়া পূরণ করতে হলে আমাদের রাজনীতি থেকে ‘লাঠিয়াল’ সংস্কৃতিকে বিদায় জানাতে হবে। অবশ্যই রাজনীতিতে আদর্শের চর্চা বাড়াতে হবে। আদর্শবান, নীতিবান, সম্মানিত মানুষদের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে হবে।

পুরনো অনেক রাজনীতিক আছেন, তাঁদের কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু পাওয়ার আছে। আবার তাঁদেরও আমাদের অনেক কিছু দেওয়ার আছে। দলের প্রবীণতম ৫০ জন নেতা, যাঁরা বঙ্গবন্ধুর আমলে রাজনীতি করতেন, তাঁদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একবারও যদি বিদেশে সফরসঙ্গী হিসেবে নিয়ে যান তাহলে সেটা তাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া হবে।  

আমরা তৃণমূলের রাজনীতিকদের কথা মনে করি না। তাঁরাই নানা অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে রাজনীতি করেন। এই পুরনো সংস্কৃতি বদলে আমাদের পারস্পরিক সহাবস্থানের রাজনীতি করতে হবে। ক্ষমতা পরিবর্তনের পর যেন একদল আরেক দলের ওপর ঝাঁপিয়ে না পড়ে। যেকোনো সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সব ধরনের মানুষ আসুক। তাতে সহাবস্থানের চর্চা তৈরি হবে, যা সমাজে স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে বড় ভূমিকা রাখবে। তাহলেই ডিজিটাল বাংলাদেশের সত্যিকারের সুফল সবাই সমানভাবে পাবে।

লেখক : রাজনীতিক ও সমাজসেবক

bablu_elma@yahoo.com


মন্তব্য