kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো । ধারাবাহিক

কঠিন বিপদেও জ্বলে থাকে আশার আলো

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



কঠিন বিপদেও জ্বলে থাকে আশার আলো

৮৩. সে [ইয়াকুব (আ.)] বলল, ‘না, তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনি সাজিয়ে দিয়েছে। তাই পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়। হয়তো আল্লাহ তাদের একসঙ্গে আমার কাছে এনে দেবেন। তিনি সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়। ’ [সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৮৩ (দ্বিতীয় পর্ব)]

তাফসির : ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা বিনিয়ামিনকে মিসরে রেখে আসতে বাধ্য হয়েছে। তারা নিজেদের দেশে ফিরে এসে পিতা ইয়াকুব (আ.)-কে পুরো ঘটনা খুলে বলেছে। তার পরও পিতা বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। তিনি তাদের কথা বিশ্বাস করেননি। অথচ তাদের কথা মিথ্যা ছিল না। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনি সাজিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি অসহিষ্ণু হতে চাই না।

আমি ধৈর্য ধরব। আশা করি, মহান আল্লাহ তাদেরকে আমার কাছে এনে দেবেন। ’

এ ঘটনার ব্যাখ্যায় তাফসিরে কুরতুবিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মুজতাহিদ বা গবেষকের গবেষণাধর্মী মন্তব্য মাঝেমধ্যে ভুল সাব্যস্ত হতে পারে, এটাই স্বাভাবিক। এমনকি আল্লাহর নবী-রাসুলরাও ইজতেহাদ ও গবেষণার মাধ্যমে কোনো উক্তি করে থাকলে তা-ও সঠিক না হলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। যেমন এখানে ইয়াকুব (আ.)-এর ক্ষেত্রে হয়েছে। তিনি সন্তানদের সত্য কথা বিশ্বাস করেননি।

তবে নবী-রাসুলদের বৈশিষ্ট্য হলো, ওহির মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁদের সত্য জানিয়ে দেওয়া হয়। ভুলের ওপর তাঁরা কেউই স্থির ছিলেন না। কোনো নবী কখনো কোনো মিথ্যা উক্তি করেননি।

ইয়াকুব (আ.)-এর ঘটনার একটি ব্যাখ্যা এমনও হতে পারে, তিনি সন্তানদের কাছে শোনা কাহিনিকে মনগড়া বলে মিসরের পরিস্থিতি বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে বিনিয়ামিনের সঙ্গে কৃত্রিম চুরির ঘটনা সাজানো হয়েছিল। বিনিয়ামিন প্রকৃত অর্থে চুরি করেনি। এদিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহর নবী ইয়াকুব (আ.) বলেছেন, ‘তোমরা আমার কাছে কাল্পনিক ঘটনা বলছ। বিনিয়ামিন চুরি করেনি। ’ আলোচ্য আয়াতেই ‘আসাল্লাহু আইয়াতিয়ানি বিহিম জামিআন’ বাক্যে এর সমর্থন পাওয়া যায়। অর্থাৎ ইয়াকুব (আ.) সন্তানদের কথা শুনে মন্তব্য করেন, ‘আমার বিশ্বাস ও আশা হলো, অচিরেই আল্লাহ তাআলা তাদের প্রত্যেককে আমার কাছে নিয়ে আসবেন। ’ অন্যদিকে তাঁর সন্তানরাও বিনিয়ামিনের ঘটনা বর্ণনায় কোনো ধরনের মিথ্যার আশ্রয় নেয়নি। ইউসুফ (আ.)-এর ক্ষেত্রে তাঁর ভাইয়েরা সাজানো কাহিনি বললেও বিনিয়ামিনের ক্ষেত্রে সততা থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হয়নি। তবু ইয়াকুব (আ.) তাদের বক্তব্যে সন্তুষ্ট না হওয়ার কারণ হলো, প্রকৃত অর্থে এখানে কোনো চুরি হয়নি। বিনিয়ামিনও গ্রেপ্তার হয়নি। কথাটা যথাস্থানে নির্ভুল ছিল।

প্রশ্ন হলো, ইয়াকুব (আ.) কিসের ভিত্তিতে এ আশা করেছেন যে শিগগিরই তাঁর সব সন্তানকে তিনি ফিরে পাবেন? এ প্রশ্নের জবাবে আততাফসিরুল ওয়াসিত নামক গ্রন্থে লেখা হয়েছে : ইয়াকুব (আ.)-এর মনে আশার আলো জ্বলেছিল ইউসুফ (আ.)-এর দেখা স্বপ্নের কারণে। ছোটবেলায় তিনি স্বপ্ন দেখেছেন—চন্দ্র, সূর্য ও ১১টি নক্ষত্র তাঁকে সেজদা করছে। এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা হলো, মা-বাবা ও ইউসুফ (আ.)-এর ১১ ভাই একদিন তাঁর কাছে অবনত মস্তকে হাজির হবে। ইয়াকুব (আ.) তাঁর পুত্রের এ স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে বলে বিশ্বাস করতেন। তাই তিনি আশাবাদী ছিলেন যে অচিরেই তাঁর পুত্র তাঁর কোলে ফিরে আসবে। (আততাফসিরুল ওয়াসিত, মুজাম্মাউল বুহুস : ৫/৩৭)

উল্লিখিত প্রশ্নের জবাবে তাফসিরে তাদাব্বুরে কোরআনে এসেছে : আল্লাহর বিশেষ বান্দারা এ রহস্য সম্পর্কে সম্যক অবগত যে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের সাধ্যাতীত পরীক্ষা করেন না। এ কারণে ইয়াকুব (আ.) যখন দেখেছেন যে পরিস্থিতি সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই তিনি বুঝতে পেরেছেন যে সুখ-সাফল্য ও আশা পূরণ হওয়ার সময় বেশি দূরে নয়। ইয়াকুব (আ.) যখন দেখলেন যে একে একে ইউসুফ, বিনিয়ামিন ও ইয়াহুজা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেছে। তাই তিনি এ আলো দেখতে পেলেন যে সবার সমবেত হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। (তাফসিরে তাদাব্বুরে কোরআন)

 

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য