kalerkantho


লোভী ডাক্তার এবং কিডনি চুরি প্রসঙ্গ

ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সম্প্রতি দুটি ঘটনা সারা দেশে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। একটি হলো, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার বাংলা প্রশ্নপত্রে ‘জাহেদ সাহেব একজন লোভী ডাক্তার’ শীর্ষক একটি বাক্য লেখা হয়েছে।

অপর একটি বিষয়, নাটোরে এক ব্যক্তির কিডনি চুরি হয়েছে এবং তাতে নাকি এক চিকিৎসক জড়িত! চিকিৎসকদের প্রতি এ ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির নমুনা দেখে সারা দেশের চিকিৎসকদের সঙ্গে আমিও সমভাবে আহত, লজ্জিত ও ক্ষুব্ধ।

প্রশ্নপত্রে ‘জাহেদ সাহেব একজন লোভী ডাক্তার’ শীর্ষক আলোচনাটি একদিকে যেমন চিকিৎসকসমাজকে হেয় করেছে, তেমনি কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের জীবনের শুরুতেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি অনাগ্রহী করে তুলছে। পাশাপাশি জাহেদ সাহেব নামধারী চিকিৎসকদের সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করেছে। পেশাগতভাবেও তাঁদের চিকিৎসা কার্যক্রম প্রদানে প্রতি পদে পদে অপদস্থ হতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো, কেন এই মহান পেশা ‘চিকিৎসাসেবা’কে হেয় করার ইচ্ছা হলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের? কী উদ্দেশ্য রয়েছে এর পেছনে। এটা কি কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ, নাকি সমষ্টিগত? উত্তর খোঁজাটাও জরুরি। প্রশ্নপত্র চূড়ান্ত করার আগে কি কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এই আপত্তিকর প্রশ্নটি চোখে পড়েনি, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁরা এড়িয়ে গেছেন বিষয়টি? যেভাবেই হোক, এতে একটি কৃত্রিম সংকট নতুনভাবে সৃষ্টি হয়েছে। অবশ্যই এর দায়ভার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের নিতে হবে।

চিকিৎসক ও চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি অতিমাত্রায় নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশন, যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো নিম্নমানের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন, কিছু কিছু চিকিৎসকের অপেশাদার মনোভাব, এ ধরনের প্রশ্ন সৃষ্টিতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।

ফলে এ দেশ থেকে প্রতিনিয়ত রোগীরা ‘ভালো ব্যবহারের’ আশায় বিদেশ ছুটছে, দেশ হারাচ্ছে বড় অঙ্কের রাজস্ব। কেননা পরিসংখ্যান বলছে, চিকিৎসা ব্যয়ে প্রতিবছর প্রায় দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এত শব্দ থাকতে একজন ডাক্তারকে লোভী বলতে ইচ্ছা হলো কেন? একজন ডাক্তারের লোভী হওয়ার কোনো প্রয়োজন কিন্তু নেই। স্বাভাবিক নিয়মে যদি একজন চিকিৎসক তাঁর অফিশিয়াল কাজের বাইরে বিকেলে দৈনিক ১০ জন রোগী দেখেন, তাতেই তাঁর অভাব থাকার কথা নয়। আর ‘লোভ’ কথাটি একটি আপেক্ষিক শব্দ। সব পেশায়ই এই লোভ প্রভাব বিস্তার করছে। এটি আলাদাভাবে চিকিৎসকের নামের পাশে জুড়ে দিয়ে বাড়তি কোনো ক্রেডিট পাওয়ার সুযোগ নেই। তবে এটাও ঠিক যে কিছু কিছু চিকিৎসকের ব্যক্তিগত আচরণ পুরো চিকিৎসকসমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে।

সম্প্রতি নাটোরের একটি হাসপাতালে একজন রোগীর স্বজনরা চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কিডনি চুরির অভিযোগ এনেছে। একজন চিকিৎসক হিসেবে আমার কাছে এটি একটি হাস্যকর ও বাস্তবতাবিবর্জিত খবর; যদিও বেশ ফলাও করে পত্রপত্রিকায় খবরটি প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই চিকিৎসক কেন ওই কিডনি চুরি করবেন? এই কিডনি কি কোথাও তিনি লাখ টাকা মূল্যে বিক্রি করতে পারবেন? এর উত্তর অবশ্যই ‘না’। তাহলে কেন তাঁর বিরুদ্ধে এই অপবাদ, অভিযোগ, পুলিশি আক্রমণ? আসলে পুরো বিষয়টি হচ্ছে, ভুল বোঝাবুঝি ও কাউন্সেলিংয়ের যথেষ্ট অভাবে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম হলো, কেউ যদি স্বেচ্ছায় কোনো স্বজন বা কিডনি রোগীকে প্রতিস্থাপনের জন্য একটি কিডনি দান করতে ইচ্ছুক হন, তবে অনেক আইনগত ও মেডিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে তাঁকে কিডনি দান করতে হবে। তা-ও এমন হাসপাতালে অপারেশন করতে হবে যেখানে সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ, ডায়ালিসিস সুবিধা, ট্রান্সপ্লান্ট সুবিধাসহ পাশাপাশি দুটি অপারেশন থিয়েটারে একই সময়ে ডোনার ও রিসিপিয়েন্টকে (যিনি কিডনি গ্রহণ করবেন) অপারেশনের সব সুবিধা থাকতে হবে। এটা একমাত্র রাজধানীর নামকরা কিছু হাসপাতালেই এখন সম্ভব হচ্ছে, নাটোরের কোনো হাসপাতালে তার প্রশ্নই ওঠে না।  

এ তো গেল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার বিষয়টি। এবার সহজ কথায় আসি। যেহেতু কিডনি চুরি করে নাটোরে অপারেশনের সুযোগ নেই, তাহলে বাকি রইল কেজি দরে বিক্রি করার বিষয়টি অথবা অ্যানাটমি মিউজিয়ামে ফরমালিন দিয়ে কাচের জারে মেডিক্যাল কলেজে দান করা। তবে এত কিছু ওই চিকিৎসকের করার দরকারটাই বা কী? এর জন্য তো বেওয়ারিশ লাশ ও কিডনি পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, অভিযোগটি অবৈজ্ঞানিক, ইচ্ছাকৃত, কাউকে হেয় ও বিব্রত করার জন্য। তবে রোগীর বিশেষ প্রয়োজনে, স্বজনের অনুমতি সাপেক্ষে (Non-Functioning Kidney/কার্যক্ষমতাহীন কিডনি) ফেলে দেওয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত, যা সারা পৃথিবীতেই স্বীকৃত। এতে চোর-পুলিশ খেলার কোনো সুযোগ নেই। অতীতে ‘কিডনি’ চুরি নিয়ে নেতিবাচক খবর প্রচারের কারণে এখন বাংলাদেশে কিডনি প্রতিস্থাপন প্রায় বন্ধের পথে। এতে কিন্তু প্রকৃত রোগীরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যে দেশে মাত্র দুই লাখ টাকায় কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট সম্ভব ছিল, পার্শ্ববর্তী দেশে কমপক্ষে তা করতে লাগছে ছয় থেকে সাত লাখ রুপি। কতজন রোগীর পক্ষে তা সম্ভব? ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিন্তু সাধারণ রোগীরাই।

এ কথা সত্য যে এত অভিযোগের ভিড়েও এ দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় গত এক দশকে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। পৃথিবীর কোনো দেশে এত স্বল্পমূল্যে উন্নত চিকিৎসা প্রদানের রেওয়াজ নেই। এ জন্য প্রয়োজন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও দেশপ্রেম। চিকিৎসক হিসেবে আমি নিজেও জবাবদিহির পক্ষে। তবে তা যেন অযৌক্তিক না হয়। সরকারের কাছে অনুরোধ, রোগীর স্বজনদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা হোক। না হলে নেতিবাচক ঘটনা ঘটতেই থাকবে, ভেঙে পড়বে এ দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা।

 

লেখক : ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল, মহাখালী, ঢাকা

amshltd@gmail.com


মন্তব্য