kalerkantho


নতুন নির্বাচন কমিশন, মৌন জনসমর্থন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নতুন নির্বাচন কমিশন, মৌন জনসমর্থন

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বাংলাদেশের ১১তম নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন করেছেন। সংবিধানের ক্ষমতাবলে তিনি সরকারের সুপারিশমতোও কাজটি করতে পারতেন, যা অতীতে কোনো কোনো সরকারের আমলে করা হয়েছিল।

তবে শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে (১৯৯৬-২০০১) তত্কালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অনেকটাই স্বাধীনভাবে এম এ সাঈদের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন গঠন করেছিলেন। আবার শেখ হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০৯-২০১৩) রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান অনুসন্ধান কমিটি গঠনের মাধ্যমে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে দশম নির্বাচন কমিশন গঠন করেছিলেন। তাতে কোনো ধরনের সমালোচনা ছাড়াই কমিশন গঠন সম্পন্ন হয়। শেখ হাসিনার বর্তমান তৃতীয় মেয়াদে (২০১৪-২০১৮) একাদশ নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রাক্কালে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদও একই পন্থা অনুসরণের মাধ্যমে যে নামের তালিকা পেয়েছেন তা থেকে সাবেক সচিব কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের যে কমিশন গঠন করেছেন তা বাংলাদেশের ১১তম নির্বাচন কমিশন হিসেবে আগামী পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করবে। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি তারা শপথ গ্রহণ করার পর শুরু হবে তাদের কার্যক্রম। বলা চলে শেখ হাসিনার তিন মেয়াদের শাসনকালেই নির্বাচন কমিশন গঠনে সরকার রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতাকে উদারভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ দিয়েছে। ফলে কোনোকালেই কমিশন গঠন নিয়ে দেশে রাজনৈতিক দলগুলো ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে সরকারকে বড় ধরনের কোনো বিতর্কে জড়াতে হয়নি। আওয়ামী লীগ এদিক থেকে উদারতা প্রকাশ করেছে। বিএনপির দুই মেয়াদে দেওয়া নির্বাচন কমিশন নিয়ে রাজনৈতিক সংকটের জন্ম হয়েছিল এবং উভয় কমিশনকেই অসম্মানজনকভাবে বিদায় নিতে হয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে গভীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

সদ্য বিদায়ী কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের কমিশন নিয়ে দুই ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০১৩ সাল পর্যন্ত কমিশন সফলভাবে সব নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পেরেছিল। কেননা নির্বাচনগুলো ছিল সব দলের অংশগ্রহণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। কিন্তু ৫ জানুয়ারি এবং পরবর্তী বেশির ভাগ নির্বাচনই যেহেতু বর্জন, প্রতিহত ও একপক্ষীয় বাস্তবতার শিকারে পড়ে, তাই নির্বাচনগুলো হারিয়েছে কাঙ্ক্ষিত চরিত্র। এর জন্য মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও বৈরী অবস্থাকেই চিহ্নিত করতে হবে। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যখন মূল দলগুলো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল তখন নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত করার কোনো প্রয়োজন পড়েনি। মনে হয় এমন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে আমরা যখন নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন যথাযথ মানদণ্ডে অনুষ্ঠিত করতে না পারার দায় চাপিয়ে সমস্যার অন্তর্নিহিত কারণ ও বাস্তবতা থেকে দৃষ্টিকে অন্যত্র সরিয়ে বিজ্ঞের মতো কথা বলি তখন সমস্যা সমাধানের আশা করা মোটের ওপর অসম্ভব। অধিকন্তু তা প্রকট হওয়াই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন নিয়ে যে ধরনের অভিযোগ কোনো কোনো পক্ষ থেকে ক্রমাগত শুনতে হয়, আবার অন্য পক্ষ থেকে ভিন্ন কথা শুনতে হয়—তা বাস্তবতাকে কতটা বুঝতে, মানতে এবং করণীয় নির্ধারণ করতে সহায়ক হয়, সে প্রশ্নের কোনো সমাধান আশা করা যায় না। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভঙ্গিগত অবস্থানে যে জটিলতা রয়েছে তা যতক্ষণ পর্যন্ত বাস্তববোধ দ্বারা পরিচালিত হবে ততক্ষণ পর্যন্ত খুব বেশি কিছু অর্জনের সম্ভাবনা দেখি না। নাগরিক সমাজের ক্ষেত্রেও এ পরিস্থিতিতে বড় ধরনের আশাবাদী হওয়ার সুযোগ দেখি না।

এ মুহূর্তে নবগঠিত নির্বাচন কমিশন নিয়ে বৃহত্তর সমাজে বড় ধরনের কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া বা মনোভাব দেখি না, বরং অবস্থার গভীর পর্যবেক্ষণ এবং অবশেষে স্বস্তির মৌনতা সাধারণভাবে ফুটে উঠেছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আগাগোড়াই তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার চেষ্টা করছে; কিন্তু দলের অভ্যন্তরে বা বাইরে এর পক্ষে তেমন কোনো সাড়া পড়ার বা সমর্থনে রাস্তায় নামার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। এতে মনে হয় বিএনপির বিরোধিতার জায়গাটি খুব বেশি যুক্তিপূর্ণ হচ্ছে না। যেমন, যখন রাষ্ট্রপতি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে দিলেন তখন বিএনপির মহাসচিব ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব তীব্র ভাষায় সার্চ কমিটিকেই বিতর্কিত করার চেষ্টা করলেন, তাদের কাছ থেকে সরকারের সমর্থকদের নিয়ে কমিশন গঠনেরও দুরভিসন্ধি হিসেবে ভবিষ্যদ্বাণী করলেন। কিন্তু দেশবাসী সার্চ কমিটির কার্যক্রমে তেমন কোনো প্রবণতা দেখেনি। ফলে বিএনপির দিক থেকে উত্তেজনা ছড়ানোর লক্ষ্য শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়নি। অবশেষে ৬ ফেব্রুয়ারি যখন নতুন কমিশন রাষ্ট্রপতি অনুমোদন দিলেন তখন তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেওয়ার মতো কিছু বোঝা গেল না। কেননা সার্চ কমিটি দুই ধরনের প্রতিনিধি নিয়ে ১০ সদস্যের নাম রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছিল। রাষ্ট্রপতি তা থেকে যে পাঁচজনকে নিয়োগ দিলেন তাঁরা সবাই অবসরপ্রাপ্ত এবং বৃহত্তর সমাজে মোটেও পরিচিত কোনো ব্যক্তি ছিলেন না। কেননা তাঁরা কেউই নাগরিক সমাজ বলে পরিচিত কোনো সংগঠনের সঙ্গেও জড়িত নন, তাঁদের রাজনৈতিক দলীয় কোনো পরিচয় তো দূরে থাক, নাগরিক সমাজের কোনো সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। মনে হয় যেহেতু বাংলাদেশে দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠনের একটা আওয়াজ বেশ জোরেশোরে উঠেছিল, তাই রাষ্ট্রপতির কাছে প্রস্তাবিত ১০ জনের মধ্যে পাঁচজনের যেকোনো ধরনের সংগঠন পরিচিতি নেই তাঁদেরই তিনি অনুমোদন দিয়েছেন, যাঁদের পরিচিতি রয়েছে তাঁদের নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নানা সমালোচনা শুরু হতে পারে—এমন সম্ভাবনা থেকেই তাঁদের নাম পরিহার করা হয়েছে হয়তো। এক অর্থে রাষ্ট্রপতি দলনিরপেক্ষ ব্যক্তি বাছাইয়ের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে রাষ্ট্রপতি যথার্থ কাজই করেছেন। তার পরও মিডিয়ায় নাম প্রকাশিত হওয়ার পর বিএনপির পক্ষ থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে কে এম নুরুল হুদার বিরুদ্ধে জনতার মঞ্চের নায়কের অভিযোগ তোলা হয়, এমনকি রুহুল কবীর রিজভী তো তাঁকে পদ থেকে সরে যাওয়ারও দাবি করেন। অথচ কোনো মহল থেকেই বিএনপির দাবির পক্ষে কোনো সত্যতা তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। তার পরও রুহুল কবীর হাওয়ার ওপর নির্ভর করে অভিযোগ তুলে নানা দাবি করে যাচ্ছেন। কিন্তু তাঁর এসব দাবির প্রতি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সমর্থন রয়েছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জনতার মঞ্চ করেছেন তার সপক্ষে তথ্য-উপাত্ত এ পর্যন্ত দেখাতে পারেননি। তবে তাঁকে চারদলীয় জোট সরকারের সময় ওএসডি করে রাখা হয়েছিল—এমন তথ্য জানার পর সাধারণ মানুষের কাছে বিএনপির ভাবমূর্তি বাড়েনি, বরং কমেছে। অধিকন্তু কে এম নুরুল হুদা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন—এ তথ্য জানার পরও তাঁর বিরোধিতা করায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিএনপির অবস্থান অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে গেল। হুদা সাহেবের দেশপ্রেমের অবস্থান জানার পরও যখন তাঁর পদত্যাগের দাবি জানানো হচ্ছে রুহুল কবীর রিজভীর পক্ষ থেকে তখন কেউ যদি প্রশ্ন করে যে একজন স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তির নাম হলে কি রিজভীর কোনো প্রতিক্রিয়া থাকত? তবে একটি বিষয় কিছুতেই স্পষ্ট নয় যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম যখন বলেন, বিএনপি সিইসির কার্যক্রম আরো কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেবে।

অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব প্রতিদিন কমিশনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উত্থাপন করছেন, তখন বুঝতে সমস্যা হচ্ছে কোনটা বিএনপির আসল সিদ্ধান্ত, কোনটা কৌশলগত সিদ্ধান্ত। তবে আসল কি নকল তা নিয়ে বেশি খোঁজাখুঁজিতে ব্যস্ত না থেকে নতুন নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর কিভাবে তাদের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করে তা দেখার অপেক্ষায় কমবেশি সবাই রয়েছে। দেশের মানুষ ভালোভাবে বুঝতে পারছে যে এর থেকে স্বচ্ছ উপায়ে আপাতত কমিশন গঠনের কোনো সাংবিধানিক বিধান নেই। আওয়ামী লীগ সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে কমিশন গঠন করতে রাষ্ট্রপতিকে সুযোগ করে দিয়েছে। সরকার ইচ্ছা করলে তা না-ও করতে পারত। কিন্তু যেকোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষই বুঝতে পারছে যে সরকার একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনে দোদুল্যমানতা প্রদর্শন করেনি, লুকোচুরিও খেলেনি। রাজনৈতিক দলগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে এমন একটি কমিশন গঠনে আওয়ামী লীগের অনীহা নেই, যে কমিশনে দলীয় পরিচয়হীন যোগ্য ব্যক্তিদের সমাবেশ ঘটবে। আওয়ামী লীগ এককভাবে কিছু করতে গেলে এখনই বিরোধীদের হাতে সমালোচনার ইস্যু তুলে দেওয়া হতো। অতীতে বিএনপি যে ভুল করেছিল, সেই ভুল আওয়ামী লীগ করতে চায়নি। তারা অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য উপায় উদ্ভাবন ও কার্যকর করেই পরিস্থিতিকে স্বস্তিদায়ক রেখেছে। এটা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয় বহন করে। তবে রাজনীতির বিশ্লেষক মহল কতটা সেই ক্রেডিট সরকারকে দেবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

শুধু তা-ই নয়, রাষ্ট্রপতি অনুসন্ধান কমিটির প্রস্তাবিত নাম থেকে পাঁচজনকে বাছাই করার ক্ষেত্রে দেরি করে নামের তালিকা নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনার অবকাশ সৃষ্টির সুযোগ দিতে চায়নি এ কারণে, তাহলে নামগুলো নিয়ে নানাজনের নানা ছিদ্রান্বেষী মতামতে অনেক কিছুই লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে পারত, তেমন বাক্স খুলে দিলে তা বন্ধ করার দায়িত্ব কে নিত—সেটি বোঝা মুশকিল। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, অনুসন্ধান কমিটি নামের তালিকা দেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি তাড়াহুড়া করে পাঁচজনের নাম অনুমোদন না করে প্রচারমাধ্যমে নামগুলো প্রচারের ব্যবস্থা করতে পারতেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ভালো, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সে ধরনের কিছু ঘটলে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের মধ্যে কোনো আঁতাতের গন্ধ খোঁজার মানুষ দেশে কম নেই, নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কথাবার্তা বলার সুযোগ ঘটত, আবার নাগরিক সমাজের কোনো কোনো প্রতিনিধি নাগরিক সমাজের কাউকে না রাখায় ক্ষোভ বা হতাশা প্রকাশ করতেন। তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলছি, নাগরিক সমাজ  যাঁদের বলা হচ্ছে তাঁরা অনেক বেশি পরিচিত ব্যক্তি, নানা সংগঠনের নামে তাঁরা পরিচিতও বটে। তাঁদের চরিত্র হনন বা রাজনীতির সংশ্লেষ খোঁজাখুঁজি হতে মোটেও দেরি হতো না। যে পাঁচজনকে নিয়ে রাষ্ট্রপতি কমিশন গঠন করেছেন, তাঁদের প্রধানকে নিয়ে এরই মধ্যে বিএনপি যে অভিযোগ করেছে, সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে পদে না বসার আগেই সিইসির পদত্যাগ দাবির মতো অসৌজন্যমূলক বক্তব্য দেওয়াটি ভাবনার বিষয়।

আসলে আমাদের দেশে কোনো ব্যক্তির গুণাগুণকে শ্রদ্ধা করতে অনেকেই অভ্যস্ত নয়, আবার অনেকেই আছেন কোনো বিশেষ পদে অবস্থান করলে নিজের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। যাঁরা সত্যি মেধাবী, যোগ্য, সৃজনশীল, দক্ষ, তাঁরা পদকে কলঙ্কিত করতে চান না, অলংকৃত করতেই চেষ্টা করেন। তবে এক শ্রেণির মানুষ আছে তারা তাদের পর্যায়ে অন্যকেও বিচার করতে, নামাতে পছন্দ করে। তা ছাড়া মনে রাখতে হবে, নির্বাচন কমিশন একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও এটিকে কলঙ্কিত করতে অনেকেই ভূমিকা রেখেছে, আয়নায় তাদের চেহারাটা দেখার সময় এসে গেছে। সবাই যদি প্রতিষ্ঠানটিকে গতিশীল রাখা, কার্যকর ভূমিকা পালনে আন্তরিক হয়, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত করার জন্য নিজেদের যথাযথ ভূমিকা রাখে, কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটাতে মোটেও প্রস্তুত নয়, অন্যের ভূমিকাকেও বাস্তবতার নিরিখে দেখে, নির্বাচনে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় না দেয়, ‘হারিজিতি নাহি লাজ’ দর্শনে আস্থাশীল হয়, তাহলে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন অনেক আগেই পুরোপুরি কার্যকর হতে পারত। নির্বাচনকে প্রভাবিত করা, নিজে জেতা, ধর্ম, অর্থ, অস্ত্র, ক্যাডার ইত্যাদি হাজার রকম অপশক্তিকে ব্যবহার করে হলেও অনেকেই নির্বাচনে জিততে চায়, ক্ষমতায় যেতে চায়—এ ধরনের মানসিকতা প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে ক্রমাগত বেড়েছে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে এককভাবে নির্বাচন কমিশন কতটা সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারবে—তা নিয়ে ভাবলে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ হয়ে পড়ে।

আমাদের নির্বাচনব্যবস্থার অভ্যন্তরে অনিয়ম, দুর্নীতি, শক্তির প্রয়োগ, অর্থের ছড়াছড়ি, ভোট জালিয়াতি ইত্যাদি বিষয় মোটেও অজানা নয়। এগুলো রোধে বড় বড় দলের প্রতিদ্বন্দ্বীরা কতটা আন্তরিক, সেটিও প্রশ্নবোধক হয়ে আছে। নির্বাচনব্যবস্থাকে অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য সব করণীয় নির্ধারণ ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে, নির্বাচন কমিশনের মেরুদণ্ড আছে কি নেই, তা নিয়ে টানাটানি করার কৃতিত্ব অনেক নেওয়া হয়েছে; কিন্তু তাতে নিজেদের মেরুদণ্ডটাও যে ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে, সেটিই প্রমাণিত হচ্ছে। আসলে দরকার হচ্ছে আমাদের নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে গড়ে ওঠার সব প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেওয়া এবং অভিজ্ঞ, মেধাবী ও যোগ্য লোকদের দায়িত্বে রাখা। বাংলাদেশে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান এ সংকটে ভুগছে। আমাদের এখন বিদেশ থেকে যোগ্য, দক্ষ ও মেধাবী বিশেষজ্ঞ এনে অনেক প্রতিষ্ঠান চালাতে হচ্ছে। তাই নির্বাচন কমিশনের পাঁচজন ব্যক্তি যোগ্য ও মেধাবী হলেই সব কিছু পরিবর্তিত হয়ে যাবে—তেমনটি হয়তো বেশি বেশি আশা করা হবে। তার পরও বলব, যাঁদের এখন অনুসন্ধান করে আনা হয়েছে তাঁদের কাজ করতে দিন, গভীর নজরদারিতে রাখুন। তাঁদের ভূমিকা দেখেই বলব তাঁরা যোগ্য, নাকি অক্ষম, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের কারণে তাঁরা এগোতে পারছেন না। বিষয়গুলো দেখার জন্য অপেক্ষার দরকার, একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান কাজ হওয়া উচিত গণতন্ত্রের সঙ্গে সংগতি নয় এমন কোনো শক্তিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিয়ে প্রকৃতই অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। জনগণ সে ধরনের বিশ্বাস থেকে নির্বাচন কমিশন গঠনে মৌন সম্মতি প্রদর্শন করছে, এটিকে আস্থায় নেওয়ার জন্য কমিশন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে—সেটিই প্রত্যাশিত।

 

লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

patwari54@yahoo.com


মন্তব্য