kalerkantho


তরুণসমাজ ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ

এ এস এম সাজ্জাদ হোসাইন

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অনেকের মতে, বর্তমানে দেশের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় কিশোর বা তরুণসমাজের বিপথগামিতা। আমি এই মতের সঙ্গে বেশ দ্বিমত পোষণ করি এবং দ্বিমত পোষণের পক্ষে অনেক যুক্তি আমার কাছে আছে।

এখনকার কিশোর, তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে আমাদের মতাদর্শের কিছুটা পার্থক্য থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। এর জন্য তাদের বিপথগামী আখ্যায়ন করা ঠিক না। বর্তমান প্রজন্মের অনেক কর্মকাণ্ডই আমাকে আশান্বিত করে। চলমান সময়ের স্বরূপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এ দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি চিহ্নিত অংশ, যারা আশাবাদী বা উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত। বাস্তবতাবিবর্জিত কিংবা কল্পবিলাসী চেতনায় তাদের সহজাত ভাবনার জায়গাটা একটি ক্ষুদ্র গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়নি। তাদের মনোজগতের, সৃজনশীল, আত্মনির্ভশীল ও উন্নয়নমুখী রূপ আর তার সম্ভাব্য বাস্তবতা সামনে চলে এসেছে। তাদের অনেকেই গতানুগতিক চিন্তা থেকে ভিন্ন ধরনের উন্নয়নমূলক, বাস্তবধর্মী চিন্তা করে। তাদের অনেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন আত্মকর্মসংস্থানমূলক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তাদের মধ্যে অনেকেই টিউশনি করছে, যা আত্মকর্মসংস্থানের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। কেউ কেউ স্বল্প পুঁজির ব্যবসা করছে, কেউ বা আবার ইন্টারনেটে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করছে। আমরা অনেকেই হয়তো জানি না, বৈদেশিক মুদ্রা আমদানিতে এ ক্ষেত্রটা বেশ বড় ভূমিকা রাখছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে এই আউটসোর্সিং বর্তমানে গার্মেন্টশিল্প, চামড়াশিল্প ও প্রবাসী আয়ের পাশাপাশি আউটসোর্সিং খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যা অনেকেরই অজানা। আউটসোর্সিংয়ের ব্যবসাটা তরুণদের দ্বারাই পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত। প্রথাগত ধারণার বাইরে এসে বেশ কিছু তরুণ আউটসোর্সিংকে আমাদের দেশে জনপ্রিয় করছে, যেটা বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে এ খাত আরো অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। তথ্য-প্রযুক্তিতেও আমাদের তরুণরা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশই আমাদের তরুণদের কাছ থেকে তথ্য-প্রযুক্তি সেবা কিনছে। উন্নত দেশ থেকে কোনো ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই আমাদের এই বৃহৎ যুবশক্তি। একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, একদল তরুণ ভিন্ন ধরনের একটি তথ্য-প্রযুক্তির অফিস চালু করেছে, যেখানে তারা ওয়েবসাইট তৈরির জন্য টেল্পলেট তৈরি করছে, এগুলো দেশে-বিদেশে বিক্রি হচ্ছে। তাই ওয়েবসাইট তৈরি করা এখন আর কঠিন কাজ না। বড় পরিসরে এ ধরনের উদ্যোগ আমাদের দেশে এটাই প্রথম। সেখানে পার্টটাইম কাজ করে অনেক তরুণ। এখান থেকেও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হচ্ছে। তাদের অনুসরণ করে অনেকেই এ ধরনের কাজে এগিয়ে আসছে। আর এসবই সম্ভব হয়েছে তরুণসমাজের এগিয়ে এসে পথ দেখানোর কারণে। বর্তমানে অনেক তরুণই পড়াশোনার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বায়িং হাউসে পার্টটাইম চাকরি করছে। অনেকেই আবার এসংক্রান্ত ক্ষুদ্র পুঁজির ব্যবসা করছে। কেউ কেউ আবার স্টকলট রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করছে।

কৃষি খাতে তরুণরা অনেক এগিয়ে এসেছে, কিছুদিন আগেও আমাদের দেশে এই চিত্র ছিল না। কৃষি খাতে তরুণদের এই অংশগ্রহণে অনেক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হয়েছে, যেটা পরিণত হয়েছে কৃষি বিপ্লবে। এ কারণে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারছি। কিছুদিন আগেও খাদ্য আমদানিতে আমাদের প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হতো। কিছু তরুণ অনলাইনে বিভিন্ন প্রকারের ব্যবসা করছে। বর্তমানে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া অনেক তরুণ-তরুণী এখন এ ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মাধ্যমে দেশের হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন পণ্য দেশে-বিদেশে বিক্রি হচ্ছে। অনেকেই হয়তো জানে যে অনলাইন কেনাবেচা একটা নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লবে পরিণত হচ্ছে। আমরা এখন প্রায় অনেক এলাকায়ই রাস্তার পাশে খাবার দোকান দেখতে পাই। এসব দোকানই তরুণ-তরুণীদের দ্বারা পরিচালিত। এতে যেমন অর্থনীতির চাকা সচল হচ্ছে; অন্যদিকে স্বল্পমূল্যে খাদ্যের সংস্থানের পাশাপাশি তরুণদের বিপথগামিতার আশঙ্কা কমছে। একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এক তরুণ ভ্যানগাড়িতে ফেরি করে কাপড় ও অন্যান্য দ্রব্য বিক্রি করছে, এক কিশোরী পার্কে বাদাম বিক্রি করছে। তার মানে আমাদের কিশোর-তরুণরা কোনো কাজকেই ছোট করে দেখছে না। আমরা শুধু প্রথাগত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে কথা বলি; কিন্তু তরুণসমাজের এই আত্মনির্ভরশীলতা, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে, সেগুলো নিয়ে কথা বলি না। তবে তরুণদের মধ্যে আমি যে উদ্যম ও কর্মস্পৃহা দেখতে পাই, তাতে মনে হয় যে তারা একাই এক শ।

আমরা যদি সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডের দিকে দেখি, দেখতে পাই যে এসব কর্মকাণ্ডে কিশোর-তরুণরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করছে। কিছুদিন আগেও এ ধরনের চিত্র এত বেশি দেখা যেত না। এখন দেশের দুর্যোগময় যেকোনো পরিস্থিতিতে তরুণরা স্বতঃস্ফূর্ত, যেভাবে তারা এগিয়ে আসছে তা আমাদের মধ্যে শক্তি ও আশার সঞ্চার করে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় বেশ কিছু তরুণ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে উদ্ধার তত্পরতায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অংশগ্রহণ করেছিল। উদ্ধারকাজ করার সময় কয়েকজন অসুস্থ হওয়ার পরও তারা উদ্ধারকাজ চালিয়ে গেছে। তাদের এই অদম্য স্পৃহা আমাদের উদ্বেলিত করে এবং এ ধরনের কাজ সত্যি প্রশংসার দাবিদার। একটি জাতীয় পত্রিকা ও টেলিভিশনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এক তরুণ দীর্ঘ সময় ধরে দুস্থ মানুষদের বিনা পারিশ্রমিকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। বিনা পারিশ্রমিকে এ তরুণের স্বেচ্ছাশ্রম মানবতার জন্য এক অনন্য ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকার পরও তরুণরা যেকোনো পেশায় সংযুক্ত হচ্ছে—এটা নিঃসন্দেহে আশার সঞ্চার করে, যা আমাদের দেশের স্বনির্ভরতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যখন কোনো দেশের তরুণ যুবসমাজ সব কাজকেই সমান সম্মানের চোখে দেখবে তখনই দেশের মূল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সম্ভব এবং সেই কাজটিই করছে এখনকার তরুণসমাজ। আজকের তরুণরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি সুশিক্ষিত বা স্বশিক্ষিত হওয়ার কারণে তারা আত্মকর্মসংস্থানসহ দেশের সামাজিক ও মানবিক উন্নয়নে অতিগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তরুণ ও যুবকরাই দেশের মূল চালিকাশক্তি। কিশোর-কিশোরীরা তাদের দেখেই উদ্বুদ্ধ হয়। তরুণদের এ ধরনের উদ্যোক্তা কিংবা মানবিক মনোভাবের কারণে দেশের অর্থনীতিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়, যা অদূর ভবিষ্যতে আমাদের একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখায়। আমাদের সম্ভাবনাময় তরুণরা গড়ে উঠবে সুশিক্ষিত হয়ে। সুস্থ চেতনার বিকাশ হওয়ায়ই ওই তরুণদের মধ্যে ভাবনার সেই জায়গাটা তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে আমি বা আমরা যে সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি, তা বাস্তবে রূপ নেবে।

সমাজের প্রত্যেক সচেতন মানুষকে তরুণদের বোঝানোর দায়িত্ব নিতে হবে। দিতে হবে অনুপ্রেরণা, তবেই কুচক্রী মহলের অব্যাহত আগ্রাসনমুক্ত সচেতন, বুদ্ধিভিত্তিক চেতনার বিকাশে সমৃৃদ্ধ হয়ে এ সম্ভাবনাময় তরুণরা গড়ে উঠবে সুশিক্ষিত হয়ে, প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে গড়ে তুলবে সোনার বাংলা। সত্য বলতে কি, আমি তাদের চোখের মধ্যেই আগামীর স্বপ্নের বাংলাদেশ দেখতে পাই।

 

লেখক : ব্যাংকার


মন্তব্য