kalerkantho


বিতর্কের জন্য বিতর্ক না করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিন

আবদুল মান্নান

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বিতর্কের জন্য বিতর্ক না করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিন

সোমবার রাতে মন্ত্রিপরিষদের সচিব শফিউল আলম রাষ্ট্রপতি মনোনীত পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট বাংলাদেশের দ্বাদশ নির্বাচন কমিশনের নাম ঘোষণা করেছেন। আগামী পাঁচ বছরের জন্য এ কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সাবেক সচিব কে এম নুরুল হুদা। অন্য চারজন কমিশনার হচ্ছেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব তালুকদার, সাবেক সচিব রফিকুল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ কবিতা খানম ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহাদৎ হোসেন চৌধুরী। পাঁচজনের মধ্যে তিনজন আমলা, একজন জুডিশিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তা আর একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। যেহেতু রাষ্ট্রপতি গঠিত সার্চ কমিটিতে দুজন শিক্ষক ছিলেন, ধারণা করা হয়েছিল অন্তত একজন হলেও শিক্ষককে এবারের নির্বাচন কমিশনে দেখা যাবে। সার্চ কমিটি যে ১০ জনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে হস্তান্তর করেছিল তার মধ্যে দুজন শিক্ষকের নাম ছিল। তবে চূড়ান্ত তালিকায় তাঁদের স্থান হয়নি। তবে মাহবুব তালুকদার প্রথম জীবনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার শিক্ষক ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আমলা হয়েছেন। নির্বাচন কমিশনে কারা থাকবেন তা নির্ধারণের সাংবিধানিক এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির। তিনি তা কিভাবে করবেন তা-ও তিনি ঠিক করবেন।

তবে চূড়ান্ত তালিকাটি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই করবেন, তা সংবিধানে উল্লেখ আছে। তিনি তা কখন নিয়েছেন বা কী পদ্ধতিতে নিয়েছেন সেটি একটি গোপনীয় বিষয়। এ সম্পর্কে বলতে পারেন তিনি এবং প্রধানমন্ত্রী। গঠিত নির্বাচন কমিশনে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য আছে। কমিশনের প্রধান একাত্তরের রণাঙ্গনের একজন অকুতোভয় সৈনিক। ৯ নম্বর সেক্টরে তিনি মেজর জলিলের নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধ করেছেন। ১৯৭৩ সালে তিনি বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় দেশের প্রথম কর্মকমিশনের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। এই প্রথমবারের মতো কমিশনে একজন মহিলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এককথায় বলা যেতে পারে, নবনিয়োগপ্রাপ্ত কমিশনের সব সদস্যই তাঁদের কর্মজীবন শুরু করেছেন স্বাধীন বাংলাদেশে। দেশ স্বাধীন না হলে তাঁদের কারো পক্ষে এ পদে যাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। ২০০৮ সালে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন বিচারপতি আবদুল আজিজের নেতৃত্বে যে নির্বাচন কমিশন গঠন করেছিলেন, সেই কমিশনে এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। জেনারেল জিয়ার সময় তিনিসহ এমন আরো ১৮ জন পুলিশ বাহিনীতে আত্তীকরণ হন।

স্বাধীন বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশনের গঠন প্রণালী বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় ১৯৭২ সালে প্রণীত অধ্যাদেশে People’s Representation Order -এ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল (১১৮ ধারা)। এর অধীনেই ১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৭২ সালের সংবিধান যেমন বঙ্গবন্ধু সরকারের এক অমর কীর্তি, তেমনিভাবে এই জনপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশও তাঁর আরেক অমর কীর্তি। ২০০৯ সাল পর্যন্ত কমিশন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ছিল। শেখ হাসিনা সরকার গঠন করার পর কমিশনকে পৃথক একটি স্বায়ত্তশাসিত কমিশনের মর্যাদা দেন এবং এর জন্য একটি পৃথক সচিবালয় গঠনের নির্দেশ দেন। কমিশনের জন্য একটি পৃথক বাজেটেরও ব্যবস্থা করেন। সংবিধানের ১১৮ ধারা মতে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির। দশম কমিশন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি তাঁর একক ক্ষমতাবলে এ কর্তব্য পালন করেছেন। একাদশ কমিশন গঠনের আগে বিএনপি ও তাদের সব সমমনা দল এবং সুবিধাভোগী নাগরিকসমাজের একটি অংশ দাবি জানাল একটি সার্চ কমিটির মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করা হোক। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান তা মেনে নিয়ে বিএনপি-জামায়াতসহ সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সার্চ কমিটি গঠন করে কাজী রকিবউদ্দীনের নেতৃত্বে একাদশ নির্বাচন কমিটি গঠন করেছিলেন। এর পরও বিএনপি কখনো এ কমিশনকে মেনে নেয়নি। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান সার্চ কমিটির দেওয়া নামের তালিকা প্রকাশ করেননি। এবার তার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সার্চ কমিটি কর্তৃক প্রণীত ১০ জনের তালিকা প্রকাশ করেছেন এবং সেখান থেকে পাঁচজনকে বাছাই করে প্রজ্ঞাপন জারির আদেশ দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর পূর্বসূরির দেখানো পথে হেঁটেছেন এবং আরো একটু উদার হয়ে সার্চ কমিটির নাম জমা দেওয়ার পর ১০টি নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেশের মানুষকে বলা যায় টেনশনমুক্ত করেছেন। উল্লেখ্য, সার্চ কমিটি এবার ২৮টি রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে পাঁচটি করে নাম সংগ্রহ করেছে। সমাজের কিছু সুধীজনের সঙ্গে বসেছে, তাঁদের কথাও শুনেছে যাঁদের মধ্যে আগের দুজন প্রধান নির্বাচন কমিশনারও ছিলেন। বিভিন্ন টক শো আর মিডিয়ায় কমিশন গঠন নিয়ে নিত্যদিন বক্তব্য দেন, তাঁদের মতও নিয়েছে এবং যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছে তাঁরা বাইরে এসে মিডিয়ার সামনে কথা বলেছেন। বলা যেতে পারে, এত স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশে কেন, অন্য কোনো দেশে গঠন করা হয়েছে বলে জানা নেই।

সার্চ কমিটি গঠন করার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি তার সমালোচনা শুরু করে এবং বলে এ সার্চ কমিটি সরকারের আজ্ঞাবহ হবে। পরদিন রাতে দলীয় ফোরামে আলোচনার পর মির্জা ফখরুল বলেন, নতুন নির্বাচন কমিশন হলো আওয়ামী লীগের নির্দেশিত একটি কমিশন। তাঁর মতে, নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নিরপেক্ষ নন। তাঁর অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। কমিশন ঘোষণা হওয়ার পর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক রিজভী আহমেদ বলেন, তাঁদের তালিকা থেকে কাউকে রাখা হয়নি, অন্যদিকে মন্ত্রিপরিষদসচিব শফিউল আলম বলেছেন, মাহবুব তালুকদারের নাম বিএনপির দেওয়া তালিকা থেকে নেওয়া। রিজভী আরো বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে তাঁদের আপত্তি আছে। নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার একজন মুক্তিযোদ্ধা। খালেদা জিয়া ২০০১ সালে সরকার গঠন করার পর তাঁকে দীর্ঘদিন ওএসডি করে রাখা হয় এবং সে অবস্থায়ই ২০০২ সালে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। সম্ভবত এসব কারণেই রিজভী আহমেদের আপত্তি। মঙ্গলবার রাতে ২০ দলের পক্ষে মির্জা ফখরুলের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানা যাওয়ার কথা রয়েছে। আওয়ামী লীগ বলেছে, রাষ্ট্রপতি যাঁদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন তাঁদের তারা বিতর্কিত করতে চায় না। বিএনপিসহ অনেকের দাবি ছিল নতুন নির্বাচন কমিশনে যাঁরা আসবেন তাঁদের নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। বিশ্বে কোনো মানুষ কখনো নিরপেক্ষ অথবা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সব মানুষের কোনো না কোনো সমালোচক থাকে আর প্রত্যেক সচেতন নাগরিকেরই কোনো না কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকে। ভারতের প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেনের কথা এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। সুকুমার সেন ছিলেন একজন বাঙালি। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অঙ্কশাস্ত্রে পাস করে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন। ভারত যখন ভাগ হয় তখন তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিব ছিলেন। নেহরু সুকুমার সেনকে স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব দেন। শ্রী সেন দায়িত্ব নেওয়ার পর নেহরু শ্রী সেনকে অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা পাঠিয়ে বলেন, তিনি আশা করেন শ্রী সেন নিরপেক্ষভাবে তাঁর দায়িত্ব পালন করবেন। জবাবে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে লেখেন, তিনি নিরপেক্ষভাবে তাঁর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তবে তিনি আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে চলার চেষ্টা করবেন। নেহরু তাড়া দেন তিনি যেন দ্রুততম সময়ে ভারতের প্রথম সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রথম লোকসভা নির্বাচনের আয়োজন করেন। সুকুমার সেন বলেন, এখানে তাড়াতাড়ি করার কিছু নেই। ভারতে সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের বয়স ২১ বছর (তখন একজন ভোটারের বয়স), যাঁদের ৮৫ শতাংশই অশিক্ষিত এবং তাঁদের  বেশির ভাগ জীবনে কোনো সময় ভোট দেয়নি। এর আগে যাঁরা শুধু জমির খাজনা দিতেন, তাঁদেরই ভোটাধিকার ছিল। নতুন করে ভোটার তালিকা করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এটি হবে স্বাধীন ভারতের জন্য একটি নতুন অভিজ্ঞতা। সব কিছু গুছিয়ে আনতে সময় লেগেছিল। ১৯৫১ সালের ২৫ অক্টোবর শুরু হয়ে পরের বছরের ২৭ মার্চ সুকুমার সেনের নেতৃত্বে ভারতের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি দুই দফায় ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি সুদানেরও প্রধান নির্বাচন কমিশনার হয়েছিলেন। ১৯৬০ সালে শ্রী সেন নবপ্রতিষ্ঠিত বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য নিযুক্ত হন। ভারতের দুজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার স্বনামে খ্যাত। একজন সুকুমার সেন আর অন্যজন টি এন সেশন।

নতুন  নির্বাচন কমিশন ২০১৮ সালে অনুষ্ঠেয় একাদশ সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করবে। নির্বাচনের আগে ও পরে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ সব ভোটারের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে। হালনাগাদ ভোটার তালিকা তৈরি করাটাকে গুরুত্ব দিতে হবে সবার আগে। দেশের সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুকুমার সেনের মতো বলতে চাই, নিরপেক্ষ সাজার চেষ্টা না করে আইন বলবৎ রাখার ওপর গুরুত্ব দিলে মির্জা ফখরুল অথবা রিজভী আহমেদ কী বললেন তাতে তেমন কিছু আসে যায় না। তবে খেয়াল রাখতে হবে, বিএনপি-জামায়াত জোট আবার নতুন করে পেট্রলবোমার যুদ্ধ শুরু করার অজুহাত যেন না পায়। এ মুহূর্তে বিএনপির শঙ্কা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার যদি শাস্তি হয়, তাহলে তাদের দলের কী হবে? তারা বিষয়টি সামনে রেখে পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা করবে এমন সম্ভাবনা আছে। দল, নেতৃত্ব, কর্মীবাহিনী আর মানুষের আস্থা ধরে রাখতে পারলে নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অনেকটা গৌণ হয়ে পড়ে। ১৯৭০ সালে শত বাধাবিপত্তির মাঝেও বঙ্গবন্ধুর নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শেখ হাসিনার সরকারের আমলে নতুন প্রক্রিয়ায় কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বে দ্বাদশ নির্বাচন কমিশন গঠিত হলো। এখন সব দলকে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের কাজ শুরু করতে হবে। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগকে একটু বাড়তি পরিশ্রম করতে হবে। তাদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

 

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

 


মন্তব্য