kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো । ধা রা বা হি ক

বাহ্যিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সাক্ষ্যদান

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বাহ্যিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সাক্ষ্যদান

৮১. (বড় ভাই বলল) তোমরা তোমাদের পিতার কাছে ফিরে যাও এবং বলো, হে আমাদের পিতা, আপনার পুত্র চুরি করেছে। আমরা যা জানি, তারই প্রত্যক্ষ বিবরণ দিলাম (সাক্ষ্য দিলাম), আর অজানা বিষয়ে আমরা সংরক্ষণকারী নই। [সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৮১ (দ্বিতীয় পর্ব)]

তাফসির : আলোচ্য আয়াতের মূল কথা হলো, বিনিয়ামিন কথিত চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বড় ভাই দেশে ফেরেনি। তার শেখানো পরামর্শ অনুযায়ী ভাইয়েরা পিতা ইয়াকুব (আ.)-এর কাছে ফেরত যায়। তিনি থাকতেন কেনান নগরীতে। কেনানে গিয়ে তারা পিতাকে সম্বোধন করে বলে, আপনার ছেলে চুরি করেছে। চুরির ঘটনা আমরা নিজেদের চোখে দেখেছি। আমাদের সামনেই তার আসবাবপত্র থেকে চোরাই মাল বের করা হয়েছে। তাই অনেক চেষ্টা করেও তাকে ফেরত আনা সম্ভব হয়নি।

এখানে পিতাকে তারা বোঝাতে চেয়েছে, আমরা বিনিয়ামিনের সব ধরনের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক ছিলাম। আমাদের এই সতর্কতা বাহ্যিক অবস্থা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল।

চোখের আড়ালে চুরির মতো অনুচিত ঘটনা সে ঘটাবে, তা আমাদের কল্পনায়ও ছিল না।

এর আগে ভাইয়েরা ইউসুফ (আ.)-এর ব্যাপারে একবার পিতাকে ধোঁকা দেওয়ায় চেষ্টা করেছিল। তাই তাদের ওপর তাঁর কোনো আস্থা ছিল না। এর ফলে বিনিয়ামিনকে সফরসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার জন্য তাদের আল্লাহর নামে শপথ করতে হয়েছিল। সংগত কারণেই পিতা তাদের এই ঘটনাকেও সাজানো বলে মন্তব্য করেন।

তাফসিরে মাজহারিতে এ ঘটনা উল্লেখ করে একটি প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইউসুফ (আ.) পিতা ইয়াকুব (আ.)-এর সঙ্গে কেন এমন নির্দয় আচরণ করলেন? তাঁর ভাইয়েরা বারবার মিসরে এসেছে। তাদের মাধ্যমে কেন তিনি নিজের অবস্থা জানালেন না, এমনকি ছোট ভাইকেও রেখে দিলেন? এ প্রশ্নের জবাবও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইউসুফ (আ.) যা কিছু করেছিলেন, সবই আল্লাহর নির্দেশে করেছেন। এর মাধ্যমে মূলত ইয়াকুব (আ.)-এর পরীক্ষায় পূর্ণতা দান করাই আল্লাহর উদ্দেশ্য ছিল।

ওপরে উল্লিখিত আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়, কোনো ব্যক্তি সৎ ও সঠিক পথে থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে অন্যরা তাকে অসৎ ভাবতে পারে। পাপ কাজের সঙ্গে লিপ্ত বলে সন্দেহ করতে পারে। এ অবস্থায় কুধারণা ও সন্দেহ দূর করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে চেষ্টা করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। একবার মহানবী (সা.) তাঁর স্ত্রী উম্মুল মুমিনিন সাফিয়া (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে এক গলি দিয়ে পথ চলছিলেন। গলির মাথায় দুজন লোককে দেখা যায়। তিনি তাদের ডেকে বললেন, আমার সঙ্গে সাফিয়া বিনতে হুজাই (রা.)। তারা জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার বিরুদ্ধে কেউ খারাপ ধারণা করতে পারে? জবাবে তিনি বলেন, হ্যাঁ, শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরায় প্রভাব বিস্তার করে। তাই যে কারো মনে সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে।

আলোচ্য আয়াত থেকে আরো প্রমাণিত হয়, কোনো ব্যাপারে সাক্ষ্য দেওয়া জানার সঙ্গে সম্পর্কিত। সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট ঘটনা দেখা জরুরি নয়। ঘটনা সম্পর্কে যেকোনো উপায়েই জ্ঞান অর্জন হোক, সে অনুযায়ী সাক্ষ্য দেওয়া যায়। তাই কোনো ঘটনার সাক্ষ্য যেমন সরাসরি নিজ চোখে দেখার পর দেওয়া যায়, তেমনি কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে জেনেও সাক্ষ্য দেওয়া যায়। তবে নিজের চোখে না দেখে সাক্ষ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে মূলসূত্র গোপন করা যাবে না। এভাবে বলতে হবে, ‘ঘটনাটি সরাসরি আমি চোখে দেখিনি; বরং অমুকের কাছ থেকে এভাবে জেনেছি। ’ (তাফসিরে কুরতুবি ও মা’আরেফুল কোরআন)

 

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য