kalerkantho


পরবর্তী নির্বাচন কমিশন ও মানুষের প্রত্যাশা

বিমল সরকার

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পরবর্তী নির্বাচন কমিশন ও মানুষের প্রত্যাশা

গত ৪৫ বছরে আমাদের দেশে ১০-১২ জন ব্যক্তি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১০টি সংসদ নির্বাচনসহ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, গণভোট, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন, সময় সময় বিভিন্ন স্তরের উপনির্বাচন এবং সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জেলা পরিষদ নির্বাচন—সব কিছু মিলে এক সুবৃহৎ কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন হয় তাঁদের অধীনে। অন্য সব নির্বাচনের কথা বাদ রাখলেও শুধু ১০টি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে চারটিকে ঘিরে দেশ-বিদেশে আলোচনা-সমালোচনা, বিতর্ক ও নানা ধরনের প্রশ্নের কোনো কূলকিনারা নেই; বিশেষ করে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের ও খালেদা জিয়ার আমলে ১৯৯৬ (১৫ ফেব্রুয়ারি) ও শেখ হাসিনার আমলে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন। এরশাদ স্বৈরাচার ছিলেন, তাঁর সময়কার নির্বাচনের অনিয়ম, অসংগতি ও চরম বিশৃঙ্খলার কথা না হয় আজকের আলোচনা থেকে বাদই দেওয়া গেল। কিন্তু গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত পরবর্তীকালে দুটি সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত দুটি সংসদ নির্বাচনে কী দেখা গেল?

সুন্দর, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন মূলত নির্ভর করে ক্ষমতাসীন সরকারের ওপর। যদিও নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান এবং একইভাবে সিইসি গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ তবু সরকার আন্তরিকভাবে না চাইলে প্রচলিত ব্যবস্থায় পক্ষপাতহীন একটি নির্বাচন সম্পন্ন করা খুবই দুরূহ কাজ। বলা হয় ‘চেয়ার মেকস আ ম্যান’—চেয়ার মানুষকে তৈরি করে। সঙ্গে সঙ্গে এ কথাটিও প্রচলিত আছে, ‘ম্যান মেকস আ চেয়ার পারফেক্ট’, অর্থাৎ মানুষই চেয়ার বা পদকে গৌরবান্বিত করে তোলে। কাজের মধ্যেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আসল পরিচয় ফুটে ওঠে। এ ক্ষেত্রে চাই মানুষটির যোগ্যতা, সততা ও দক্ষতা। আরো থাকা চাই দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি দরদ ও ভালোবাসা।

এসবের যেকোনো একটির অভাব মানেই বড় ধরনের বিপত্তির সমূহ আশঙ্কা। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, গত তিন-চার দশকের মধ্যে যাঁর যাঁর কর্মের মাধ্যমে কোনো কোনো সিইসির নাম ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল পাতায় ঠাঁই পেয়েছে। তাঁদের কর্মকাণ্ডের কথা বেশ গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করা হয়। একই কারণে আবার কেউ কেউ ইতিহাসের আঁস্তাকুড়েও নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। অনেকটা তাচ্ছিল্য বা বিকৃতভাবে তাঁদের নাম সময় সময় উচ্চারণ করে চলেছে এ দেশের সচেতন মানুষ। তবে ভালো আর মন্দ যেকোনো নির্বাচনের ব্যাপারে সিইসির নামটির আগে চলে আসে ক্ষমতাসীন সরকারের কথা—কাদের আমলে ঘটল বা সম্পন্ন হলো।       

১৯৫০ সাল থেকে গণনা শুরু করলে মি. টি এন সেশন হলেন ভারতের ১১তম সিইসি (প্রধান নির্বাচন কমিশনার)। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ওই পদটিতে আসীন ছিলেন। শুধু প্রধান নির্বাচন কমিশনারই নন, তাঁর সহকর্মী হিসেবে অন্যান্য কমিশনার তথা গোটা নির্বাচন কমিশনকেই সে দেশে সব সময় খুব সম্মান, মর্যাদা ও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু নানা কারণে টি এন সেশন তাঁর মেয়াদে শুধু নিজের দেশেই নন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলো, এমনকি দূরবর্তী বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠেন। আমাদের দেশে দুই দশক ধরে ভারতের সাবেক ওই সিইসি মি. সেশনের নামটি খুবই আলোচিত হয়ে আসছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, বিশেষ করে কোনো নির্বাচনের প্রসঙ্গ এলেই যেন কোনো না কোনোভাবে আলোচনায় টি এন সেশন এসে উপস্থিত হন। নির্বাচনী ঘটনা পরম্পরায় ধনাত্মক উদাহরণ হিসেবে বারবার টেনে আনা হয় মি. সেশনকে।

স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্নের উদ্রেক হয়, টি এন সেশন কেন ও কিভাবে এত আলোচনায় এলেন। ১৯৯৫ সালের কথা। ভারতের জাতীয় অর্থবছর শুরু হয় ১ এপ্রিল। এর আগে প্রতিবছর ২৮ ফেব্রুয়ারি অর্থমন্ত্রী লোকসভায় বাজেট পেশ করে থাকেন। কিন্তু সে বছর মার্চ মাসের প্রথমার্ধে ছয়টি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত থাকায় এ নিয়ে দেখা দেয় বিপত্তি। দিল্লিতে তখন পি ভি নরসিমা রাওয়ের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসি সরকার ক্ষমতায়। বাজেট উপস্থাপন আসন্ন রাজ্যসভা নির্বাচনে ভোটারদের আচরণ প্রভাবিত করতে পারে আশঙ্কা করে সিইসি সেশন কেন্দ্রীয় সরকারকে বাজেট ঘোষণা পিছিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। আর ওই নির্দেশ মেনে সরকারও কালবিলম্ব না করে তা পিছিয়ে দেয় এবং উল্লিখিত ছয়টি রাজ্যের নির্বাচন শেষে ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরের সাধারণ বাজেট ও গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে বাজেট লোকসভায় উপস্থাপন করে। ওই ঘটনা দেশের ভেতরে ও বাইরে ফলাও করে প্রচার হয়, ‘সিইসি সেশনের নির্দেশে ভারত সরকার জাতীয় বাজেট পিছিয়ে দিয়েছে। ’ যদিও ঘটনাটি সুদীর্ঘ ২২ বছর আগের, কিন্তু এখনো সমান গুরুত্বসহই উচ্চারিত হয় টি এন সেশন নামটি।

গণতন্ত্রের জন্য সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিকল্প নেই। এ জন্য দরকার একজন যোগ্য, সৎ ও দক্ষ সিইসির নেতৃত্বাধীন নিরপেক্ষ বা অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করা। সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন রাষ্ট্রপতি। আওয়ামী লীগ-বিএনপির পরস্পরবিরোধী একের পর এক মন্তব্যের মধ্যেও কাজ দ্রুতই এগিয়ে চলেছে। সার্চ কমিটির কার্যক্রম দেখে আমরা খুবই আশ্বস্ত হয়েছি যে এবার আমরা জনগণমুখী বা দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর একটি নির্বাচন কমিশন পাব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘আশা করি আগামী দিনে প্রতিটি নির্বাচনই অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। জনগণ তাদের ইচ্ছামতো ভোট দেবে, যাকে চাইবে তাকে ভোট দেবে। আমরা চাই, জনগণ ভোট দেবে, তাদের প্রতিনিধি তারাই ঠিক করবে। এটা সম্পূর্ণ তাদের বিষয়। ’ (কালের কণ্ঠ, ৩১.১.২০১৭)। শেখ হাসিনা সুদীর্ঘ ১৩ বছরের প্রধানমন্ত্রী। টানা আট বছর ধরে ওই পদে তিনি তো সমাসীনই। এ ছাড়া দেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন তিনি বিরতিহীনভাবে ৩৭ বছর ধরে। শুধু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান নয়, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশ ও জনগণের কল্যাণে খোলামনে চাইলে আরো অনেক কিছুই সহজে করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করি। আমরা একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ দেখার অপেক্ষায় আছি।      

 

লেখক : কলেজ শিক্ষক


মন্তব্য