kalerkantho


বিশেষ সাক্ষাৎকার ► ড. মো. আবদুর রাজ্জাক

নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে তৃণমূলে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে তৃণমূলে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে

ড. মো. আবদুর রাজ্জাক ১৯৫০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলার মুশুদ্দি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করে ১৯৬৫ সালে ধরবাড়ী নওয়াব ইনস্টিটিউট থেকে এসএসসি, ১৯৭১ সালে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি (এজি) এবং ১৯৭২ সালে কৃষিতত্ত্বে এমএসসি (এজি) ডিগ্রি অর্জন করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৩ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বিভিন্ন জার্নালে তাঁর ২৫টিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর বিচরণ ১৯৬৯ সালে ছাত্রজীবন থেকে। ১৯৭২-৭৩ সালে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের প্রথমে সাধারণ সম্পাদক এবং পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন। ২০০১ সালে প্রথম টাঙ্গাইলের মধুপুর আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে আবার এমপি হওয়ার পর সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালে আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি সমসাময়িক রাজনীতি ও দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মোশতাক আহমদ ও তৈমুর ফারুক তুষার

 

কালের কণ্ঠ : আপনি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত। একসময় আপনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন। এখনো দলের জন্য, দেশের জন্য কাজ করছেন। আপনার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তো জনগণের সমর্থন নিয়ে টানা দুইবার ক্ষমতায় আছে। সামনে ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে এখনই বিভিন্ন সেক্টরে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সরকার নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে দেশের বিশিষ্টজনদের নিয়ে সার্চ কমিটি গঠন করেছে। তারা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনাও করেছে। নাম চেয়েছে। বিষয়টি কিভাবে দেখছেন?

ড. আবদুর রাজ্জাক : কিছুটা তো আপনারাই বলে দিলেন। সার্চ কমিটি তো আমাদের সরকারই প্রথম শুরু করে। এর আগে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান সার্চ কমিটি করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেন। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান রাষ্ট্রপতিও দেশের বিশিষ্টজনদের নিয়ে সার্চ কমিটি গঠন করেছেন। এ কমিটির সদস্যরা অত্যন্ত সজ্জন। তাঁরা আশা করি ভালো লোক খুঁজে বের করবেন। এ কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সমাজের উচ্চ শ্রেণির শিক্ষিত লোক, যাঁরা সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছেন। তাই তাঁদের কাছে আমাদের তথা জাতির প্রত্যাশা, তাঁরা সাহসী লোক খুঁজে বের করবেন।

 

কালের কণ্ঠ : আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ ২৭টি দল নাম জমা দিয়েছে। কঠোর গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে নাম জমা দিলেও দলীয় সূত্রে জানা গেছে এ তালিকায় কাদের নাম রয়েছে। যদি দেখা গেল রাষ্ট্রপতি আওয়ামী লীগের নাম প্রস্তাব করা কাউকে ইসিতে রাখলেন না তখন কী মনে হবে?

ড. আবদুর রাজ্জাক : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সব সময়ই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করে। আর এ জন্য আওয়ামী লীগের জীবনে কোনো নির্বাচন বর্জন করেছে বলে ইতিহাস নেই। জনগণের জন্য ভালো যেকোনো সিদ্ধান্ত আমাদের মেনে নিতে কোনো অসুবিধা নেই। তা ছাড়া নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সার্চ কমিটিকে আওয়ামী লীগ যে পাঁচজনের নাম দিয়েছে, সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ না দিলেও কোনো আপত্তি নেই। রাষ্ট্রপতি যাঁকে উপযুক্ত মনে করে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেবেন আমরা তাঁকেই সাদরে গ্রহণ করব। কোনো প্রতিবাদ করব না।

 

কালের কণ্ঠ : বর্তমান সার্চ কমিটি নিয়ে তো বিএনপি এরই মধ্যে তাদের মতামত দিয়েছে। তারা বলেছে, সার্চ কমিটির ছয় সদস্যের মধ্যে পাঁচজনই কোনো না কোনোভাবে সরকারের আজ্ঞাবহ। তাই তাঁদের দ্বারা ভালো কোনো কিছু আশা করা যায় না। কিভাবে বলবেন?

ড. আবদুর রাজ্জাক : বিএনপি এখন সংসদেও নেই। রাজনীতিতেও নেই। তাই তারা এখন যা বলছে, তা বুঝে না বুঝেও বলতে পারে। তবে যা-ই হোক না কেন, বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট যত ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত করুক না কেন, দেশের মানুষ তাদের বিশ্বাস করবে না। তারা যা বলে তা নিরপেক্ষতা থেকে নয়, বরং তারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চায় বলেই বিভিন্ন অমূলক বিষয় নিয়ে কথা বলে। দেশের উন্নয়নে যারা বাধা, জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। পেট্রলবোমা মেরে যারা নিরীহ মানুষ হত্যা করে, তাদের বিচার বাংলার মাটিতেই হবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, উন্নয়নের সে ধারা অব্যাহত থাকবে। আমাদের অগ্রগতির পথ থেকে সরাতে পারবে না। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ শেখ হাসিনার পাশে পাহাড়-পর্বতের মতো ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বে আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।

 

কালের কণ্ঠ : বিএনপি তো গতবার জাতীয় নির্বাচন বর্জন করেছে। এবারও নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনপ্রক্রিয়ার শুরু থেকেই বিরোধিতা করে আসছে, করছে সমালোচনাও। ভবিষ্যতে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। যদি তারা নির্বাচনে না আসে, তবে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে কি না। সামনের নির্বাচন নিয়ে কিছু বলুন।

ড. আবদুর রাজ্জাক : বিএনপি বা তার রাজনৈতিক জোটের শরিকরা নির্বাচনে যাবে কি যাবে না সেটা তারাই ভালো বলতে পারবে। গণতন্ত্র রক্ষায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যেমন আগেও সোচ্চার ছিল, এখনো আছে। বিএনপি না এলেও সংবিধান রক্ষার জন্য আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে যেতে হবে। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে কি না সেটা দেশের জনগণই ঠিক করবে। তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী দেশ পরিচালিত হবে এবং দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হবে, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। আর এ লক্ষ্য বাস্তবায়নেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, রাজনীতি হতে হবে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। কিন্তু বিএনপি কি সেই রাজনীতি করতে পেরেছে? তারা গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনের নামে সন্ত্রাস-বিশৃঙ্খলা করেছে। আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা, যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী করাসহ দেশের ইতিহাস বিকৃতি ও দেশকে পিছিয়ে দেওয়ার যা যা করা দরকার তার সবই করেছে। ফলে তারা গতবার নির্বাচনে যাওয়ার সাহসই হারিয়ে ফেলে। আমাদের এবং তাদের রাজনীতির মধ্যে এটাই বিরাট তফাত। এটা মানুষকে বুঝতে হবে। তিনি বলেন, মানুষকে আজ শান্তির পথ বেছে নিতে হবে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের স্থান বাংলার মাটিতে কোনো দিন আর হবে না। আমরা দেশকে, দেশের মানুষকে শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি দিতে চাই। আলোর পথে নিয়ে যেতে চাই। সুন্দর জীবন দিতে চাই। আমরা দেশের জন্য কাজ করতে চাই বলেই আজ সাফল্য পাচ্ছি।

 

কালের কণ্ঠ : ছাত্রলীগের সম্পর্কে বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় নেতিবাচক সংবাদ আসে। আপনিও একসময় ছাত্রলীগের বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। এখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। ছাত্রলীগের সেই ঐতিহ্য থেকে একটু নিচে নামলে আপনার মনে কী অনুভূতি হয়? আপনি একজন অভিভাবক হিসেবে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের প্রতি কিছু বলুন।

ড. আবদুর রাজ্জাক : আমি কী বলব, আপনারা তো নিজেরাই বললেন ছাত্রলীগের একটি ঐহিত্য আছে। আছে সুনাম-সুখ্যাতি। আজকে যাঁরা দেশে খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ, তাঁদের প্রায় সবারই ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস রয়েছে। ছাত্রলীগের ইতিহাস বাঙালির ইতিহাস—বলেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার কারণ ছাত্রলীগের জন্ম হয়েছিল এমন একটি সময়ে, যখন আমাদের এই মাতৃভাষা বাংলাকে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করে বাংলাকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা যখন পাকিস্তানি শাসকরা দিল তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের একজন ছাত্র। তিনি তখন ছাত্রলীগ সংগঠন গড়ে তোলেন এবং রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে মর্যাদা দেওয়ার জন্য ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলেন।

ছাত্ররাজনীতি না করলে সাংগঠনিক কাঠামো বোঝা যায় না। আমরা ছাত্রজীবনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে রাজনীতি করেছি বলে এখনো আওয়ামী লীগকে আপন মনে হয়। ছাত্রলীগ যারা করছে, তাদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা মাথায় রাখতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তো শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করে এরই মধ্যে বলেছেন, ‘যখন খালেদা জিয়া হুমকি দিল আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে তার ছাত্রদলই যথেষ্ট তখন আমি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে কাগজ, কলম, বই তুলে দিয়ে বলেছিলাম—ওটা পথ না। পথ হচ্ছে শিক্ষার পথ। আমরা বাংলাদেশকে নিরক্ষরতামুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। ’ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে—ছাত্রলীগকর্মীদের নিজ নিজ এলাকায়, গ্রামে, মহল্লায় কোনো অক্ষরজ্ঞানহীন লোক আছে কি না তার খোঁজ নিতে হবে এবং নিরক্ষরকে অক্ষরজ্ঞান দিতে হবে। এ জন্য সবাইকেই একযোগে কাজ করতে হবে যেন বাংলাদেশকে আমরা দ্রুত নিরক্ষরতামুক্ত করতে পারি। আমিও ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উচিত হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সেই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা।

 

কালের কণ্ঠ : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলনে আপনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য (প্রেসিডিয়াম মেম্বার) নির্বাচিত করা হয়েছে। আপনার নিজ জেলা টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে গত ২৯ অক্টোবর আপনাকে বিশাল সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। নিজ জেলার জন্য কিছু বলুন।

ড. আবদুর রাজ্জাক : টাঙ্গাইল জেলাকে দেশের একটি আদর্শ ও উন্নত জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। টাঙ্গাইল জেলাকে আওয়ামী লীগের অন্যতম ঘাঁটি হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এ জেলায় সব সময় আওয়ামী লীগের জয়জয়কার থাকবে, এমনটাই নেতাকর্মীদের কাছ থেকে আশা করছি। প্রেসিডিয়ামে অন্তর্ভুক্ত করায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও জননেত্রী শেখ হাসিনাকে টাঙ্গাইলবাসীর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই। আমি মনে করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যেমন নিরাপদ, তৃণমূল পর্যায়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি আরো মজবুত করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মানেই ‘স্বাধীনতার স্বপ্নদেখা’ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি, ৫৫ হাজার বর্গমাইল ভূখণ্ডের একটি নতুন ইতিহাস সৃষ্টি। ইতিহাস বিনির্মাণেই থেমে থাকেনি দেশের ঐতিহ্যবাহী এ দলটি, অদম্য বাসনা আর বিসর্জনের ক্যানভাসে নিজ জাতির মুক্তির মানচিত্র এঁকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্রমেই সমৃদ্ধ করে চলেছে আমাদের প্রাণাধিক প্রিয় জন্মভূমিকে। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, আর মুদ্রাটি হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে একের পর এক বিপর্যয় সামাল দিয়ে দেশরত্ন শেখ হাসিনার উন্নয়নের পতাকাবাহী নৌকা তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে—প্রান্তিক মানুষের অন্ন-কর্ম-স্বাস্থ্য-শিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে যে নতুন অভিযান শুরু হয়েছিল, তা এখন আধুনিক সুখী-সমৃদ্ধ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রয়াসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছে।

 

কালের কণ্ঠ : বিশ্বে খাদ্য উৎপাদনে উদাহরণ বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে এখন বলা হয় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশের জমি কিন্তু বাড়ছে না। অথচ প্রতিদিন মানুষ বা জনসংখ্যা বাড়ছে। কিভাবে একটি তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে এ দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা যায় এটা হয়তো এ সরকার দেখিয়েছে। আপনি তো খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

ড. আবদুর রাজ্জাক : দেখেন, এসব কথা তো একবারে বলা যাবে না। আমাদের সরকারের আমলে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে, এটা শুধু আমাদের কথা না। এটা আজ বিশ্বস্বীকৃত। স্বাধীনতার ঠিক পরে ১৯৭২ সালে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছিল এক কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন। সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য ওই খাদ্য পর্যাপ্ত ছিল না। এর পরের ৪২ বছরে এখানে মানুষ বেড়েছে দ্বিগুণ, আর আবাদি জমি কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। অথচ দেশে এখন খাদ্যশস্য উৎপাদন হচ্ছে তিন গুণ বেশি; ভুট্টাসহ এর পরিমাণ প্রায় চার কোটি মেট্রিক টন। আর এভাবেই প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ। কেবল উৎপাদন বৃদ্ধিই নয়, হেক্টরপ্রতি ধান উৎপাদনের দিক থেকেও বেশির ভাগ দেশকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। বাংলার কৃষকরা এখানেই থেমে যায়নি। একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল চাষের দিক থেকেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বের জন্য পথিকৃৎ। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করায় বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে প্রচার করছে। গত তিন বছরে বাংলাদেশ দেশের মানুষকে খাওয়ানোর জন্য একটি চালও আমদানি করেনি। বিশ্বের খাদ্যনিরাপত্তা বিষয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি) বিশ্বের ক্ষুধাসূচক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ক্ষুধাসূচকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। মাত্র এক বছরেই এই সূচকে ১১ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) একই সময়ে খাদ্যনিরাপত্তার বৈশ্বিক অবস্থা নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানেও জাতিসংঘের সংস্থাটি দীর্ঘ মেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতিকে তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত প্যানেলের (আইপিসিসি) চতুর্থ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, চলতি শতকের মধ্যে বাংলাদেশের ধান ও গমের উৎপাদন যথাক্রমে ২০ ও ৩০ শতাংশ কমবে। কিন্তু গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ধান ও গমের উৎপাদন গড়ে ২.৫ থেকে ৩ শতাংশ হারে বেড়েছে। এফএওর জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষির অভিযোজনবিষয়ক প্রতিবেদন বলছে, আগামী দিনগুলোতে বিশ্বের যে দেশগুলোয় খাদ্য উৎপাদন বাড়তে পারে তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এ তো গেল আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিত। কৃষির এ সাফল্য সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চাল, ভুট্টা ও সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। চাল আমদানি নয়, বরং কয়েক বছর আগ থেকে বাংলাদেশ সুগন্ধি চাল ও ভুট্টা রপ্তানি শুরু করেছে। ২০১০ সালের আগেও প্রায় প্রতিবছর বাংলাদেশকে ১০০ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে চাল আমদানি করতে হতো। এখন চাল আমদানি করতে হচ্ছে না বলে কষ্টার্জিত আয়ের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হচ্ছে। একই সঙ্গে গত পাঁচ বছরে দেশে দারিদ্র্যের পরিমাণ প্রায় ১০ শতাংশ কমানোর ক্ষেত্রেও কৃষি উৎপাদন ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্বব্যাংক, এফএও এবং ইফপ্রির বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বের প্রধান খাদ্য উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, ভিয়েতনাম, ক্রোয়েশিয়া, বেলজিয়াম ও মিসর বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে। এ দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভিয়েতনাম দানাদারজাতীয় শস্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ দেশ। ধানের হেক্টরপ্রতি ফলন হিসাব করলে বাংলাদেশের ওপরে একমাত্র ভিয়েতনাম ও চীন অবস্থান করছে।

 

কালের কণ্ঠ : রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আজ একটি বড় সমস্যার নাম। একদিকে মানবতা; অন্যদিকে অন্য দেশের নির্যাতিত-নিপীড়িত নাগরিকদের আশ্রয় দেওয়া। সব মিলিয়ে এ সমস্যা সমাধানে আসলে বাংলাদেশ কী করতে পারে? সরকারি দলের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা হিসেবে বিষয়টি কিভাবে মোকাবিলা দরকার বলে মনে করেন?

ড. আবদুর রাজ্জাক : বিষয়টি আমাদের দেশের অভ্যন্তরের কোনো বিষয় নয়। তবে কয়েক মাস আগে সমস্যাটি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। আমরা কিছুটা সামাল দিয়ে এসেছি। আশা করি, মিয়ানমার তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে আমাদের চাপমুক্ত করবে। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল তো এরই মধ্যে বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ আশাবাদী। আমরা বিশ্বাস করি, রোহিঙ্গা নিয়ে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে তা আনান কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে সমাধান হবে। ’ ১৯৭৪ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত নানাভাবে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। কখনো নির্যাতিত হয়ে, কখনো স্বেচ্ছায় তারা বাংলাদেশে এসেছে। তারা আমাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা চাই, তারা ফিরে যাক। আশা করি, এই আনান কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে তারা ফিরে যাবে। আশা করি, আন্তর্জাতিকভাবেও বিষয়টি সমাধানে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো এগিয়ে আসবে। যেমনটি আনান কমিশন এগিয়ে এসেছে। এ ছাড়া আমার মনে হয় মুসলিম দেশগুলোরও এ ক্ষেত্রে কিছু করার আছে।

 

কালের কণ্ঠ : সরকারের খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে সফলতা দেখিয়েছেন। দেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি একটি নিরাপদ খাদ্য আইনও করেছেন। দায়িত্ব পেলে কী করবেন?

ড. আবদুর রাজ্জাক : সেটা আমাদের দলীয় সভাপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীই যখন যাকে যে দায়িত্ব দেবেন আমরা সবাই সে দায়িত্বই পালন করব। কারণ তাঁর যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যেমন এগিয়ে যাচ্ছে, তেমনি বাংলাদেশের উন্নয়নও এগিয়ে যাচ্ছে। তাঁর যোগ্য নেতৃত্বের প্রতি দেশবাসীর আস্থা রয়েছে।

 

কালের কণ্ঠ : আপনাকে ধন্যবাদ।

 

ড. আবদুর রাজ্জাক : আপনাকেও ধন্যবাদ।

 


মন্তব্য