kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো । ধারাবাহিক

বিনিয়ামিনকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ইউসুফ (আ.)-এর ভাইদের প্রচেষ্টা

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বিনিয়ামিনকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ইউসুফ (আ.)-এর ভাইদের প্রচেষ্টা

৭৯. তারা [ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা] বলতে লাগল, ‘হে আজিজ! তার পিতা তো অতিশয় বৃদ্ধ। সুতরাং তার স্থলে আপনি আমাদের একজনকে রেখে দিন।

আমরা তো দেখছি, আপনি একজন মহানুভব ব্যক্তি। ’

৮০. সে [ইউসুফ (আ.)] বলল, ‘যার কাছে আমরা আমাদের পাত্র পেয়েছি, তাকে ছাড়া অন্য কাউকে গ্রেপ্তার করার ব্যাপারে আমরা আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করছি। এমন করলে আমরা অবশ্যই সীমা লঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। ’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৭৯-৮০)

তাফসির : আগের আয়াতে বলা হয়েছিল, হজরত ইউসুফ (আ.) ছোট ভাই বিনিয়ামিনকে নিজের কাছে রেখে দেওয়ার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি একটি মূল্যবান রাজকীয় পাত্র গোপনে বিনিয়ামিনের মালপত্রের মধ্যে রেখে দেন। এরপর রাজরক্ষীরা ওই মূল্যবান পাত্রটি বিনিয়ামিনের রসদপত্রের মধ্যে পেয়ে তাকে ‘চোর’ সাব্যস্ত করে। এ ‘অপরাধে’ তারা তাকে আটক করে। আলোচ্য আয়াতের মূলকথা হলো, হজরত ইউসুফ (আ.)-এর বৈমাত্রেয় ভাইয়েরা যখন দেখল বিনিয়ামিনকে নিয়ে বাড়ি ফেরা অসম্ভব হয়ে পড়েছে তখন তারা ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। তাদের মনে পড়ে যায়, তারা বাবার সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করে এসেছে যে বিনিয়ামিনকে অবশ্যই সঙ্গে করে নিয়ে আসবে।

তারা অঙ্গীকার করেছিল যে ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। এ জন্য তারা মিসরের রাজার কাছে আবেদন করে, বিনিয়ামিনের পরিবর্তে তাদের একজনকে আটক রেখে বিনিয়ামিনকে তার বাবার কাছে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক। কিন্তু হজরত ইউসুফ (আ.) তাদের আবেদন গ্রহণ করেননি। তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়, আইন অনুযায়ী একমাত্র দোষী ব্যক্তিকেই আটক রাখতে হবে, অন্য কাউকে রাখার সুযোগ নেই।

চোর হিসেবে বিদেশে গ্রেপ্তার হওয়া ও গোলামির শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়ার মতো লজ্জাকর ঘটনায় ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। বিনিয়ামিনও এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না। তবে তার মনে এতটুকু সান্ত্বনা ছিল যে সে তার ভাইয়ের কাছে থাকবে। কিন্তু চুরির মতো অপবাদ সহ্য করা নিঃসন্দেহে কষ্টদায়ক ছিল। আর বিদেশবিভুঁইয়ে তাদের কিছু করারও ছিল না। অবশেষে সবাই মিলে রাজার কাছে গিয়ে অনুরোধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা গিয়ে রাজাকে বলল, আমাদের যিনি বৃদ্ধ বাবা আছেন, ছোট ছেলেটি তাঁর অতীব প্রিয়। তার বিচ্ছেদের বেদনা তিনি সইতে পারবেন না। তাই আমাদের অনুরোধ, আপনি তার বদলে আমাদের একজনকে রেখে দিন। কিন্তু রাজা [ইউসুফ (আ.)] তাতে রাজি হলেন না। তিনি বলেন, যার কাছে পাত্রটি পাওয়া গেছে, তাকে বাদ দিয়ে অন্যকে গ্রেপ্তার করা আইনসিদ্ধ নয়।

হজরত ইউসুফ (আ.) পুরো পরিকল্পনার কথা বিনিয়ামিনকে আগেই অবহিত করেছিলেন। তাই এ ঘটনায় বিনিয়ামিন বিচলিত বা উদ্বিগ্ন হয়নি।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, বৈমাত্রেয় ভাইয়েরা একদিন ইউসুফ (আ.)-কে অপমানিত করার চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। শেষ পর্যন্ত তারা তাঁকে কূপে ফেলেছিল। কিন্তু আজ এই ভাইয়েরা ইউসুফ (আ.)-কে আজিজ বা ‘মহামান্য রাজা’ হিসেবে সম্বোধন করতে বাধ্য হয়েছে। এটাই আল্লাহর বিধান। এটাই প্রকৃতিতে আল্লাহর বেঁধে দেওয়া নিয়ম। এ নিয়মেই জালিমের পতন ঘটে এবং মজলুমের বিজয় নিশ্চিত হয়। এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের মধ্যে আমি পর্যায়ক্রমে এই দিনগুলোর (সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, জয়-পরাজয়) আবর্তন ঘটাই। ’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৪০)

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য