kalerkantho


রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের ‘ধীরে চলা’ নীতি

এ কে এম আতিকুর রহমান

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের ‘ধীরে চলা’ নীতি

মাত্র কয়েক দিন আগে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা তথা মিয়ানমারের মুসলিম নাগরিকদের সার্বিক অবস্থা সরেজমিনে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করার জন্য জাতিসংঘের একটি কমিশনের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সফর করে  গেলেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন ৯ সদস্যের এ কমিশন গঠন করা হয় রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের সব ধর্মের মানুষের নিরাপদ জীবন ও সার্বিক কল্যাণ দেখভাল করার জন্য। জানা মতে, ঢাকা সফরে আসা তিন সদস্যের এই প্রতিনিধিদলে মিয়ানমারেরই দুজন নাগরিক ছিলেন। দলটি কক্সবাজার ও টেকনাফের বিভিন্ন শিবিরে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করে এবং পরে ঢাকায় ফিরে বাংলাদেশ সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকও করে। এ ছাড়া ঢাকায় এক সুধীসমাজের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রতিনিধিদলটির নেতা ঘাশান সালামে জানান, বাংলাদেশে চলে আসা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের সমস্যা সমাধান করাটাই মুখ্য বিষয়।

প্রতিনিধিদলটি ফিরে গিয়ে নিশ্চয়ই জাতিসংঘের কাছে একটি প্রতিবেদন দাখিল করবে। আমরা জানি, কয়েক মাস আগে কফি আনান নিজেই মিয়ানমার সফরে গিয়েছিলেন। হয়তো সেই সফরের সঙ্গে বর্তমান সফরটিকে মিলিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হতে পারে। তবে প্রতিবেদনটি দাখিল করতে এক বছরের মতো সময় লাগার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এতটা সময় লাগার যৌক্তিকতা নিশ্চয়ই রয়েছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুর ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য গতি আঁচ করতে হলে এখানে কয়েকটি সাম্প্রতিক ঘটনার উল্লেখ করা প্রয়োজন :

(ক) স্টেট কাউন্সিলর ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চির বিশেষ দূত দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিয়াও তিন বাংলাদেশ সফর করে গেছেন।

সফরকালে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

(খ) আসিয়ান সদস্য মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এরই মধ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের উত্খাতের বিষয় নিয়ে তাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। ওই সব ঘটনার ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর অং সান সু চি আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে ওই বৈঠকে বিষয়টি সমাধানের কোনো আশাপ্রদ আলোচনা হয়নি। এমনকি বৈঠকে অংশগ্রহণকারী মন্ত্রীদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের সুযোগও দেওয়া হয়নি।

(গ) মিয়ানমারের বৈঠক শেষে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি বাংলাদেশ সফরে আসেন। ২০ ডিসেম্বর তিনি কক্সবাজারের উখিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে কথা বলে উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত হন। ওই দিন ঢাকায় ফিরে এসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। এরপর তিনি জাকার্তায় ফিরে যান।

(ঘ) রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে গত মাসে কুয়ালালামপুরে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে প্রকাশিত ১০ দফার ইশতেহারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে রাখাইনের ওই এলাকাগুলোতে শান্তি ফিরিয়ে আনার, আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকারসংক্রান্ত চুক্তি মেনে চলাসহ রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও বৈষম্য বন্ধ এবং তাদের পরিচয় ও সংস্কৃতি ধ্বংসের অপচেষ্টা রোধের উদ্যোগ গ্রহণের, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আহ্বান ও মানবাধিকার পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠী এবং মিয়ানমারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করাসহ সব নৃগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য একটি অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এ ছাড়া মানবিক সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং ওআইসি সদস্য দেশগুলোর প্রতি আবেদন জানানো হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইন পর্যালোচনা ও বাংলাদেশে বা অন্যত্র আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনসহ রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের প্রতি দাবি জানান।

(ঙ) মিয়ানমারে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াংহি লি অতি সম্প্রতি রাখাইন স্টেটের মংডু এলাকা পরিদর্শন শেষে সেখানকার পরিস্থিতিকে অত্যন্ত দুর্বিষহ বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরো বলেন, সামরিক বাহিনীর হাতে এরই মধ্যে প্রায় ৪০০ রোহিঙ্গা মুসলমানের মৃত্যু ঘটেছে এবং নির্মম নির্যাতনের ফলে এরই মধ্যে প্রায় ৬৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।  

(চ) গত মাসে সিঙ্গাপুরে এক নিরাপত্তা সংলাপে মিয়ানমারের উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী রাখাইন স্টেটের পরিস্থিতিকে ‘জটিল সংকট’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সংকটটি নিরসনে তাঁর সরকারের ‘সময় ও সুযোগ’ প্রয়োজন।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিধন আর বিতাড়ন অনেক বছর থেকেই চলছে। আগে নির্যাতনের শিকার হলেই তারা প্রতিবেশী বাংলাদেশে প্রবেশ করত। এখন বাংলাদেশ ছাড়াও অন্য দেশে গিয়ে জীবন বাঁচাচ্ছে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চাপের মুখে অতীতে মিয়ানমার সরকার যেমন সময় আর সুযোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে, এখনো তা-ই বলছে। অথচ বাস্তবতার নিরিখে আজ পর্যন্ত এ সংকটের স্থায়ী সমাধানে কোনো কার্যকর পদক্ষেপই মিয়ানমার গ্রহণ করেনি। আশা করা গিয়েছিল শান্তিতে নোবেল বিজয়ী নেতা অং সান সু চি মিয়ানমারের ক্ষমতায় আসার পর রোহিঙ্গা মুসলমানদের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান দেবেন, যা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। অথচ সে ধরনের কোনো পদক্ষেপ এখনো তিনি গ্রহণ করতে পারেননি।   

দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে অনেক ইস্যুতেই ‘ধীরে চলা’ নীতি গ্রহণ করা হয়। বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ কর্তৃক এ কৌশল অবলম্বন করার উদাহরণ রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার সরকার সেই নীতিই গ্রহণ করেছে বলে মনে হয়। অতএব, এদিকটি আমাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। আমরা স্মরণ করতে পারি, ১৯৯২ সালে বাংলাদেশে আসা আড়াই লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নাম করে তাদের ফেরত নেওয়া সম্পূর্ণ হয়নি। এখনো প্রায় ৩৩ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে রয়ে গেছে। এর বাইরে অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ।  

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া অবস্থান এখনো সঠিক পথেই চলছে। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে চলমান দ্বিপক্ষীয় আলোচনা জোরদার করা ছাড়াও জাতিসংঘ, ওআইসি ও আসিয়ানের মতো আন্তর্জাতিক ও বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থার মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর জোর চাপ সৃষ্টি করতে হবে যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এ বিষয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশ ছাড়াও আসিয়ান সদস্য দেশ মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে পারে। সময় ও সুযোগের কথা বলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া কোনোক্রমেই বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। এ ছাড়া ভবিষ্যতে রোহিঙ্গারা যেন আর তাদের ভিটামাটি ছাড়া না হয় তার স্থায়ী ব্যবস্থা মিয়ানমার সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি রোহিঙ্গা মুসলমানদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।

বিচারকার্যে বিলম্ব ঘটলে মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। রোহিঙ্গা ইস্যুটি সমাধানে যতই সময়ক্ষেপণ করা হবে সংকটটি ততই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে, রোহিঙ্গারা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। অনেক সময় অনবরত বঞ্চনা থেকে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ক্ষোভ থেকে জন্ম নেয় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে ইসলামিক স্টেটের মতো জঙ্গিগোষ্ঠী যে সুযোগ নেবে না, তা কে বলতে পারে? তাই রোহিঙ্গাদের সে পথে যেতে কোনোভাবেই বাধ্য করা যাবে না। বিশ্বমানবতা জাগ্রত হোক, মিয়ানমার সরকারের বোধোদয় হোক, রোহিঙ্গারা অন্তত মিয়ানমারের মুসলমান নাগরিক হিসেবে নিজ ভিটায় শান্তিতে থাকুক, এ কামনাই করি।      

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত


মন্তব্য