kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো । ধা রা বা হি ক

জ্ঞানীর ওপরে মহাজ্ঞানী আছে

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



জ্ঞানীর ওপরে মহাজ্ঞানী আছে

৭৬. তারপর ইউসুফ তার সহোদরের মালপত্র তল্লাশির আগে তাদের মালপত্র তল্লাশি করে। পরে তার সহোদরের মালপত্রের মধ্য থেকে পাত্রটি বের হয়।

এভাবে আমি ইউসুফকে কৌশল শিক্ষা দিয়েছিলাম। আল্লাহ না চাইলে (মিসরের) রাজার আইনে তার সহোদরকে সে নিজের কাছে রেখে দিতে পারত না। আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় উন্নীত করি। প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তির ওপরে রয়েছে অধিকতর জ্ঞানীজন। (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৭৬)

তাফসির : আগের আয়াতে ইয়াকুব (আ.)-এর শরিয়ত অনুযায়ী চুরির শাস্তি বিষয়ে আলোচনা ছিল। তাদের কাছ থেকে বিধান জানার পর ইউসুফ (আ.)-এর হারিয়ে যাওয়া পাত্রটির তল্লাশি শুরু হয়। কেউ যাতে কোনো সন্দেহ করতে না পারে সে জন্য ইউসুফ (আ.) প্রথমে বড় ভাইদের মালামাল তল্লাশি শুরু করেন। শেষে তল্লাশি করেন বিনিয়ামিনের রসদপত্র। সেখানেই পাওয়া যায় মূল্যবান পাত্রটি।

ফলে বিনিয়ামিন ‘চোর’ সাব্যস্ত হয়। তাই ঘোষণা করা হয়, আগন্তুকদের বক্তব্য ও সামাজিক রীতি অনুযায়ী বিনিয়ামিন মিসর ত্যাগের অনুমতি পাবে না। তাকে রাজার ভৃত্য হিসেবেই থেকে যেতে হবে। এভাবেই কৌশল অবলম্বন করে ইউসুফ (আ.) তাঁর ভাই বিনিয়ামিনকে মিসরে রেখে দিয়েছেন।

উল্লিখিত বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, কোনো শরিয়তসম্মত উপযোগিতার ভিত্তিতে যদি লেনদেনের ক্ষেত্রে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করা হয়, তাহলে তা সাধারণ আইনের দৃষ্টিতে বৈধতার স্বীকৃতি পায়। ফিকাহবিদরা একে ইসলামী পরিভাষায় ‘হিলা’ বলেছেন। ‘হিলা’ শব্দের সাধারণ অর্থ হলো কৌশল অবলম্বন করা। ‘হিলা’ বৈধতা লাভের জন্য শর্ত হলো, এর ফলে কোনো অবস্থায়ই শরিয়তের বিধান যেন বাতিল না হয়ে যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। শরিয়তের বিধান বাতিল হয়ে যায় এমন সব ধরনের ‘হিলা’ সর্বসম্মতভাবে ইসলামে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন জাকাত পরিশোধ না করার জন্য পরিকল্পিতভাবে কোনো অজুহাত সৃষ্টি করা অথবা রমজান মাসে রোজা না রাখার জন্য অপ্রয়োজনীয় সফরে চলে যাওয়া ইত্যাদি ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ ধরনের ‘হিলা’ করতে কঠোর ভাষায় নিষেধ করেছেন।

আলোচ্য আয়াতে আরো বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলাই ইউসুফ (আ.)-কে এ পরিকল্পনার জ্ঞান দান করেছিলেন। তা না হলে মিসরের প্রচলিত আইনে ইউসুফ (আ.) কিছুতেই বিনিয়ামিনকে চুরির দায়ে নিজের কাছে রেখে দিতে পারতেন না। ঘটনাটি এভাবে সাজানোর জন্য ইউসুফ (আ.) ঐশী ইশারা পেয়েছিলেন।

আয়াতের শেষ ভাগে বলা হয়েছে, ইউসুফ (আ.)-এর সম্মান ও রাষ্ট্রীয় উচ্চপদ লাভের পেছনেও ঐশী মদদ ছিল। আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া তা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।

যা-ই হোক, বিনিয়ামিন চোর সাব্যস্ত হওয়ায় সত্ভাইয়েরা কোনো ধরনের লজ্জিত হয়নি। তাফসিরের বিভিন্ন কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তারা বরং এ ঘটনায় খুশি হয়েছিল। মূলত তাদের মনের কোণে যে দুষ্টচিন্তা লুকানো ছিল, তা-ই বাস্তব হয়েছে। অবশ্য তাদের এই উপলব্ধি বা জ্ঞান বিন্দুমাত্রও ছিল না যে পুরো ঘটনা কোন দিকে গড়াচ্ছে। যে যত বড় জ্ঞানী বলেই দাবি করুক, আল্লাহ তাআলার জ্ঞানের সঙ্গে তা তুলনা করাও চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ।

নবী-রাসুলরা আল্লাহর নির্দেশ বা ইলহাম ছাড়া কোনো কিছু করেন না। এ জন্যই তাঁদের কথা ও কর্ম শরিয়তে অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। আল্লাহর নির্দেশে তাঁদের জীবনে অনেক ঘটনার অবতারণা হয়, সেগুলো মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয় ও অনুকরণীয়। হজরত ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনা নিছক কোনো গল্প বা কেচ্ছা নয়। এ ঘটনার প্রতিটি বিষয়ে শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা রয়েছে।

 

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য