kalerkantho


শিক্ষা নিয়ে হেলাফেলা নয়

ফারুক উদ্দিন আহমেদ

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



শিক্ষা নিয়ে হেলাফেলা নয়

দেশ অনেক ব্যাপারে অনেক এগিয়েছে, যার জন্য মূলত দেশপ্রেমিক শ্রমিক-মজুরের অবদানই মুখ্য। তবে সরকারের সহায়ক ভূমিকাও প্রশংসার দাবি রাখে।

দেশের অগণিত কৃষক-শ্রমিকের (বিশেষত গার্মেন্টের) জন্য  খাদ্য ও রপ্তানি পণ্য উৎপাদন বেড়েছে। আবার প্রবাসী শ্রমিকের পাঠানো অর্থের কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বেড়েছে। সব মিলিয়ে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের হার প্রায় ৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা অনেক দেশের তুলনায় একটি অসাধারণ অর্জন। তবে সুষম আয়বণ্টন নিশ্চিত না করে সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন সম্ভব নয়, এ ঘটনাও মনে রাখতে হবে। আমাদের দেশের শ্রমিকরা যদি শিক্ষিত হতো, আমাদের বিদেশে যাওয়া কর্মীরা যদি সাধারণ ও টেকনিক্যাল শিক্ষায় আরো শিক্ষিত হতো, তাহলে দেশের মোট আয় আরো অনেক বাড়ত। আশা করি, এ বিষয়ে কেউ কোনো সন্দেহ পোষণ করবেন না। কিন্তু সেই শিক্ষাই যদি অবহেলিত হয়, শিক্ষার নামে তামাশা তথা হেলাফেলা হয়, তাহলে দেশের কাঙ্ক্ষিত আয় ও উন্নয়ন শুধু বাধাগ্রস্ত হবে না, একসময়ে নিম্নমুখী হয়ে যাবে; এটাও সংশ্লিষ্ট  সবাইকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে। কারণ বিষয়টি জাতীয় স্বার্থে অতিগুরুত্বপূর্ণ। অতিসম্প্রতি প্রকাশিত কালের কণ্ঠ’র প্রধান শিরোনাম ‘ডাহা ভুলে চোখ বুজে নম্বর’ আমার মনে হয় দেশের ও বিদেশের সব পাঠককে হতভম্ব করেছে। যাঁরা কালের কণ্ঠ’র ওই সংখ্যাটি পড়েননি তাঁদের জন্য আরো সামান্য উদ্ধৃতি অত্যাবশ্যক মনে করছি, ‘মুক্তহস্তে বাধ্য করা হয় পরীক্ষকদের—আবোলতাবোল উত্তর লিখেও নম্বর পাচ্ছে পরীক্ষার্থীরা, ২০ পেলেই পাস করানোর চেষ্টা—৬০ পেলে ৭০ বানিয়ে এ গ্রেড—৫০ পেলে ৬০ বানিয়ে এ মাইনাস—৪০ পেলে ৫০ বানিয়ে বি গ্রেড করা হয়। ’ এখন প্রশ্ন আসে, এ জন্যই কি পাসের হার বিভিন্ন পরীক্ষায় ৮০-৯০ ছাড়িয়ে ৯৭-৯৮ শতাংশ পর্যন্ত হচ্ছে? পাঠকদের অনেকেরই মনে পড়তে পারে, ষাট-সত্তর-আশির দশকে কত শত শত ছাত্র-ছাত্রীকে মাত্র ১-২ নম্বরের জন্য ফেল হয়ে আবার পরীক্ষা দিতে হতো। পাস না করতে পেরে কতজনের শিক্ষাগত যোগ্যতার ফল হতো ‘আন্ডার ম্যাট্রিক’ বা ‘আন্ডার গ্র্যাজুয়েট’। তখনো সমাজে অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণী ছিল, এখনো আছে। কিন্তু যাদের মেধার ঘাটতি আছে, তাদের সত্য কথাটি না বলে মিথ্যার আশ্রয়ে মেধাবী আখ্যায়িত করা কি অন্যায় নয়? কেন এই প্রতারণা? কার সঙ্গে? আমরা কি এসব ফলাফল তৈরি করে নিজেকে, সমাজকে ও জাতিকে ধোঁকা দিচ্ছি না? এ জন্যই দেখা যায় পরবর্তী সময়ে এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পাওয়া হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে বিভিন্ন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ব্যাপক হারে ফেল করে। সেবারও দেখা গেল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তীচ্ছু কয়েকজন ছেলে-মেয়ের মধ্যে মাত্র একজন পাস করল। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলও ৮-১০ শতাংশের অনেক নিচেই থাকে। ফলে এই জিপিএ ৫ পাওয়া ছেলে-মেয়েরা অবাক হয়—নিজেদের ফলাফল যে কত নিষ্ফল তা তারা বুঝতে পারে। তাদের মধ্যে যাদের আর্থিক সচ্ছলতা আছে, তারা বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। উল্লেখ্য, হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি ছাড়া প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই মূলত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, তাদের মূল উদ্দেশ্যই ব্যবসা। তাই নামমাত্র একটা পরীক্ষা নিয়ে যারাই টাকা দিতে পারে, তাদেরই ভর্তি করে। এসব বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় অনেকবারই এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অন্যান্য (উল্লেখ না-ই বা করা হলো!) প্রভাবে এত সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয় নামে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনুমতি দিয়েছে। ধানমণ্ডি ও মহাখালীতে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আছে একই দালানের বিভিন্ন তলায়। তাদের না আছে কোনো মাঠ, লাইব্রেরি, না কোনো বসার জায়গা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন অবশ্য নিজস্ব জায়গায় না যেতে পারা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়কে বন্ধ করার নোটিশ দিয়েছে। তবে তা ওই পর্যন্ত। তারা কিন্তু কলা, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের এমন কোনো বিষয় নেই, যাতে ভর্তির বিজ্ঞাপন দিচ্ছে না। ভাবনাটা অনেকটা এ রকম—টাকাটা দিক, ভর্তি হোক, তারপর উচিত শিক্ষা দেব।

শিক্ষাকে বলা হয় জাতির মেরুদণ্ড এবং এটা সর্বকালে সর্বজাতির জন্যই সত্য। আর এই শিক্ষা নিয়েই যদি এত ধোঁকাবাজি ও হেলাফেলা হয়, তাহলে আমাদের জাতীয় ভবিষ্যৎ কী, এটা ভাবার সময় এসেছে। আমাদের দেশে অনেক উচ্চমানের জ্ঞানী-গুণী আছেন। শিক্ষার সব ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ ও পরামর্শ করা অতি জরুরি মনে করি। ইদানীং বিভিন্ন শ্রেণির শিশু-কিশোরদের নতুন বছরের নতুন বই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেখা যায় অনেক বইয়ে অনেক ভুল—বানান ও বাক্য রচনায়। জাতীয় টেক্সট বুক কমিটির উচিত ছিল এসব বই ছাপানোর আগে ভালো করে পড়ে দেখা ও নির্ভুল হিসেবে প্রমাণিত করা। উপরোক্ত কমিটির চেয়ারম্যানের সাম্প্রতিক দায়সারা বক্তব্যে মনে হলো না তিনি একটি বইও পড়ে দেখেছেন। ছেলে-মেয়েরা যা পড়ে সুশিক্ষা পাবে তাতে যদি এত ভুল থাকে, তাহলে তারা কী শিক্ষা পাবে, ভেবে দেখা দরকার। তাঁরাও মনে হয় জানেনই না যে কোনো লেখকের (রবীন্দ্রনাথই হোন বা নজরুল) লেখার একটি শব্দ ও বানানও বদলানো যায় না! তাইতো অনেক গল্প-কবিতায় এত ত্রুটি! শুধু মুদ্রণত্রুটি হলেও একটা কথা ছিল! বোঝা যায় অতি নিম্নমানের শিক্ষাপ্রাপ্ত লোকদের দিয়ে এসব বই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে এবং তা হয়েছে প্রচণ্ড অবহেলার মধ্য দিয়ে, যা অবশ্যই নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। ভবিষ্যতে দক্ষ ও সুশিক্ষিত ব্যক্তিদের সহায়তায় জাতীয় শিক্ষা কারিকুলাম ও পাঠ্য বই নির্বাচন ও সংকলনের বিষয়টি সম্পন্ন হবে বলে আশা করি। অন্য যে বিষয়ে যা-ই হোক, শিক্ষা নিয়ে হেলাফেলা ও সীমাহীন অসংগতি কোনোভাবেই মার্জনীয় নয়।

 

 লেখক : সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংক


মন্তব্য