kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো । ধারাবাহিক

ইয়াকুব (আ.)-এর শরিয়তে চুরির শাস্তি

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ইয়াকুব (আ.)-এর শরিয়তে চুরির শাস্তি

৭৪. (রাজরক্ষীরা বলল) যদি তোমরা [ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা] মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হও, তাহলে (বলো) যে চুরি করেছে, তার শাস্তি কী?

৭৫. তারা বলল, যার মালপত্রের মধ্যে পাত্রটি পাওয়া যাবে, সে-ই তার বিনিময় (তার শাস্তি হবে দাসত্ব)। এভাবেই আমরা জালিমদের শাস্তি দিয়ে থাকি।

(সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৭৪-৭৫)

তাফসির : হজরত ইউসুফ (আ.) সুকৌশলে বিনিয়ামিনকে মিসরে রেখে দিতে চেয়েছেন। নিজের কাছে রেখে দিয়ে তিনি মা-বাবাকে মিসরে আনার ব্যবস্থা করেন। তাই তিনি বিনিয়ামিনকে জানিয়েই একটি পরিকল্পনা আঁটেন। তিনি রাজদরবারের একটি মূল্যবান পানপাত্র বিনিয়ামিনের মালপত্রের মধ্যে রেখে দেন। রাজরক্ষীরা গোপন এই পরিকল্পনার বিষয়ে অবহিত ছিল না। তাই তারা পাত্রটি উদ্ধারের জন্য তল্লাশি শুরু করে। হজরত ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা হারিয়ে যাওয়া পাত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতার কথা জানায়। তখন রাজকর্মচারীরা বলেছিল, যদি পাত্রটি তোমাদের মালপত্রের মধ্যে পাওয়া যায়, তাহলে তোমরাই বলো, এর শাস্তি কী হবে? তারা বলল, আমাদের সমাজের নিয়ম ও রীতি হচ্ছে, কেউ চোর সাব্যস্ত হলে সে চুরি যাওয়া বস্তুর মালিকের দাসত্ব বরণ করবে।

তাফসিরবিদরা লিখেছেন, ইউসুফ (আ.)-এর সময়ে মিসরে চুরির শাস্তি ছিল চোরকে মারধর করে চুরি করা মালের দ্বিগুণ মূল্য নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া।

ইউসুফ (আ.)-এর পক্ষে বিদ্যমান আইনের কারণে বিনিয়ামিনকে চোর সাব্যস্ত করতে পারলেও নিজের কাছে রেখে দেওয়া সম্ভব ছিল না। তাই রাজকর্মচারীরা ইউসুফ (আ.)-এর ভাইদের কাছ থেকে তাদের পিতা হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর শরিয়তের বিধান জেনে নেয়। তাঁর শরিয়তের বিধান ছিল, চুরি প্রমাণিত হলে চোরকে দাসত্বের জীবন বরণ করতে হবে। এই বিধান জানার মাধ্যমে বিনিয়ামিনকে আটকে রাখার বৈধতা পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা এভাবেই ইউসুফ (আ.)-এর মনোবাসনা পূরণ করেন।

এখানে লক্ষণীয় যে ইউসুফ (আ.)-এর সময়ে মিসরে চুরির শাস্তি ছিল চুরি যাওয়া সম্পদের দ্বিগুণ অর্থদণ্ড। আবার ইয়াকুব (আ.)-এর শরিয়তের বিধান ছিল চুরির দায়ে দাস হিসেবে জীবনযাপন করতে হতো। কিন্তু ইসলাম আসার পর আগের আসমানি ধর্মগুলোর অনেক বিধান রহিত করা হয়েছে। চুরির শাস্তির বিষয়টিও তেমনই। ইসলামী আইন অনুসারে চুরির শাস্তি হলো, প্রথমবার চুরি করলে ইসলামী আদালতের নির্দেশে চোরের এক হাত কবজি পর্যন্ত কেটে দিতে হবে। তবে এই বিধান অনেকগুলো শর্ত সাপেক্ষে প্রযোজ্য হবে। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী সব চুরির শাস্তিই হাত কাটা নয়।

ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় অন্যের মাল তার অনুমতি ছাড়া সংরক্ষিত ও হেফাজতকৃত জায়গা থেকে সংগোপনে, চুপিসারে নিয়ে যাওয়াকে চুরি বলা হয়।

হানাফি মাজহাব মতে, কম দামি বা মূল্যহীন কোনো জিনিস চুরি করলে হাত কাটার শাস্তি আরোপিত হবে না। বরং ন্যূনতম ১০ দিরহাম, প্রায় ৩০.৬১৮ গ্রাম রুপা বা তার সমমূল্যের অর্থ-দ্রব্য চুরি করলে এবং তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ার পর এ শাস্তি প্রযোজ্য হবে।

ইসলাম শর্ত সাপেক্ষে চোরের হাত কাটতে বলেছে। কিন্তু এতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা জানি, দেহ-মনের সমন্বয়েই মানুষ। আধুনিক বিজ্ঞান দেহের অসুখের সঙ্গে সঙ্গে মনোরোগ, মনোবৈকল্য ও বিকৃত মানসিকতাকেও ‘রোগ ও অসুখ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান পুরো দেহের পচনরোধে নির্দিষ্ট অঙ্গের অপারেশন কিংবা সমূলে কর্তনের অনুমতি দিয়েছে। ঠিক তেমনি আল-কোরআনে চুরি করার প্রবণতাকে সামাজিক অসুখ ও মনস্তাত্ত্বিক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই পুরো সমাজকে বাঁচাতে সমাজের ‘একটি অঙ্গ’ কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী, ইসলামের সূচনা যুগে যখন এই শাস্তি চালু ছিল, তখন সিকি শতাব্দীকালের মধ্যেও হাতে গোনা কয়েক ব্যক্তি ছাড়া কার্যত হাত কাটার শাস্তি প্রয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয়নি।

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য