kalerkantho

আলোকময়ী সরস্বতী

তারাপদ আচার্য্য

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পরমপুরুষের প্রথম অবতার ইচ্ছাশক্তি, জ্ঞানশক্তি ও ক্রিয়াশক্তি। ঋগ্বেদে বাগদেবী ত্রয়ীমূর্তি।

জ্ঞানময়ীরূপে সব জায়গায়ই তিনি আছেন। বিশ্বভুবনের প্রকাশ তারই জ্যোতিতে। যোগীর হৃদয়ে সেই আলোকবর্তিকা যখন জ্বলে ওঠে তখন জমাটবাঁধা অজ্ঞানতারূপ অন্ধকার দূর হয়ে যায়। সে অবস্থায় সাধকের উপলব্ধি ঘটে অন্তরে, বাইরে সব জায়গায়ই। এই জ্যোতির জ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞান, এই জ্যোতিই প্রণব, এই জ্যোতিই সরস্বতী। আলোকময়ী বলেই তিনি সর্বশুক্লা। তিন গুণের মধ্যে তিনি সত্ত্বগুণময়ী। জ্ঞানের পরিধি অসীম। অনন্ত জ্ঞানময় ঈশ্বরের বাক্শক্তির প্রতীক এই সরস্বতী, তাই তিনি বাগদেবী। গতিময় জ্ঞানের জন্যই ঋগ্বেদে তাঁকে নদীরূপ বলা হয়েছে। ইনি প্রবাহরূপে কর্মের দ্বারা মহার্ণব বা অনন্ত সমুদ্রে মিলিত হয়েছেন। দেবী সরস্বতীর জ্যোতি বিভূতি এবং নদী সরস্বতীর নিষ্কলুষতার সমন্বয়ে দেবী শ্বেতবর্ণা। কল্যাণময়ী নদীর তটে সাম গায়করা বেদমন্ত্র উচ্চারণে, সাধনে নিমগ্ন হতেন। তাঁদেরই কণ্ঠে উদ্গীত সামসংগীত শ্রুতি-সুখকর হতো। তারই প্রতীক দেবীর করকমলে। সরস্বতী বিধৌত ব্রহ্মাবর্ত ভূমি-বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত আশ্রয়পূর্বক সাধনা করতেন ঋষিগণ। সেই ভাবটি নিয়েই দেবী হন পুস্তকশ্রী।

পুরাণে বলা হয়েছে—দেবী সরস্বতী আদ্যা প্রকৃতির তৃতীয় অংশজাত। তিনি বাক্য, বৃদ্ধি, জ্ঞান, বিদ্যা প্রভৃতির অধিষ্ঠাত্রী দেবী। ওই গ্রন্থের মতে, সরস্বতীপূজার প্রবর্তক ব্রহ্মা ও শ্রীকৃষ্ণ।

পুরাণে ও পুরাণোত্তর আধুনিককালে দেবী সরস্বতী বাক্য বা শব্দের অধিষ্ঠাত্রী বাগেদবীরূপে প্রসিদ্ধা। পরবর্তীকালে বৈদিক দেবী সরস্বতীর অন্য পরিচয় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় তিনি কেবল বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপেই সুপ্রতিষ্ঠাতা হয়েছেন। বৈদিক সরস্বতী বাগাধিষ্ঠাত্রী বা বাগেদবীরূপেও বর্ণিতা হয়েছেন। অথর্ব বেদে এবং ব্রাহ্মণে সরস্বতী বাগেদবী।

বৃহস্পতি হচ্ছেন জ্ঞানের দেবতা, তিনি বাক্পতিও। ইন্দ্রও বাক্পতি। বৃহস্পতি-পত্নী সরস্বতীও জ্ঞানের দেবী। সব জ্ঞানের ভাণ্ডার তো ব্রহ্মা-বিষ্ণু আর মহেশ্বরের। তাঁদেরই শক্তিতে সরস্বতী জ্ঞানের দেবী। সরস্বতী নদীর তীরে যজ্ঞের আগুন জ্বেলে সেখানেই ঋষি লাভ করেছিলেন বেদ, ঋগমন্ত্র। সুতরাং সরস্বতী জ্ঞানের দেবী হিসেবেই পরিচিত হয়েছিলেন। দিনে দিনে সরস্বতী তাঁর অন্যান্য বৈশিষ্ট্য হারিয়ে কেবল বিদ্যাদেবী অর্থাৎ জ্ঞানের দেবীতে পরিণত হলেন।

পণ্ডিতরা অনেকেই মনে করেন, সরস্বতী প্রথমে ছিলেন নদী, পরে হলেন দেবী। রমেশচন্দ্র দত্ত লিখেছেন, ‘আর্য্যাবর্তে সরস্বতী নামে যে নদী আছে, তা-ই প্রথমে দেবী বলে পূজিত হয়েছিলেন। বর্তমানে গঙ্গা যেমন হিন্দুর উপাস্য দেবী হিসেবে পূজা পেয়ে থাকেন এবং ক্রমান্বয়ে সরস্বতী হলেন জ্ঞানের দেবী। ’

সরস্বতীর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে সূর্যাগ্নির জ্যোতিতে। সূর্যাগ্নির তেজ, তাপ ও চৈতন্যরূপে জীবদেহে বিরাজ করায় চেতনা, জ্ঞানের প্রকৃত কর্ত্রী তো দেবী সরস্বতী। সরস্বতী দেবীর রূপান্তর হয়েছে পৃথিবীতে নদীরূপে এবং সরস্বতীই অগ্নি-ইন্দ্র-মরুৎ অশ্বিদ্বয়ের সংস্পর্শে শত্রুঘাতিনী, ধনদাত্রী এবং বৃহস্পতি-ব্রাহ্মণস্পতির বিদ্যাবত্তার সংযোগে নদী সরস্বতীর সঙ্গে অভিন্নরূপে সরস্বতী তীরে উচ্চারিত বৈদিকমন্ত্রে সংশ্লিষ্ট হয়ে পুরাণে বিদ্যা ও জ্ঞান ভিন্ন অন্য জ্ঞানগুলো অন্যত্র স্থাপন করে হলেন বিদ্যাধিষ্ঠাত্রী।

সরস্বতীপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিদ্যা ও সংগীতের দেবী সরস্বতীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠেয় একটি অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতীপূজা সম্পন্ন করা হয়। সরস্বতীপূজা সাধারণ পূজার নিয়মানুসারেই হয়ে থাকে। তবে এ পূজায় কয়েকটি বিশেষ উপাচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। যথা অভ্র-আবির, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শীষ। পূজার জন্য বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুলও প্রয়োজন হয়। লোকাচার অনুসারে ছাত্রছাত্রীরা পূজার আগে কুল খায় না। পূজার দিন লেখাপড়া নিষেধ। যথাবিহিতপূজার পর লক্ষ্মী, নারায়ণ, লেখনী-মস্যাধার (দোয়াত-কলম), পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পূজা করার প্রথা প্রচলিত আছে। পূজা শেষে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার প্রথাটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ দিন ছাত্রছাত্রীরা দলবেঁধে অঞ্জলি দেয়।

পৃথিবীতে চারদিকে ঘিরে রয়েছে নানা ধরনের অন্ধকার। এ অন্ধকার দূরীভূত করে আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে দিতে আমাদের প্রত্যেকের জন্য জ্ঞানের ভূমিকা অপরিহার্য। ব্রতের মাধ্যমে জ্ঞানের দেবীর কাছে প্রার্থনা—‘পৃথিবীর অন্ধকারাচ্ছন্ন মানুষের মনে তুমি আলো জ্বেলে দাও, বিদ্যা দাও, জ্ঞান দাও। মানুষের অন্ধকার পৃথিবীকে পেছনে ফেলে নিয়ে যাও আলোর রাজ্যে। ’

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ


মন্তব্য