kalerkantho


মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশা

এ কে এম শাহনাওয়াজ

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশা

এটি খুব স্বাভাবিক যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে প্রায়ই ছাত্রলীগ নিয়ে উদ্বেগে থাকতে হয়। যেকোনো রাষ্ট্রনায়ক বা সরকারপ্রধান চাইবেন দেশে স্থিতিশীলতা বজায় থাক।

বিশেষ করে সরকার যখন লক্ষ্য সামনে রেখে উন্নয়নের তরী ভাসিয়েছে, তখন অভীষ্টে পৌঁছতে নিজ দলীয় নৈরাজ্য কমানো জরুরি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে ছাত্রলীগ অনেক বেশি বিশৃঙ্খল আচরণ করে আসছিল। সন্ত্রাস, খুন, অস্ত্রবাজি, দখল বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি—সব কিছুতে যুক্ত হয়ে পড়েছিল এই ঐতিহ্যবাহী দলটি। যে কারণে সে সময় ক্ষুব্ধ-বিরক্ত প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের অভিভাবকত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে আনার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু নেত্রীর এই আবেগ ও ক্ষোভের কোনো মূল্য দেয়নি ছাত্রলীগ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কাজের ফিরিস্তি মিডিয়ায় অব্যাহতভাবে চলে আসতে থাকে। এ অবস্থায় গত ২৫ জানুয়ারি গণভবনের সবুজ লনে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সামনে অভিভাবকসুলভ পরামর্শ নিয়ে আসতে হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে। আওয়ামী লীগনেত্রী ছাত্রলীগের অস্ত্রবাজিতে বিরক্ত হয়ে বলেছেন, তিনি আর অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনতে চান না। লেখাপড়া করে সুযোগ্য হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

আমরা শিক্ষকরাও তো এমনটিই চাই। ছাত্র সে যে রঙেরই হোক তারা বেপথে গেলে আমাদের কষ্ট হয়। আর যখন দেখি দলীয় বৃত্তে আটকে থাকা ছাত্ররা রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের রিমোট কন্ট্রোলে শক্তিমান থাকে, তখন শিক্ষকের শাসন বা পথনির্দেশনা মূল্যহীন হয়ে পড়ে।

এ সময়ের বাস্তবতা থেকে দেখা যাচ্ছে, যেভাবে কাঠামো আর নৈতিকতা আমরা ভেঙে ফেলেছি তাতে সততা ও বিশ্বাসের সঙ্গে ছাত্রলীগের মধ্যে সংস্কার না আনতে পারলে সুবচনে কোনো কাজ হবে বলে মনে হয় না। রাজনীতির তকমা পরা ছাত্র যখন দেখে রাজনৈতিক সুবিধা লাভের জন্য নেতা-নেত্রীরা তাদের লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করে, তখন তারা পরোক্ষ মেসেজটি পেয়ে যায়।  

আমার দীর্ঘদিনের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতায় ছাত্ররাজনীতির আদর্শিক পরিবর্তন যেভাবে দেখেছি, তাতে রাজনীতির নেতিবাচক আবর্তনের ছায়া স্পষ্ট ছিল। এ দেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস উজ্জ্বল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রদের অংশগ্রহণকে স্বাগত জানিয়েছে সর্বস্তরের মানুষ। তখন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও ছিল ভিন্ন। সময়ের দাবিতেই ছাত্রশক্তি যুক্ত হয়েছিল প্রতিবাদী আন্দোলনে। তারুণ্যের নিঃস্বার্থ তেজোদীপ্ত ভূমিকা তাদের ঔজ্জ্বল্য বাড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শাণিত মেধার ছাত্রছাত্রীরা যুক্ত হয়েছে রাজনীতিতে। জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তাদের অনেকেরই আদর্শিক যোগাযোগ ছিল। অঙ্গসংগঠনও তৈরি হয়েছে। তবে জাতীয় নেতাদের আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত হয়নি রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ছাত্রসমাজ। জাতীয় পর্যায়ের নেতারাও সেভাবে ব্যবহার করেননি ছাত্ররাজনীতিকে। ফলে ছাত্ররাজনীতি সাধারণ মানুষের কাছে আশার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির বিপ্লবী ভূমিকা নেওয়ার প্রয়োজন প্রায় ফুরিয়ে যায়। যূথবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার কোনো বাস্তবতা না থাকায় জাতীয় দলের অঙ্গসংগঠনের চিহ্নিত হওয়া ছাত্ররাজনীতি যার যার দলীয় বলয়ে আটকে যায়। গত চার দশকে ক্ষমতার রাজনীতিতে মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল প্রথমে বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ। পরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। এদের অঙ্গ ছাত্রসংগঠনগুলোও যার যার বলয়ে আবর্তিত হতে থাকে। ক্ষমতা দখলের সুদূরপ্রসারী ভাবনা মাথায় রেখে নিজ ছাত্রসংগঠনকে শক্তিশালী করতে থাকে জামায়াতে ইসলামী। ক্ষমতার মিছিলে না থাকলেও বাম রাজনীতিকরা আটপৌরে ও বিভ্রান্ত আদর্শে তাঁদের পরোক্ষ দলীয় বা সমর্থক ছাত্রসংগঠনগুলোর কর্মীদের যুক্তিবাদী হওয়ার বদলে বাস্তবতাবর্জিত অন্তঃসারশূন্য তর্কবাদী তারুণ্যে পরিণত করছেন, যার অবশ্যম্ভাবী বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে ক্যাম্পাসে। রাজনীতির এসব নেতিবাচক ধারায় ক্রমে আদর্শিক জায়গা থেকে সরে আসতে থাকে ছাত্রসংগঠনগুলো। তাদের সামনে জনসম্পৃক্ত দৃশ্যমান কোনো ইস্যু না থাকায় জাতীয় নেতৃত্বের অনুকরণে দলীয় সংঘাতে যুক্ত হয়ে পড়ে। একই কারণে মেধাবী যুক্তিবাদী ছাত্রছাত্রীরা ছিটকে পড়ে ছাত্ররাজনীতি থেকে। দলীয় জাতীয় রাজনীতির নেতারা তাদের নতুন করে আকৃষ্ট করতে পারেননি বা চানওনি। দলীয় নেতারা চেয়েছেন একান্ত বশংবদ কম মেধার শিক্ষার্থীরাই ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্বে থাকুক। তাদের অনুগত রাখার সুবিধা অনেক বেশি। ততক্ষণে জাতীয় রাজনীতির নেতৃত্ব বুঝতে শিখেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় ছাত্রসংগঠন শক্তিশালী হলে এই ছাত্র নেতাকর্মীদের উন্মত্ত রথে চড়ে ক্ষমতার পালাবদলের খেলায় জেতার সুযোগ বেশি। এভাবেই ছাত্রসংগঠনগুলো তার আদর্শিক ঐতিহ্য থেকে সরে এসে দলীয় লাঠিয়ালে পরিণত হয়। বলা যায়, জাতীয় রাজনীতির নেতারাই তাদের লাঠিয়ালে পরিণত করেন। পেশিশক্তি  প্রদর্শন, মদদ ও প্রেরণা তারা জাতীয় নেতৃত্বের কাছ থেকেই পায়। পেশিতে শক্তি আর পকেটে অর্থ পুরে দিয়ে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত তারুণ্যকে অন্ধকার পথে ঠেলে দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় দলীয় ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণে রাখা জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে হল দখলের রাজনীতি বাড়বাড়ন্ত হতে থাকে। অহরহ ঘটতে থাকে ছাত্র সংঘাতের ঘটনা। অস্ত্রের ঝনঝনানি হয় ক্যাম্পাসে আর হলগুলোতে। রাজনৈতিক সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হলগুলোতে দৈবাৎ অভিযান চালিয়ে কোনো অস্ত্র খুঁজে পায় না। চাঁদাবাজি দলীয় আয় আর ব্যক্তিগত আয়ের উৎস হয়ে যায়। এমনও শোনা যায়, শাখা ছাত্রসংগঠনগুলোকে চাঁদাবাজির অর্থ কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগঠনগুলোকেও দিতে হয়। অর্থাৎ জাতীয় রাজনীতির অনুমোদনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণের অঙ্গীকার রয়েছে যে তারুণ্যের, তাদের নিকৃষ্ট চাঁদাবাজে পরিণত করে। এ ধারার তরুণ বিভ্রান্ত ছাত্রের তখন সতীর্থদের চোখে দাপুটে নায়ক হওয়ার মোহ পেয়ে বসে। দাপট প্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে চলতে থাকে ক্যান্টিনে বাকি খাওয়াকে স্থায়ী করা থেকে শুরু করে হল গেটে বসে থাকা মুচিকে জুতোয় কালি দিয়ে পয়সা না দেওয়া পর্যন্ত। এসব অনাচারকে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে তারা। শিক্ষাবর্ষে জুনিয়র ছাত্রনেতা বা কর্মী কমজোর বিরোধী পক্ষের বা সাধারণ ছাত্র হিসেবে পরিচিত সিনিয়র ছাত্রকেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে বীরত্ব দেখায়।

গুটিকয়েক রাজনীতির তকমা পরা ছাত্রের দাপটে প্রকম্পিত হয় ক্যাম্পাস আর হল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা হল প্রশাসন এ সময়ের বাস্তবতায় তেমন প্রতিবিধান করতে পারে না। কারণ রাজনৈতিক সরকারগুলোর অনুগত অঙ্গসংগঠনের ছাত্ররা প্রধানত প্রাধান্য বিস্তার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে। আবার এসব সরকারি দলের অনুগত প্রার্থীই সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। সরকারি দলের ছাত্রদের ইচ্ছা পূরণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ একটি বাধ্যবাধকতা থাকে তাঁদের। হল প্রশাসনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ইচ্ছা অঙ্কুরেই মরে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সবুজ সংকেতের অভাবে। এভাবে অসহায় হল প্রশাসনকে প্রায়ই আত্মসমর্পণ করতে হয়। এই অসহায়ত্বের সুযোগে দাপুটে দলীয় ছাত্রনেতারা সিট বণ্টনের অলিখিত দায়িত্ব পালন করতে থাকে। প্রতিষ্ঠা করে রামরাজত্ব। হলের সিংহভাগ ছাত্র দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সংস্রব না রাখলেও তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য করেন ছাত্রনেতারা। ক্লাস পরীক্ষা বাদ দিয়ে হলেও সাধারণ ছাত্ররা বাধ্য থাকে মিছিলে যোগ দিতে। মিছিলে না এসে কেউ যদি ‘বেয়াদবি’ করে তবে তাদের নির্ঘাত শাস্তি ভোগ করতে হয়। ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত শিক্ষার্থীদের বড় অংশ খুব বেশি ক্লাসমুখো হয় না। জ্ঞান অর্জনের চেয়ে ঠিকাদার বা দোকানদারদের কাছ থেকে অর্থ অর্জন ও দাপট দেখিয়ে বন্ধুদের সন্ত্রস্ত রাখা তাদের সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়ায়। সেশনজট বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রুটিন-বহির্ভূত বন্ধ হয়ে যাওয়া—এ সবকিছুর পেছনে দলীয় ছাত্রদের মধ্যকার ছাত্র সংঘাতের ভূমিকাই প্রধান।

এই অসুস্থ অবস্থা বজায় রেখে কি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রকাশ করতে পারবে ছাত্রসমাজ? জাতির ক্রান্তিকালে কি তারা দেশপ্রেমের চেতনা নিয়ে অতীতের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে আন্দোলনে? তার পরও আমি বিশ্বাস করি, আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি সত্যিকার অর্থেই ছাত্ররাজনীতিকে সুস্থধারায় ফিরিয়ে আনতে চান তবে তা অসম্ভব নয়। ঐতিহ্যের শক্তি তখনো ছাত্রকে প্রণোদিত করবে। ইতিহাসের দিকে আমরা চোখ ফেরাতে পারি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের উত্তাল আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন—কোন সময় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েনি? বরং দলীয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে ছাত্ররা যখন নানা সংগঠন তৈরি করে রাজনীতি করবে তখনই একমাত্র তাদের পক্ষে মুক্তচিন্তা করা সম্ভব হবে। দলীয় নেতাদের আদেশ তামিল করতে গিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করতে হবে না। শিক্ষার পরিবেশ কলঙ্কিত করতে হবে না। পরিবার আর সমাজের কাছে অপরাধী হয়ে থাকতে হবে না। অসুস্থ আর কলঙ্কিত খুঁটির জোর থাকবে না বলে ছাত্রের হাতে অস্ত্র উঠে আসবে না। সম্ভাবনাময় ছাত্র চাঁদাবাজের কালো তিলক মাথায় পরবে না। পাশাপাশি তার রাজনৈতিক চেতনা ঠিকই শাণিত হবে। পাপমুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই তারুণ্যই পারবে একসময় সঠিক নেতৃত্ব দিতে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শুধু সৎপরামর্শ না দিয়ে যদি একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনার মধ্য দিয়ে ছাত্ররাজনীতিকে কলুষমুক্ত করার পদক্ষেপ নেন তাহলে ব্যর্থ হওয়ার কারণ নেই। ছাত্রলীগ বলি আর ছাত্রদল বলি, রাজনীতির তকমা পরা ছাত্র নেতাকর্মী কাউকে ক্যাম্পাসে কোনোকালে ছাত্র কল্যাণমূলক কোনো কাজে, শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা গেছে তা এখন আর কেউ স্মরণ করতে পারবে না। মেধাবী ছাত্ররা এগিয়ে এসেছে ছাত্ররাজনীতির হাতছানিতে, এগুলো এখন অতীত হয়ে গেছে।

 

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য