kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন

ডা. তারেক সালাহউদ্দিন

২০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



অস্টিওপোরোসিস, হাড় বা অস্থিক্ষয়ের ভয়াবহতা সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করার উদ্দেশ্যে প্রতিবছরের মতো এ বছরও ২০ অক্টোবর পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস’। ‘হাড়কে ভালোবাসুন, ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করুন’—এ প্রতিপাদ্য নিয়ে সারা বিশ্বেই প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

হাড় ও পেশির সুরক্ষায় আমাদেরও এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিত। বাংলাদেশে ঠিক কতজন মানুষ অস্টিওপোরোসিসে ভুগছে, এ সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া গেলেও ধারণা করা হয়, ৬০ লাখের কাছাকাছি মানুষ অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত এবং আমাদের ৪০ শতাংশ নারীর হাড়ের পর্যাপ্ত ঘনত্ব নেই। এ বছর অস্টিওপোরোসিসের প্রচারণায় পর্যাপ্ত ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার, ভিটামিন ‘ডি’ ও শারীরিক অনুশীলনের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে।

অস্টিওপোরোসিস নীরব ঘাতকের মতো কাজ করে। আক্ষরিক অর্থে অস্টিওপোরোসিস হচ্ছে ছিদ্রযুক্ত হাড় বা অস্থি। ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যেই হাড় তার স্বাভাবিক গঠনে পৌঁছে। এ সময় আমাদের শরীরে লিভিং টিসু্যুগুলো নিয়মিত ভাঙে-গড়ে ও নতুন উপাদানের মাধ্যমে বিদ্যমান উপাদানগুলোর প্রতিস্থাপন ঘটে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় অর্থাৎ ৪০ বছরের পর থেকে হাড়ের ভেতরের খনিজ (ক্যালসিয়াম ও ফসফেট) কমে যেতে শুরু করে, আর এর কারণেই হাড় ভঙ্গুর হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে হাড়ের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি।

হাড়ে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে হাড়ের ভঙ্গুরতা বৃদ্ধি পায় বহুগুণে। সুস্থ হাড়ের ক্ষেত্রে সব খনিজের পরিমাণ সুষম অবস্থায় থাকে; কিন্তু ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার ও ভিটামিন ‘ডি’র অপর্যাপ্ততা ও শারীরিক অনুশীলনের অনভ্যাসের কারণে হাড়ে ছিদ্র হলে হাড় ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। তরুণ বয়সে আমাদের শরীর এ খনিজগুলোর সাহায্যে সুগঠিত হাড় তৈরি করে। এ সময়ে আমাদের শরীর যদি পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’ না পায়, তাহলে হাড়ের উৎপাদন ও হাড়ের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগ ও কিছু কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকেও হাড় ক্ষয় বা অস্টিওপোরোসিস হতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশন (আইওএফ) অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি নিয়ে ১১টি দেশে একটি জরিপ চালায়। জরিপের ফলে দেখা গেছে, পুরুষের তুলনায় নারীদের অস্টিওপোরোসিসের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এর কারণ হচ্ছে, নারীদের হাড় পুরুষের তুলনায় গড়ে পাতলা হয়। পাশাপাশি এস্ট্রোজেন হরমোন হাড় সুরক্ষিত রাখে; কিন্তু নারীদের ঋতুস্রাবের জন্য এস্ট্রোজেন হরমোন নির্গমনের হার বেশি, যে কারণে তাদের হাড় ভঙ্গুর হয়ে যায়।

অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত হলেও হাড়ে ফাটল বা ক্ষয়ের আগ পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে এ রোগ ধরা পড়ে না। সাধারণত হাড়ে ফাটল ধরা বা ক্ষয়ের আগে কিংবা প্রথমবার ভাঙার আগে হাড়ের নীরব ক্ষতিসাধন করে যেতে থাকে অস্টিওপোরোসিস। এ জন্যই একে নীরব ঘাতক বলা হয়। অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত হলে প্রথমে কোমর ও হাতের কবজিতে ব্যথা শুরু হয়। এ ছাড়া মেরুদণ্ডের হাড় ভাঙার ফলে কোমরে হাড়ের গঠনগত ত্রুটি ও শরীরের উচ্চতা কমে যাওয়া, এমনকি মেরুদণ্ডের ভেতরে অবস্থিত স্নায়ুর ওপর চাপের প্রভাবে তীব্র ব্যথাও অনুভূত হতে পারে। তবে হাড়ে ফাটল বা ক্ষয় না হলেও কিংবা হাড় না ভাঙলেও যে কেউ অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত হতে পারে।

হাড়ের বৃদ্ধিতে ক্যালসিয়াম খুবই দরকারি। এমনকি হাড়ের সর্বোচ্চ সক্ষমতা অর্জিত হলেও নিয়মিতভাবে ক্যালসিয়াম গ্রহণ দরকার। কেননা এটা অস্থিক্ষয়ের পরিমাণ কমাতে সহায়তা করে। অথচ আমাদের দেশে প্রতি ১০ জনে চারজন নারী পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’ গ্রহণ করে না।

অস্টিওপোরোসিস রোধে খাদ্যতালিকায় ক্যালসিয়ামের পাশাপাশি ভিটামিন ‘ডি’ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। শরীরে ক্যালসিয়ামের শোষণক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ভিটামিন ‘ডি’। এটি দেহে ক্যালসিয়ামের শোষণ বাড়িয়ে হাড়ের গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখে। সূর্যের আলো ভিটামিন ‘ডি’র প্রধান উৎস। তা ছাড়া কিছু মাছ ও ডিমের কুসুমে সামান্য পরিমাণ ভিটামিন ‘ডি’ রয়েছে। বয়স্ক ও যারা সব সময় বাসায় থাকে তারা ভিটামিন ‘ডি’র অভাবে সবচেয়ে বেশি ভোগে। কারণ তাদের পক্ষে সূর্যালোক থেকে ভিটামিন ‘ডি’ গ্রহণ সম্ভব হয় না। বিশেষজ্ঞরা সূর্যালোক থেকে ভিটামিন ‘ডি’ গ্রহণের ক্ষেত্রে সপ্তাহে অন্তত দুইবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে পাঁচ থেকে ১৫ মিনিট রোদে থাকার পরামর্শ দেন। কিন্তু আমাদের এ অঞ্চলে এ ক্ষেত্রে অসুবিধা হচ্ছে আমাদের ত্বকের রঙের কারণে আমরা ভিটামিন ‘ডি’ গ্রহণে সূর্যালোক থেকে খুব একটা সুবিধা নিতে পারি না। বিকল্প খাবারে দুই ধরনের ভিটামিন ‘ডি’ পাওয়া যায়। ভিটামিন ‘ডি টু’ (এরগোক্যালসিফেরল) ও ভিটামিন ‘ডি থ্রি’ (কোলেক্যালসিফেরল)—দুই ধরনের ভিটামিন ‘ডি’-ই হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

অস্টিওপোরোসিস রোধে আরেকটি জরুরি বিষয় হচ্ছে নিয়মমাফিক শারীরিক অনুশীলন। এ শারীরিক অনুশীলন যেকোনো ধরনের হতে পারে; যেমন সাঁতার কাটা, সাইক্লিং করা, জিম করা প্রভৃতি। শারীরিক কার্যক্রম ও হাঁটাচলা শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রিত রেখে এই রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।

অস্টিওপোরোসিস একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিক জীবনযাত্রা ও নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস। অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে হাড়কে শক্তিশালী করে তুলতে নিয়মমাফিক ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’ গ্রহণ এবং শারীরিক অনুশীলন করা প্রয়োজন। অস্টিওপোরোসিস তখনই ঘটে যখন অস্থিক্ষয়ের হার স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। অস্থিক্ষয়কে স্বাভাবিক মাত্রায় রাখতে আমাদের বাড়ন্ত বয়স (৩০ বছরের আগে) থেকেই হাড়ের যত্নে নিয়মিতভাবে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে এবং শারীরিক অনুশীলন করতে হবে। এ সময়ের মধ্যে আমাদের হাড় স্বাভাবিক গঠনে পৌঁছে। তাই যত্নের শুরুটাও হতে হবে এ বয়স থেকে। আর নারীদের ক্ষেত্রে যেহেতু অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি পুরুষের চেয়ে বেশি, তাই এ ব্যাপারে তাদের সচেতন হওয়া ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা খুবই জরুরি।

লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

tareq.salahuddin@gmail.com


মন্তব্য