kalerkantho


বাংলাদেশের অগ্রগতি ও বিশ্বব্যাংকের উপলব্ধি

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

২০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বাংলাদেশের অগ্রগতি ও বিশ্বব্যাংকের উপলব্ধি

সবেমাত্র বাংলাদেশে ঐতিহাসিক সফর শেষ করে চলে গেলেন গণচীনের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর নেতা শি চিনপিং। বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সহযোগিতার চুক্তি সম্পাদন করে গেছেন তিনি।

এর কয়েক দিন আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বাংলাদেশে এসে গেলেন। তিনিও বলে গেলেন এমন সব কথা, যা যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে আগে খুব একটা শোনা যায়নি। এমনকি জন কেরি বঙ্গবন্ধু মিউজিয়ামে গিয়ে শোক বইতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পেছনে যেসব অপশক্তি জড়িত ছিল তাদের প্রতি তাঁর ঘৃণার কথা উল্লেখ করে মন্তব্য লিখেছেন, তা ইতিহাসের সত্যকে উপলব্ধি ও ইতিহাসের কাছাকাছি আসার বিষয়। সেই বিবেচনা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশের এমন কাছাকাছি আসার বিষয়টি মোটেও হালকাভাবে দেখার নয়।

এরও আগে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ এমন বেশ কিছু সমস্যার মীমাংসা করতে সক্ষম হয়েছে, যা ১৯৪৭ সালের পর থেকে অমীমাংসিত। বিশেষত সীমানা বিরোধ এবং ছিটমহল সমস্যা। মিয়ানমার-ভারতের সঙ্গে সমুদ্র সীমানা নিরসন করা গেছে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের লড়াইয়ের মাধ্যমে। রাশিয়ার সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। এমনকি সৌদি আরবের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেক বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ হয়েছে।

বিস্ময়কর সত্য হচ্ছে, এই মুহূর্তে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বাংলাদেশে তিন দিনের সফরে এসেছেন। ১৭ অক্টোবরকে তিনি ‘বিশ্ব দারিদ্র্য বিমোচন দিবস’ হিসেবে পালন করার রীতি অনুযায়ী তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। প্রতিবছর এমন একটি দেশে বিশ্বব্যাংকপ্রধান এই দিনে আসেন, যে দেশটি যথার্থই দারিদ্র্য বিমোচনে সাফল্য অর্জন করছে। অথচ এই বিশ্বব্যাংকই একসময় বাংলাদেশকে নিয়ে অনেক অযাচিত মন্তব্য করেছে, এমনকি প্রমাণ ছাড়া মিথ্যা অপবাদ দিয়ে পদ্মা সেতুতে প্রতিশ্রুত অর্থ প্রদান বন্ধ করেছিল। বিশ্বব্যাংক ভেবেছিল এর ফলে বাংলাদেশ পদ্মায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হবে। কিন্তু বাংলাদেশ পদ্মা নদীতেও ঝাঁপ দেয়নি, কারো কাছে মাথা নতও করেনি, বরং নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পদ্মা সেতু তৈরির চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞই তখন বলেছিলেন যে বাংলাদেশ এত বিশাল প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে, মুদ্রাস্ফীতি অনেক গুণ বেড়ে গিয়ে গভীর সংকটে পড়বে। কিন্তু বাংলাদেশ তেমন কোনো ঝড়-বায়ুর চাপ এখন পর্যন্ত অনুভব করছে না। বাংলাদেশ বরং নিজস্ব অর্থায়নে এখন অনেক প্রকল্পই বাস্তবায়ন করছে, যা একসময় কল্পনা করতে পারেনি। একসময় বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে ব্যঙ্গ করা হতো। কিন্তু যখন এমনভাবে কথাগুলো বলা হতো তখন ছিল একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি, পাকিস্তানিদের ‘পোড়ামাটি নীতি’ ইত্যাদির কারণে দেশটিকে শূন্য হাতেই যাত্রা করতে হয়েছিল। তখন অনেক দেশই বাংলাদেশকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য না করে নানা বিরূপ মন্তব্য করেছে। নানা রকম ষড়যন্ত্র করেছে। আঘাতও করেছে। ১৯৭৫ সালে দেশটিকে সত্যিকার অর্থেই রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্বহীন করা হয়েছিল। কেননা একটি দেশে সত্যিকার ভিশনারি-মিশনারি নেতৃত্ব হঠাৎ করে উদিত হয় না, আকাশ থেকে পড়ে হয় না, রাতারাতি কেউ তেমন নেতা হতেও পারেন না। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহযোগীদের হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশকে দরিদ্র দেশের খাঁচায় আবদ্ধ করে রাখার নীল পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করা হচ্ছিল।

কিন্তু ইতিহাসের অভিজ্ঞতায় নানা বিস্ময় থাকে, যা অনেকেই আগে থেকে বুঝতে পারে না। বাংলাদেশেও অনেক বছর তেমনটি ভাবা হতো, বিশ্ব পরিসরেও তা ভাবা হতো। কিন্তু ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদন, ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিচুক্তি সম্পাদন, ১৯৯৮ সালের শতাব্দীর ভয়াবহতম বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা করা, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঊর্ধ্বমুখী রাখা, বিদেশি সাহায্যনির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজস্ব ক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচনের নানা কর্মসূচি চালু করা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য বিষয়। তখনই কোনো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নের গতিধারাকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এরপর সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশ বদলে যাওয়ার পরিকল্পনা হাতেনাতে পায় ২০০৮ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে। শেখ হাসিনা তখন যে ইশতেহার জাতির সম্মুখে উপস্থাপন করেছেন, তাতে দারিদ্র্য বিমোচন, ডিজিটাইজেশন, বিদ্যুৎ, খাদ্য উৎপাদন, শিক্ষাসহ আর্থসামাজিক বিভিন্ন খাতে বিপ্লবাত্মক পরিবর্তনের সব দিকনির্দেশা তিনি উপস্থাপন করেছেন। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে ২০০৯ সাল থেকে তিনি তাঁর ভিশন অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে থাকেন। খাদ্য উৎপাদন বেড়েই চলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, কর্মসংস্থান বেড়েই চলছে, গার্মেন্টসহ বিভিন্ন খাতে উৎপাদন, রপ্তানি, রেমিট্যান্স বেড়েই চলছে। ফলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত বর্ধনশীল দেশে পরিণত হতে থাকে, প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশি অব্যাহত থাকে, দারিদ্র্যের হার ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত জুন মাস পর্যন্ত দেশে দারিদ্র্যের হার কমে সাড়ে ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমে ১২.৯ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে এটি ছিল ১৭.৪ শতাংশ। এর পর থেকে প্রতিবছর তা কমে বর্তমানে ২০১৫-১৬-তে দাঁড়িয়েছে ১২.০৯ শতাংশে। বাংলাদেশ এ বছর ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা ধরে রাখতে পারলে দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা বাংলাদেশের জন্য খুব বেশি দূরের বিষয় নয়। প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য বিমোচনের একমাত্র অবলম্বন নয়, স্বল্প আয় নিয়েও অনেক অর্জন সম্ভব—এটি বাংলাদেশ এরই মধ্যে দেখাতে সক্ষম হয়েছে। এ ধরনের অবস্থায় বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে দারিদ্র্য বিমোচনের উজ্জ্বল প্রমাণ হিসেবে দেখতে পেয়ে ঢাকায় এসেছেন এর প্রেসিডেন্ট। তিনি বরিশালে গিয়েছেন। ঢাকায় গণবক্তৃতা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। বাংলাদেশের অগ্রগতি দেখে বিস্মিত হয়েছেন। এসবই বাংলাদেশের অর্জন। এরই মধ্যে বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করেছে। মধ্যম আয় অর্জনের লক্ষ্য স্থির হয়েছে। ২০৪১ সালে উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ারও লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। এমন স্বপ্ন বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাস্তবায়িত হয়ে চলছে। অথচ কয়েক বছর আগেও আমরা ভাবতে পারিনি এত পরিবর্তন বাংলাদেশে সম্ভব হবে। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্ব সেই স্বপ্ন এখন বাস্তবে দেখাতে পেরেছে। সে কারণেই বাংলাদেশ এখন চীন, জাপান, রাশিয়া, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ পৃথিবীর কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনা এখন তাই বিশ্বনেতৃত্বের কাছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গতিশীলতার একজন যথার্থ নেতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। বিষয়টি বাংলাদেশে আমরা কতটা উপলব্ধি করছি, কতটা আমাদের অর্জনের চাবিকাঠি কোথায় লুকায়িত আছে, এটিকে অব্যাহত রাখার জন্য কতটা আমরা কাজ করছি, ভবিষ্যতে করে যাব—সেটিই বিবেচ্য বিষয়। এখানে বুঝতে ভুল করলে সব কিছুই উল্টোপথে চলতে পারে। বিপর্যয় ঘটতে পারে।

 

লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

patwari54@yahoo.com


মন্তব্য