kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দুষ্টচক্রের কবলে ব্যাংকিং খাত

মো. মাহমুদুর রহমান

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ব্যাংকে দক্ষ জনশক্তি নিয়োগের জন্য ইন্টারভিউর আয়োজন। ব্যবস্থাপনা পরিচালক চাকরিপ্রার্থী ব্যাংকারকে প্রশ্ন করলেন, বলুন তো ব্যাংক আমানতের সুরক্ষা ও গ্রাহকের আস্থা কিসের ওপর টিকে আছে? উত্তর এলো, ব্যাংকারদের সততার ওপরই আমানতের সুরক্ষা ও গ্রাহকের আস্থা নির্ভর করে।

এই উত্তরের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে দ্বিমত পোষণ করে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয় বললেন, না, আপনি সঠিক বলেননি। কর্মকর্তা সৎ না অসৎ—এটি কোনো বিষয়ই নয়। আসলে ব্যাংকিংব্যবস্থা টিকে আছে ডাবল এন্ট্রি সিস্টেমের ওপর। ‘এভরি ডেবিট মাস্ট হেভ এ করেসপন্ডিং ক্রেডিট’—হিসাববিজ্ঞানের এই নীতিই ব্যাংকিংব্যবস্থাকে সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে যুগের পর যুগ। নতুবা কার টাকা কে নিয়ে যেত তার কোনো খোঁজই পাওয়া যেত না। সততার বিষয়টি এভাবে উড়িয়ে দেওয়া—মনে মনে মেনে নিতে না পারলেও প্রশ্নকর্তার অভিমতের সঙ্গে একমত না হয়ে উপায় ছিল না।

পৃথিবীর প্রথম বাণিজ্যিক ব্যাংকিং শুরু হয়েছিল ইতালিতে। এখন সারা বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেনদেন বাণিজ্যিক ব্যাংক ছাড়া কল্পনাও করা যায় না। তাই বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ব্যাংকের হিসাব রাখার পদ্ধতি দুটিই এসেছে ইতালি থেকে।

বাণিজ্যিক ব্যাংক ইতালিতে শুরু হওয়ার পর কালক্রমে শত শত বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে নতুন নতুন সেবা ও সেবা প্রদানের আধুনিক কৌশলে সুসজ্জিত হয়ে আজ বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে হাজির। বর্তমান বাংলাদেশে দ্রুত প্রসারমান ও লাভজনক খাত ব্যাংকিং হলেও হিসাবে রয়ে গেছে গড়বড়। বছর শেষে আর ব্যাংকের মূলধনের হিসাব মেলে না। গত জুনের হিসাব অনুযায়ী দেশের ৫৬টি ব্যাংকের মধ্যে এখন ৯টিতে মূলধন ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে সাতটিই হচ্ছে সরকারি ব্যাংক এবং বাকি দুটি বেসরকারি ব্যাংক। ৯টি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি রয়েছে ১৬ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি সাতটি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ১৪ হাজার ৯২২ কোটি টাকা। গত মার্চে সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংক ছিল মূলধন ঘাটতিতে, যার পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে সরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে এক হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। সরকারি আটটি ব্যাংকের মধ্যে সাতটিতেই মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে বলে জানা যায়। এ ঘাটতির কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দায়ী করেছেন সীমাহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও তদারকির অভাবকে। এর ফলে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। আর খেলাপি ঋণ বাড়লে মূলধন ঘাটতি হবেই।

সরকার এই মূলধন ঘাটতি পূরণের জন্য প্রতিবছর বাজেটে বরাদ্দ রাখছে। গত অর্থবছরের বরাদ্দ থেকে এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরগুলোয় পাঁচ হাজার কোটি টাকা করে প্রতিবছর মূলধন ঘাটতি পূরণের তহবিল হিসেবে রাখার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগ প্রস্তাবনা দিয়েছে। কথা হচ্ছে, সরকার কার টাকা কাকে দিচ্ছে? জনগণের করের টাকার আমানতদার সরকার। এ দেশের কোটি কোটি শ্রমিক রক্ত পানি করা পরিশ্রমের টাকা থেকে কর দেয় সরকারকে। এ টাকায় ভালোভাবে তাকালে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা ঘর্মাক্ত শ্রমিকের, ক্ষুধার্ত ভিখারির চেহারা দেখতে পাবেন। তা হলে তাঁরা কেন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে দেওয়া খেলাপি ঋণের কারণে সৃষ্ট মূলধন ঘাটতি পূরণে এ টাকা ব্যবহার করবেন? মূলধন ঘাটতি পূরণের নামে এক ঘৃণ্য পথে সাধারণ মানুষের পকেটের টাকা চলে যাচ্ছে দুর্নীতিবাজ রাঘববোয়ালদের হাতে। এ অন্যায় প্রতিরোধে যাদের টাকা সেই জনগণকেই রুখে দাঁড়াতে হবে। বলতে হবে, না, আমরা আর টাকা দেব না। যারা ব্যাংকের টাকা লুটপাটের সঙ্গে জড়িত তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করুন টাকা। তবে এ কথা বলার আগে জনগণকে বুঝতে হবে তারা কিভাবে প্রতারিত হচ্ছে, তাদের কষ্টে অর্জিত টাকার ভাগ কিভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাংকঋণের নামে অন্যের পকেটে চলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের এর প্রতিকারে সরব হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, লুকা প্যাসিলিওর বিখ্যাত ‘ডাবল এন্ট্রি’ সিস্টেম বলবৎ থাকা অবস্থায় কিভাবে হিসাবে এত গড়বড় হয়। তাহলে কি হিসাবরক্ষণের এ পদ্ধতিতে কোনো ত্রুটির সুযোগ নিচ্ছে দুর্নীতিবাজরা? লুকা প্যাসিলিও কি বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছেন? না, সবই ঠিক আছে। শুধু ঠিক নেই যাঁরা ‘ম্যান বিহাইন্ড দ্য সিস্টেম’ হিসেবে কাজ করছেন তাঁরা। যেকোনো পদ্ধতিই অকার্যকর হতে বাধ্য, যদি ওই পদ্ধতি বাস্তবায়নে নিয়োজিত কর্মীবাহিনী সৎ ও দক্ষ না হয়। অসৎ ব্যাংকার, অসাধু ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিপরায়ণ রাজনীতিকদের সমন্বয়ে দেশে যে দুষ্টচক্র গড়ে উঠেছে, তার হাত থেকে সরকারি ব্যাংকগুলোকে মুক্ত করতে না পারলে অনন্তকাল মূলধন ঘাটতি পূরণ সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে না। এ দুষ্টচক্রের কুপ্রভাবে যদি কোনো ব্যাংকে দেউলিয়া হাওয়া লাগে তাহলে ব্যাংকিং সেক্টরের সব অর্জন ম্লান হতে বাধ্য। তখন দেশের অর্থনীতির সামনে যে অপার সম্ভাবনার হাতছানি রয়েছে তা চোরাবালিতে হারিয়ে যাবে।

আশার কথা, এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বেসিক ব্যাংক ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের নাম প্রকাশ করেছেন। এভাবে শেয়ারবাজার, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংক ও বিভিন্ন আর্থিক জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসার মাধ্যমে হয়তো ব্যাংকিং খাত রাহুমুক্ত হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং নিরাপত্তায় সঠিক পদ্ধতির সঙ্গে কর্মনিষ্ঠ সৎ কর্মী নিয়োজিত করতে হবে ভবিষ্যৎ জালিয়াতি প্রতিরোধে।

 

লেখক : ব্যাংকার

mahmudpukra@gmail.com


মন্তব্য