kalerkantho


বদরুলের বিচার হবে তো!

ফারুক উদ্দিন আহমেদ

১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বদরুলের বিচার হবে তো!

ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে এবং জোর তদন্তও হচ্ছে। কিন্তু ফল প্রায় শূন্য। নইলে সর্বশেষ সিলেটের খাদিজার ঘটনাটা কেন? কী দোষ ছিল খাদিজার—দেখতে একটু সুন্দর ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন? শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নামধারী গুণ্ডা বদরুল প্রকাশ্য দিবালোকে তাকে কোপাতে কোপাতে মাটিতে ফেলে দিল—তার পরও কোপাল অনেকের সামনে, যারা এর ভিডিও করল কিন্তু ওই শয়তানকে থামাল না। যারা এই দৃশ্যের ছবি তুলল তারা অনেক আগেই মেয়েটাকে বাঁচাতে পারত; কিন্তু তারা তা করেনি। এমনকি পুলিশকেও খবর দেয়নি। শেষ পর্যন্ত খাদিজার প্রাণ যখন যায় যায়, তখন কয়েকজন তাকে উদ্ধার করে ওসমানী মেডিক্যালে নিয়ে যায় এবং অন্যরা বদরুলকে ধরে। ততক্ষণে মেয়েটার জীবন প্রায় শেষ। এমসি কলেজের ছাত্রী এই মেয়েকে এতক্ষণ ধরে কোপানোর ছবি যারা তুলল তারা কি বদরুলকে ছাত্রলীগের নেতা বলে এত সুযোগ দিল? আশ্চর্য লাগে ছাত্রলীগের এই সহসম্পাদক (শাবির) যার ছবি তাদের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে টিভিতেও দেখানো হলো—সে নাকি ছাত্রলীগের কেউ নয়। এ দাবি করছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। অর্থাৎ খুনখারাবি, অন্যায় করে ধরা পড়লে দল বলবে, আমাদের লোক না। ছাত্রলীগ একটি বিরাট সংগঠন, তবে ঐতিহ্যবাহী কথাটা এখন আর বলা যাবে না। কারণ তারাই তাদের অতীত ঐতিহ্য বর্তমান লুটপাট, ছিনতাই, টেন্ডারবাজি ইত্যাদি দ্বারা ধুয়েমুছে ফেলে দিয়েছে। তারপর এত বড় সংগঠনের লাখ লাখ নেতাকর্মীর মধ্যে কেউ কেউ অন্যায়-অনৈতিক কাজে জড়িত হতে পারে, তাতে যেমন সংগঠনকে দায়ী করা ঠিক হবে না, তেমনি সংগঠনেরও উচিত হবে না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় অস্বীকার করা। হয়তো তাদের দলের অনেকেই এসব অপকর্মে লিপ্ত বলে দলকে পরিচ্ছন্ন রাখতে দলের ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব এই অস্বীকারের পথ বেছে নিয়েছে। আসলে এতেই দলের বেশি ক্ষতি। সত্যকে অস্বীকার করা বা লুকানো যে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ারই শামিল। বরং তাদের বলা উচিত, ‘হ্যাঁ, আমাদের দলে ছিল, আমরা বহিষ্কার করলাম এবং উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ’ মজার ব্যাপার হলো, আরো অনেক ছাত্রগোষ্ঠী দেশে থাকলেও এ দলের নামই এখন সব অপকর্মে আসে। কারণ হয়তো তারা সরকার সমর্থক বলে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি পরিষ্কার ঘোষণা করেছেন, শিশু ও নারী নির্যাতনের ব্যাপারে তাঁর সরকার সম্পূর্ণ জিরো টলারেন্সে থাকবে। তিনি তো বলেননি কোনো দল বা গোষ্ঠীকে ছাড় দেওয়া হবে, বস্তুত কোনো অন্যায়-অনাচার, সন্ত্রাসকেই সরকার ছাড় দিচ্ছে না। তার প্রমাণ হলি আর্টিজান, কল্যাণপুরের এবং এ রকম অন্যান্য ঘটনা।

তাই আমরা আশা করব, খাদিজার ব্যাপারটা যেন চট্টগ্রামের মিতু হত্যা বা কুমিল্লার তনু হত্যার মতো অতলে হারিয়ে না যায়। আসলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি মানুষের মনে আইন ও বিচারের প্রতি অনীহা তথা অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। এ রকম অবস্থা যাতে আমাদের দেশে বদ্ধমূল না হয় তার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। অপরাধীরা অবলীলায় পার পেয়ে গেলে পুলিশ, কোর্ট-কাছারি এগুলোর প্রয়োজনই থাকে না এবং কোনো সভ্য সমাজই নিজের এমন চরম দুর্দশা কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। আমরা জানি, অনেক কুখ্যাত খুনি আসামি আইনের ফাঁক দিয়ে আদালত থেকে জামিন নিয়ে পালিয়ে দেশ ছেড়ে চলে গেছে। এ রকম আর একটি ঘটনাও যাতে না ঘটে সেটা আমাদের কর্তৃপক্ষকেই নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়ে আইনের ফাঁক রেখে চার্জশিট দেবে, এটা কিছুতেই ন্যায়বিচারের অনুকূল হতে পারে না। দেশের আইন ও বিচারের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস যেকোনো মূল্যে ধরে রাখতে হবে। নইলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ও অন্যান্য উন্নতি আমরা যা করেছি সবই নিষ্ফল হয়ে দাঁড়াবে।

ইদানীং দেশে শিশু ও নারী নির্যাতন হঠাৎ যেন বেড়ে গেছে বলে মনে হয়। এর কারণ হয়তো এই যে দুষ্কৃতকারীরা মনে করে, এগুলো করে পার পাওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশে অনেক বিচারই হয় না—হলেও অনেক দেরিতে হয়। বলা হয়, আসামিকে যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো; কিন্তু আসামি লাপাত্তা—কবে পালিয়ে গেছে। এ ধরনের বিচার বাস্তবে কোনো বিচার না এবং এতে সংশ্লিষ্টদের তো বটেই, জনমনেও কোনো স্বস্তির সঞ্চার হয় না।

শাস্তি পাওয়া আসামি যদি মনমতো দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়ায়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের আবার আরো বড় আঘাতের ভয় দেখায়, তাহলে এমন বিচারের যৌক্তিকতা কী? এমনও দেখা যায়, সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও তার সাঙ্গোপাঙ্গর ভয়ে বিচারপ্রার্থীরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে থাকে। যে বিচারে আসামি ভয় পায় না, বরং বিচারপ্রার্থীর ভয়, এটি যে কত বড় প্রহসন, তা বোধ হয় বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই এমন বিচার হতে হবে, যে বিচারে অপরাধীর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয় এবং সে এ ধরনের অপরাধ আবার করার কথা কল্পনাও করতে পারে না।

শিশু ও নারী নির্যাতনের আরেকটি দিক হলো সংশ্লিষ্টদের মনমানসিকতা। একবার একটা বিয়ে করলে অনেকেই (বিশেষত গ্রামাঞ্চলে) মনে করে বাড়িতে একটি দাসী আনা হয়েছে। তাই যথেচ্ছ ব্যবহার যেন এসব তার অধিকারের মধ্যে পড়ে। অনেকে তো যৌতুকের জন্য মারধর করে স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়ি পাঠায়। টাকা-পয়সা চাহিদামতো না আনতে পারলে শুরু হয় আবারও মারধর—এমনকি গাছে বেঁধে, গরুর গোয়ালে বেঁধেও! এসবে অপরাধী স্বামীকে সহযোগিতা করে তার মা ও ভাইবোন। পাশের বাড়ির লোকেরা পর্যন্ত এসব দেখে এগোয় না, যা সামাজিক সচেতনতার অভাবের একটি প্রকট দৃষ্টান্ত। আমরা অগ্রসরমাণ সমাজ বলে তখনই দাবি করতে পারব যখন নারী-পুরুষ ও শিশু সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করতে পারব। সমাজের একটি বড় অংশকে অবহেলিত ও নির্যাতিত রেখে অন্যরা সুখে আছে মনে করাটাই একটি রুগ্ণ সমাজের লক্ষণ। আমাদের ভাগ্য ভালো যে এখন অনেক নারীবান্ধব সংস্থা শুধু ঢাকায় নয়, বিভিন্ন জেলা-উপজেলা, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও কার্যকর আছে। ফলে তারা এসব নির্যাতিত শিশু ও মহিলার সাহায্যে এগিয়ে যায়। তবে এটা শুধু এদের ব্যাপার মনে করে এড়িয়ে গেলে চলবে না, এটা নারী-পুরুষ, ধনী-নির্ধন সমাজের সব স্তরের মানুষের দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে, শিশু ও নারী মিলে সমাজের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ। তাদের অধিকারবঞ্চিত রেখে সামাজিক উন্নয়ন কখনো সম্ভব নয়। তাই মিডিয়া, সব সামাজিক সংগঠন ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সবাইকে যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে এবং এর বিকল্প কিছু নেই।

 

লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক

অর্থনৈতিক উপদেষ্টা


মন্তব্য