kalerkantho

মঙ্গলবার। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ । ৯ ফাল্গুন ১৪২৩। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮।


উন্নয়নের পালে হাওয়া দেবে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক

এ কে এম শাহনাওয়াজ

১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



উন্নয়নের পালে হাওয়া দেবে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক

৩০ বছর পর চীন প্রজাতন্ত্রের একজন প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে সফল সফর শেষে ফিরে গেলেন। আমার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। পাকিস্তান আমলের প্রায় অন্তিম সময় তখন। চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই এসেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান সফরে। যদি স্মৃতি বিভ্রান্ত না করে তবে মনে পড়ছে, আমরা স্কুল থেকে শীতলক্ষ্যা নদীতে গিয়েছিলাম চৌ এন লাইকে দেখতে। তখন প্যাডেল স্টিমার চলত নারায়ণগঞ্জ থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত। এ রকম অস্ট্রিচ বা অন্য কোনো নামের জাহাজের দোতলার সামনের খোলা অংশটিতে দাঁড়িয়েছিলেন চীনা প্রধানমন্ত্রী। দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের অভিবাদন হাত নেড়ে গ্রহণ করছিলেন তিনি। ৩০ বছর আগে কোন প্রেসিডেন্ট এসেছিলেন আমি মনে করতে পারছি না। তবে এবারে প্রেসিডেন্ট চিনপিংয়ের সফর নিয়ে বেশ উচ্ছ্বাস বেশ কিছুদিন থেকেই শোনা যাচ্ছিল এবং বোঝা যাচ্ছিল সম্পর্কের একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। জেনেছিলাম এই সফরের মধ্য দিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে।

কয়েকটি কারণে এই সফরকে বাংলাদেশের জন্য তাত্পর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই বিপুল অঙ্কের চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে যখন বাংলাদেশ নিজ সামর্থ্যে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটছে। মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছার জন্য উদ্বাহু আমরা। এমন এক বাস্তবতায় বিশ্বের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জায়ান্টে পরিণত হওয়া চীন যদি বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায় এবং ঋণ ও বাণিজ্যকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তবে এ দেশের প্রভূত অগ্রগতি সাধন সম্ভব, দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন প্রভুত্বের মানসিকতাকে একটি ভারসাম্যে নিয়ে আসতে পারে চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব। ভারতের সঙ্গে চীনের রাজনৈতিক বৈরিতা আছে অনেক ক্ষেত্রেই। তবু এ দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চলছে অর্থনৈতিক বন্ধুত্বের মানদণ্ডে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত-চীনের যুগপৎ বন্ধুত্বকে যদি সঠিক রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে কাজে লাগানো যায়, তবে তা বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় বড় রকম ভূমিকা রাখতে পারে।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব ও যোগাযোগের একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে। বলা হয় সভ্যতার ইতিহাস চলেছে—চলছে একটি সময়ের চক্রের মধ্য দিয়ে। এই চক্র সতত ঘূর্ণায়মান। উত্থান-বিকাশ-পতন ও নবোত্থানের মধ্য দিয়ে সভ্যতা আবর্তিত হচ্ছে। এদিক বিচারে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক মিল রয়েছে। একই চক্রের সারথি দুই দেশই। উভয় দেশের উত্থান-বিকাশ ও পতনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে চীনের নবোত্থান অনেকটা আগে ঘটেছে। নিজ মেধা, শ্রম ও আদর্শিক প্রণোদনায় এ পর্বে দেশটির বিকাশ ধারা খুব দ্রুতগতিতে এগিয়েছে। এখন বিকাশের চূড়ায় দাঁড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে চালকের আসনে বসেছে। বাংলাদেশ নানা বাস্তবতায় নবোত্থান ঘটানোর প্রস্তুতি মাত্র নিচ্ছে। এ সময় প্রয়োজন সামর্থ্যবান বন্ধুর সহযোগিতার হাত বাড়ানো। আমরা চীনা প্রেসিডেন্টের সফরে তেমন একটি সহযোগিতার হাত সম্প্রসারণের আভাস দেখতে পাচ্ছি। এর ভেতর থেকে লভ্যাংশ তুলে আনার দায়িত্ব সরকারের। কতটা সততা ও মেধা প্রয়োগ করতে পারে সেটিই হচ্ছে বড় কথা।

ধ্রুপদী নগর সভ্যতা গড়ার যুগে ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে চীনা সভ্যতার বিকাশ ঘটে। ইয়াং জে কিয়াং আর হোয়াংহো নদীর সুবিধা কাজে লাগিয়ে চীন কৃষিভিত্তিক সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়ে বিশাল উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিল। সময়ের ঘূর্ণিচাকার আবর্তনে সেই চীন একসময় অবক্ষয়ের পথে নিজেকে হারিয়ে ফেলে।

খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দের দিক থেকে রাজতান্ত্রিক চীনের এক ধরনের উত্থান ঘটে। এরপর বিশ শতক পর্যন্ত অনেক রাজবংশ শাসন করে। এ পর্বে পাঁচ শতক থেকে চীনের সঙ্গে বাংলার একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠার সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। চীনে তখন বৌদ্ধধর্মের বিস্তার ঘটছে। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে ভারতীয় মৌর্য সম্রাট মহামতি অশোকের সময় মৌর্যদের হাতে অধিকৃত হয়েছিল উত্তর বাংলা। মৌর্য সাম্রাজ্যের এই প্রদেশ বা ভুক্তির নাম হয় পুণ্ড্রবর্ধন। রাজধানী হয় পুণ্ড্রনগর—আজকের মহাস্থানগড়। এই কালপর্বে অশোক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। বৌদ্ধ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল বাংলায়। এই সংস্কৃতির খোঁজেই পাঁচ শতকে চীন থেকে বাংলায় এসেছিলেন ফা হিয়েন। তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে সেকালের বাংলা সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। অত্যন্ত মূল্যবান তথ্যভাণ্ডার নিয়ে এসেছিলেন আরেক চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং। সাত শতকের শেষে এসেছিলেন তিনি। হিউয়েন সাং এ দেশে বিশ্ববিদ্যালয় মানের বৌদ্ধ বিহারগুলোর বর্ণনা দিয়েছিলেন এবং জানিয়ে ছিলেন সে যুগে অনেক চীনা পরিবার তাদের ছেলেকে বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য বাংলার বিহারগুলোয় পাঠাতেন। বোঝা যায়, এ সময় অন্তত শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলা চীনের চেয়ে এগিয়েছিল।

তেরো শতক থেকে বাংলায় মধ্যযুগের যাত্রা শুরু। বহিরাগত তুর্কি মুসলমানদের হাতে মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়। তুর্কি সুলতানদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় চীনের। বোঝা যায়, সে সময় অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সামর্থ্যে চীনের চেয়ে অনেকটা এগিয়েছিল বাংলা। চীনা রাষ্ট্রদূতরা আসতেন বাংলার সুলতানদের রাজদরবারে। বাংলা থেকে চীনে রাজপ্রতিনিধি যাওয়ার কথা জানা যায় না। চৌদ্দ শতকের শেষ দিকে বাংলায় আসা চীনা রাষ্ট্রদূতের দোভাষী মাহুয়ান বাংলার সমৃদ্ধ অর্থনীতির বর্ণনা করেছেন। এর পরও মোগল যুগ পর্যন্ত চীনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল বাংলার। উনিশ শতকের শুরুতে সান ইয়াৎ সেনের নেতৃত্বে আধুনিক চীনের যাত্রা শুরু হয়। এ সময়কালেও সম্পর্কসূত্র বিচ্ছিন্ন হয়নি এ ভূখণ্ডের সঙ্গে চীনের। শুধু সম্পর্কের টানাপড়েন হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়ে। তা সরাসরি আমাদের জন্য নয়। এর সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ছিল। একটু বিলম্বে হলেও চীন বাংলাদেশের বাস্তবতা মেনে নিয়েছে এবং পারস্পরিক বন্ধুত্বের হাত সম্প্রসারিত হয়েছে।

এই দীর্ঘ ইতিহাসের পরিক্রমায় দেখা গেছে যে ধ্রুপদী নগর সভ্যতার যুগের পর বিশেষ করে ছয়-সাত শতক থেকে বাংলার অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সামর্থ্য অনেক বৃদ্ধি পেয়েছিল। আট শতক থেকে এগারো শতক পর্যন্ত পাল রাজবংশের সময়কালে চীনের তুলনায় বাংলা এগিয়েছিল অনেক বেশি। আঠারো শতকের মাঝপর্ব পর্যন্ত আমাদের অর্থনৈতিক বিকাশ চলছিল সাড়ম্বরে। সময়ের চক্রে আমাদের পতনপ্রক্রিয়া শুরু হয় ইংরেজ শাসনযুগ থেকেই। পাকিস্তান পর্বে আমাদের পতন নিশ্চিত হয়ে যায়। স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার পরও আমরা নবোত্থানের ধারায় নিজেদের যুক্ত করতে পারিনি। এর বড় কারণ কার্যত আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। আমাদের রাজনীতি দেশকে এগিয়ে নেওয়ার মতো কোনো আদর্শ দাঁড় করাতে পারেনি। সান ইয়াৎ সেন থেকে শুরু করে মাও জে দং পর্যন্ত বিশাল চীন ভূখণ্ডকে ঐক্যবদ্ধ করে সততা, ত্যাগ ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে চীন যেভাবে নবোত্থানের পথ তৈরি করেছিল, আমরা সেখানে ব্যর্থ হয়েছি। চীনা নেতৃত্ব দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে নিজ আদর্শ, সততা ও শ্রম কাজে লাগিয়ে ক্রমে বিশ্ব অর্থনীতির পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে, বাণিজ্য বিস্তার ঘটিয়েছে পৃথিবীর সর্বত্র, সেখানে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। দেশ গড়ার মতো কোনো আদর্শ তৈরি করতে পারেনি আমাদের রাজনীতি। অসততা ও ক্ষমতায় যাওয়ার উগ্র চেষ্টা সংঘাতের রাজনীতির পথই প্রশস্ত করেছে। এসব কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নবোত্থানের চক্র থেমে আছে।

এই বন্ধ্য অবস্থা থেকে সম্প্রতি ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখিয়েছেন বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভয়ংকর রাজনৈতিক সংঘাত থেকে অনেকটা মুক্ত করতে পেরেছেন। পেরেছেন কৃষি ও শিল্প অর্থনীতির চাকা অনেকটা সচল করতে। সাধারণ মানুষ ক্রয়ক্ষমতার সুফল পাচ্ছে। এমন একটি প্রেক্ষাপটে চীনা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন। স্বাক্ষরিত হলো ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক। অধিকাংশ চুক্তিই উন্নয়নমূলক।

এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই সহযোগিতা থেকে সুফল বের করে আনা। এ সত্য মানতে হবে, আমরা ঘরপোড়া গরু। সিঁদুরে মেঘে ভয় থেকেই যাচ্ছে। আমরা এখনো আস্থার সঙ্গে বলতে পারছি না, আমাদের রাজনীতির প্রায়োগিক ক্ষেত্রে দেশোন্নয়নমূলক আদর্শ তৈরি হয়েছে। এ দেশের রাজনীতি এখনো কঠিন দলতন্ত্রে বন্দি, যেখানে অসততা ও দুর্নীতি প্রাধান্য নিয়ে অবস্থান করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সততা ও দৃঢ়তাই চূড়ান্ত স্বস্তির কারণ হতে পারে না। রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক নীতি দেশপ্রেমের সঙ্গে সম্পর্কিত না করতে পারলে এসব চুক্তির সঠিক বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।

আমরা বিশ্বাস করি, চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বের এই সম্পর্ক আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করবে। পারস্পরিক স্বার্থ ছাড়া এ সময় বন্ধুত্ব দৃঢ় হয় না। দূরপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় শক্ত অবস্থানে দাঁড়ানোর জন্য চীনের খুব প্রয়োজন বাংলাদেশের সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত দ্বন্দ্ব আছে, ভারত-চীনের মধ্যে রাজনৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বও আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের বোঝাপড়া ভালো। এই বাস্তবতায় ভারত-চীন সম্পর্কের শীতলতা কাটাতে বাংলাদেশের ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। আমরা মনে করি, সব সম্ভাবনাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে বাংলাদেশ যদি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমে এগিয়ে নিতে পারে, তবে তা এ দেশের জন্য বড় আশার কথা হবে। আর এ পথচলায় সাফল্য আসার প্রথম ধাপ হচ্ছে এবারের সব চুক্তির সফল বাস্তবায়ন। চীনারা পরিশ্রমী জাতি। তারা চাইবে সুপাত্রে বিনিয়োগ করতে। আশা করি, আমাদের বিধায়করা সংকীর্ণ রাজনীতি অতিক্রম করে নিজেদের মেলে ধরতে পারবেন।

 

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com


মন্তব্য