kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


হুন্ডি রাজস্ব আয় ও রিজার্ভ বৃদ্ধির অন্তরায়

রিয়াজুল হক

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



অনেক প্রবাসী তাদের অর্জিত আয় বৈধ মাধ্যমে দেশে না পাঠিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর (হুন্ডি ব্যবসায়ী) দ্বারস্থ হয়। কয়েকটি কারণে প্রবাসীরা এই হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ করে থাকে—(১) যারা অবৈধভাবে বিদেশে গমন করেছে, অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা এড়ানোর জন্য; (২) ব্যাংকিং চ্যানেলের কিছু নিয়মকানুন পালন না করার জন্য; (৩) ব্যাংকের চেয়ে সামান্য বেশি মুদ্রা বিনিময়মূল্য পাওয়ার জন্য; (৪) কোনো ধরনের সার্ভিস চার্জ না দেওয়ার জন্য; (৫) সর্বোপরি প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে অফিশিয়াল মাধ্যমে অর্থ প্রেরণের সুযোগ না থাকার কারণে হুন্ডির সাহায্য নেওয়া হয়।

এখানে কোনো কাগজপত্রের বালাই নেই। এই প্রক্রিয়ায় কোনো বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসে না। হুন্ডির মাধ্যমে আমাদের দেশের অভ্যন্তরের অর্থও বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে বিভিন্ন দেশে ৮৬ লাখ প্রবাসী বাঙালি রয়েছে। তাদের মধ্যে শতকরা প্রায় ৯৮ ভাগ পুরুষ ও বাকি অংশ নারী। জুলাই-মে ২০১৬ সময়ে বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসীরা এক হাজার ৩৪৫ কোটি ৪৭ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে। জুলাই-মে ২০১৫ একই সময়ে প্রবাসীরা এক হাজার ৩৮৭ কোটি ৭৫ লাখ ডলার পাঠিয়েছিল। অর্থাৎ ৩.১ শতাংশ কম। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এক হাজার ৫৩২ কোটি ডলার; ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এক হাজার ৪২৩ কোটি ডলার এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে এক হাজার ৪৪৬ কোটি ডলার রেমিট্যান্স প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছে। হুন্ডি ব্যবসার সম্প্রসারণের কারণে রেমিট্যান্সের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে না।

গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার হয়েছে এক লাখ ২৯ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা, যা মোট পাচারের ১৫ শতাংশ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মতে, প্রবাসীরা বিদেশ থেকে দেশে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠায়, তার ৪০ শতাংশ আসে ব্যাংকিং চ্যানেলে। বাকি ৬০ শতাংশের মধ্যে ৩০ শতাংশ আসে সরাসরি প্রবাসী বা তাদের আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে নগদ আকারে। আর বাকি ৩০ শতাংশ আসে হুন্ডির মাধ্যমে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে মোট দেড় হাজার কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। হিসাব অনুযায়ী এর মধ্যে হুন্ডির মাধ্যমে এসেছে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা (১৪-০৭-২০১৬, দৈনিক আমাদের সময়)। হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর বেশ কিছু কারণও আইএলও তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। বৈধ পথে টাকা পাঠাতে গেলে বিদেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অনেক সময়ই রূঢ় আচরণের শিকার হতে হয়। পাশাপাশি টাকা পেতে কিছুটা সময়ও লাগে। অথচ হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো টাকা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পেয়ে যায় প্রবাসীর স্বজনরা। বাংলাদেশ থেকে ২০১৫ সালে প্রায় ১২৫ কোটি টাকা ফেসবুক ও গুগলের অ্যাকাউন্টে হুন্ডি হয়ে প্রবেশ করেছে। ২০১৬ সালে এই পরিমাণ দ্বিগুণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে যেসব প্রতিষ্ঠান গুগল-ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেয়, তাদের কেউ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নেয় না। ফলে কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন ব্যবসা হলেও এ খাত থেকে কোনো রাজস্ব পায় না সরকার। অথচ দেশের ভেতর কোনো গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিতে হলে ১৫ শতাংশ উেস কর দিতে হয়, সঙ্গে রয়েছে ৪ শতাংশ রাজস্ব।

এ মুহূর্তে সরকারের পক্ষ থেকে ২২ শতাংশ হুন্ডি বা হুন্ডি-সংশ্লিষ্ট অবৈধপথে রেমিট্যান্স আসার কথা বলা হলেও এ হার উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিভিন্ন সময়ের জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত তিন বছরে হুন্ডি বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৩ সালে প্রবাসী আয়ের মাত্র ১০.০৪ শতাংশ হুন্ডির মাধ্যমে আসত। এখন আসছে ২২ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। হুন্ডিকারীরা কৌশলে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সাইনবোর্ড টানিয়ে অর্থ সংগ্রহ করছে। এরপর মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের মাধ্যমে তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে সুবিধাভোগীর কাছে (২০-০৬-২০১৬, প্রতিদিনের সংবাদ)। এ ছাড়া বিমানবন্দরে যে পরিমাণ হুন্ডির টাকা জব্দ করা হয়, তা মোট পাচারকৃত অর্থের পাঁচ শতাংশ মাত্র। বাকি ৯৫ শতাংশ অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে নিরাপদে পাচার হয়ে যায়। স্থলবন্দরগুলোতেও চলে হুন্ডির ব্যবসা। কোনো ধরনের বাধা-বিঘ্ন ছাড়াই চলছে লোকজনের যাওয়া-আসা এবং হুন্ডির মাধ্যমে চলছে পণ্য আমদানি। এতে হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

প্রবাসী আয় নেতিবাচক হলে জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে, তা দেশে বিনিয়োগ হলে মোট জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পেত। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো। হুন্ডি ব্যবসা বন্ধ হলে দেশের রিজার্ভ যেমন বৃদ্ধি পাবে, দেশের রাজস্ব আয় বৃদ্ধিসহ স্থানীয় বিনিয়োগের পরিমাণও অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। ফরেন রেমিট্যান্স আমাদের দেশের রিজার্ভের প্রধান খাত হিসেবে চিহ্নিত। প্রবাসীরা যেন হুন্ডি ব্যবসায়ীদের প্রলোভনে না পড়ে, সেই কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। বৈধপথে অর্থ পাঠানোর জন্য প্রবাসীদের সব ধরনের ভোগান্তি দূর করতে হবে। এ ছাড়া হুন্ডির সম্প্রসারণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। কারণ হুন্ডি ব্যবসা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য হুমকিস্বরূপ।

 

লেখক : উপপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

riazul.haque02@gmail.com


মন্তব্য