kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা

কালিদাস ভক্ত

১১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা

হিন্দুধর্মে ঈশ্বর নিরাকার হলেও তিনি যেকোনো রূপ ধারণ করতে পারেন। ঈশ্বরের ক্ষমতা সীমাহীন।

সীমাহীন তাঁর গুণ। ঈশ্বর যখন নিজের গুণ বা ক্ষমতাকে আকার দান করেন তখন তাঁকে দেবতা বলে। ‘দিব্’ ধাতু থেকে দেব, দেবী বা দেবতা শব্দটির উত্পত্তি হয়েছে। দিব্ + অচ্ = দেব। স্ত্রীলিঙ্গে দেবী। দিব্ ধাতুর অর্থ প্রকাশ পাওয়া। তাই যিনি প্রকাশ পান তিনি দেবতা। ঈশ্বর যে রূপে সৃষ্টি করেন, তাঁর নাম ব্রহ্মা। যে রূপে পালন করেন, তাঁর নাম বিষ্ণু। যে রূপে ধ্বংস করেন, তাঁর নাম শিব। দুর্গা শক্তির দেবী, সরস্বতী বিদ্যার দেবী, লক্ষ্মী ধনের দেবী। এ রকম আরো অনেক দেব-দেবী আছেন। পূজা করলে ও ব্রত পালন করলে দেবতারা খুশি হন। মানুষ পূজা ও ব্রত পালনের মাধ্যমে দেবতার কৃপা লাভ করে। দেবতাদের পূজা ও ব্রত করলে ঈশ্বর তা গ্রহণ করেন এবং তিনি খুশি হন। হিন্দুধর্মে অগ্নি, ইন্দ্র, মিত্র, রুদ্র, বরুণ, বায়ু, সোম, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, মনসা, বিশ্বকর্মা, শীতলা, ক্ষেত্রদেবতা, দক্ষিণ রায় প্রভৃতি প্রধান দেব-দেবী। দেব-দেবীর পূজা বিভিন্ন সময়ে করা হয়। কোনো দেব-দেবীর পূজা প্রতিদিনই করা হয়। যেমন—বিষ্ণু, শিব, লক্ষ্মী প্রভৃতি। আবার বিশেষ বিশেষ তিথিতে কোনো কোনো দেব-দেবীর পূজা করা হয়। যেমন—ব্রহ্মা, কার্তিক, সরস্বতী প্রভৃতি। আমাদের আদি ধর্মগ্রন্থ বেদের ওপর ভিত্তি করে পুরাণ নামক ধর্মগ্রন্থগুলো রচিত হয়েছে। বেদ ও পুরাণে বিভিন্ন দেব-দেবীর রূপ, শক্তি, প্রভাব, সামাজিক গুরুত্ব ও পূজা-প্রণালী বর্ণনা করা হয়েছে। এ ছাড়া আরো কিছু দেবতা রয়েছেন, যাঁদের কথা বেদ ও পুরাণে নেই। কিন্তু ভক্তরা যুগ যুগ ধরে পূজা করে আসছে। এভাবে আমরা তিন ধরনের দেবতার পরিচয় পাই। যথা—১. বৈদিক দেবতা, ২. পৌরাণিক দেবতা, ৩. লৌকিক দেবতা।

বেদে যেসব দেবতার কথা বলা হয়েছে, তাঁদের বৈদিক দেবতা বলে। যেমন—অগ্নি, ইন্দ্র, মিত্র, রুদ্র, বরুণ, বায়ু, সোম প্রভৃতি। বৈদিক দেবী হিসেবে সরস্বতী, উষা, অদিতি, রাত্রি প্রভৃতি। বৈদিক দেবতাদের কোনো মূর্তি ছিল না। দেবতাদের শরীর ছিল মন্ত্রময়। হোমানল প্রজ্বালিত করে বা অগ্নির মাধ্যমে দেবতাদের আহ্বান করা হতো।

পুরাণে যেসব দেবতার বর্ণনা করা হয়েছে, তাঁদের পৌরাণিক দেবতা বলা হয়। যেমন—ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, দুর্গা, সরস্বতী প্রভৃতি। পুরাণে বৈদিক দেবতাদের অনেকের রূপের পরিবর্তন ঘটেছে, অনেক নতুন দেবতার আবির্ভাব ঘটেছে। তাই অনেক দেবতার বিগ্রহ বা মূর্তি নির্মাণ করা হয়েছে। প্রচলিত হয়েছে দেবতাদের পূজা করার পদ্ধতি ও বিধিবিধান। ধ্যানলব্ধ দেবতারা পেয়েছেন ধ্যানানুসারী মূর্তি। বেদের বিষ্ণুকে দেখি পুরাণে শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী ঘনশ্যাম বিষ্ণুরূপে। এ ছাড়া সূর্য, অগ্নি, ইন্দ্র, বরুণ প্রভৃতি বৈদিক দেবতার উল্লেখ পুরাণে রয়েছে।

বেদ ও পুরাণে যেসব দেবতার কথা বলা হয়নি, কিন্তু ভক্তরা তাঁদের পূজা করে, তাঁদের বলা হয় লৌকিক দেবতা। যেমন—মনসা, শীতলা, ক্ষেত্রদেবতা, দক্ষিণ রায় প্রভৃতি। পরবর্তীকালে মনসা দেবীসহ আরো অনেক লৌকিক দেবতা পুরাণেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

মন্ত্রে যেভাবে দেব-দেবীর বর্ণনা করা হয়েছে, সেভাবে তাঁদের মূর্তি নির্মাণ করা হয়েছে। পৌরাণিক যুগে মন্দির নির্মাণ করে তাতে দেব-দেবীর মূর্তি স্থাপন করে পূজা করার পদ্ধতি প্রচলিত হয়েছে। পত্র-পুষ্পের অঞ্জলি দিয়ে নৈবেদ্য বা ভোগ সাজিয়ে বাজনা বাজিয়ে ঘটা করে পৌরাণিক দেবীর পূজা করা হয়। কোনো কোনো দেব-দেবীর পূজা প্রতিদিনই করা হয়। যেমন—নারায়ণ, শিব, লক্ষ্মী প্রভৃতি। আবার কোনো কোনো দেব-দেবীর পূজা বিশেষ বিশেষ তিথিতে করা হয়। যেমন—ব্রহ্মা, দুর্গা, কার্তিক, সরস্বতী প্রভৃতি। তবে প্রতিদিন যেসব দেব-দেবীর পূজা করা হয়, বিশেষ বিশেষ তিথিতেও তাঁদের অনেকের পূজা করা হয়। যেমন—বিষ্ণু বা নারায়ণ, শিবসহ কিছু দেবতা।

হিন্দুধর্মে এসব দেব-দেবীর মধ্যে যে দেবীর পূজা সবচেয়ে বড় ও প্রধান, তিনি হলেন দেবী দুর্গা। তিনি শক্তির দেবী। তিনি আদ্যাশক্তি মহামায়া। তিনি মহাজাগতিক শক্তির অধীশ্বরী। তিনি দুর্গতি নাশ করেন বলে তাঁকে দুর্গা বলা হয়। আবার তিনি দুর্গম নামক অসুরকে নাশ করেছেন। এ জন্য তাঁর নাম দুর্গা। দেবী দুর্গার বাহন সিংহ। দুর্গাপূজা হিন্দুদের সবচেয়ে বড় উৎসব। মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত ‘শ্রীশ্রী চণ্ডী’ নামক গ্রন্থে দুর্গার সৃষ্টি কাহিনী ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। তাই দুর্গাপূজায় চণ্ডী পাঠ করা হয়। শ্রীশ্রী চণ্ডীতে বলা হয়ছে, ব্রহ্মার বরে বলীয়ান হয়ে মহিষাসুর নামক এক অসুর দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গরাজ্য দখল করে। দেবতারা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হন। স্বর্গরাজ ইন্দ্রসহ সব দেবতা মিলিত হয়ে ব্রহ্মা ও শিবের কাছে যান। তারপর ব্রহ্মার পরামর্শে সবাই মিলে বিষ্ণুর কাছে যান। মহিষাসুরের অত্যাচারের কাহিনী শুনে সবাই ক্রুদ্ধ হন। তাঁদের শরীর থেকে তেজ বেরোতে থাকে। সব দেবতার তেজ একত্র হয়ে এক তেজোপুঞ্জের সৃষ্টি হয়। সেই তেজোপুঞ্জ এক নারীর রূপ নেয়। এই নারীই দেবী দুর্গা। দুর্গার অনেক নাম—মহিষাসুরমর্দিনী, মহামায়া, জয়দুর্গা, জগদ্ধাত্রী, শূলিনী, কালী, বিপদনাশিনী, সন্তোষী, গন্ধেশ্বরী, শাকম্ভরী, বনদুর্গা, কাত্যায়নী ইত্যাদি রূপেও দুর্গা পূজিত হন। দেবী দুর্গার ১০ হাত। তাঁর ১০ হাত বলেই তাঁকে দশভুজা বলা হয়। তাঁর ১০টি হাত ও তিনটি চোখ রয়েছে। এ জন্য তাঁকে ত্রিনয়না বলা হয়। তাঁর বাঁ চোখ চন্দ্র, ডান চোখ সূর্য এবং কপালের ওপর অবস্থিত চোখকে জ্ঞানচোখ বলা হয়। তাঁর হাতে ১০টি অস্ত্র রয়েছে, যা শক্তির প্রতীক। সবচেয়ে শক্তিধর প্রাণী সিংহ তাঁর বাহন। দেবী হিসেবে দুর্গার গায়ের রং অতসী ফুলের মতো সোনালি হলুদ। তিনি তাঁর ১০ হাত দিয়ে দশদিক থেকে অকল্যাণ দূর করেন এবং আমাদের কল্যাণ করেন। দেবী দুর্গার ডান দিকের পাঁচ হাতের অস্ত্রগুলো যথাক্রমে ত্রিশূল, খড়্গ, চক্র, বাণ ও শক্তি নামক অস্ত্র। বাঁ দিকের পাঁচ হাতের অস্ত্রগুলো যথাক্রমে শঙ্খ, ঢাল, ঘণ্টা, অঙ্কুশ ও পাশ। এসব অস্ত্র দেবী দুর্গার অসীম শক্তি ও গুণের প্রতীক। বছরে দুইবার দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। শরৎকাল ও বসন্তকালে। শরৎকালে অনুষ্ঠিত হয় বলে দুর্গাপূজাকে শারদীয় দুর্গাপূজা বলা হয়। বসন্তকালে অনুষ্ঠিত হয় বলে দুর্গাপূজাকে বাসন্তী দুর্গাপূজা বলা হয়। তবে শারদীয় দুর্গাপূজা প্রসিদ্ধ। শারদীয় দুর্গাপূজা আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। দুর্গার প্রণামমন্ত্র—

সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।

 শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী, নারায়ণী নমোস্তুতে

—হে সকল প্রকার মঙ্গলদায়িনী, মঙ্গলময়ী, সর্বার্থসাধিকা, ত্রিনয়না, গৌরী, নারায়ণী, তোমাকে নমস্কার।

দেবী দুর্গা ঈশ্বরের শক্তি। তাঁকে আদ্যাশক্তি বলা হয়। তিনি মহামায়া। পৃথিবীর জীব ও জগতের মধ্যে যে মায়া, তা মহামায়ারই মায়া। দেবী-পুরাণসহ অনেক পুরাণ ও তন্ত্রশাস্ত্রে দেবী দুর্গার মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। বেদেও দুর্গার উল্লেখ আছে। দুর্গা যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হয়ে থাকেন। ১০ হাতের অস্ত্র দিয়ে তিনি যুদ্ধ করে থাকেন। ধার্মিককে তিনি রক্ষা করেন এবং অধার্মিককে বিনাশ করেন। সর্বপ্রথম বসন্তকালে বাসন্তী দুর্গাপূজা হতো। রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য বসন্তকালে দুর্গাপূজা করেছিলেন। রাজা শ্রীরামচন্দ্র অকালে অর্থাৎ বসন্তকাল ছাড়া অন্য একটি কালে—শরৎকালে দুর্গাপূজা করেন। শারদীয় দুর্গাপূজাই প্রসিদ্ধ। এ পূজা হিন্দুদের সবচেয়ে বড় পূজা এবং বড় ধর্মীয় উৎসব। এ সময় প্রকৃতি ও মানবমনে আনন্দের সাড়া পড়ে যায়। দুর্গাপূজার সময় মেলা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি আমাদের দুর্গতি ও দুঃখ-কষ্ট থেকে পরিত্রাণ করেন। কোথাও যাত্রা করার সময় এবং সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময় মা দুর্গা মা দুর্গা বলা হয়। তাহলে সব শুভ হয়। দুর্গা মহিষাসুর ছাড়া অনেক অসুর বধ করেছেন। যেকোনো অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিবিধানের সময় দেবী দুর্গা আমাদের প্রেরণা।

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য