kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শান্তিময় মহাশক্তির উদ্বোধন

নিরঞ্জন অধিকারী

১১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



শান্তিময় মহাশক্তির উদ্বোধন

শরতের সুনীল আকাশ। ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ার লুকোচুরি খেলা।

সাদা কাশবনে বাউল বাতাস। রক্তিম বৃন্তে শ্বেতপবিত্র শেফালি। এই শরতে মা আসেন। মা আমার আদ্যাশক্তি মহামায়া দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা। জগৎ-প্রপঞ্চ তাঁরই মায়ায় নিবদ্ধ। যখনই ভক্ত বিপদে পড়ে তখন তাকে ডাকেন। তিনি শক্তি দেন। ভক্ত ত্রাণ পায় বিপদ থেকে। দেবতাদের রাজপদ ‘ইন্দ্র’ নামে পরিচিত। দেবরাজের ইন্দ্রত্ব অর্থাৎ রাজপদ মাঝেমধ্যে অসুররা ছিনিয়ে নেয়। ইন্দ্রত্ব লাভ করে অসুরে দেবতাদের স্বর্গ থেকে তাড়িয়ে দেয়। তখন দেবতারা শক্তির আরাধনা করেন। শক্তি সঞ্চয় করেন। দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে আবির্ভূত হন দেবী দুর্গা। দেবী দুর্গা প্রতিপক্ষ অসুরদের বিনাশ করেন। দেবতারা ফিরে পান তাঁদের স্বর্গরাজ্য। স্বর্গরাজ্য ফিরে পেয়ে দেবতারা সকৃতজ্ঞচিত্তে দেবীর স্তব করেন—

শরণাগত দীনার্ত পরিত্রাণপরায়ণে

সর্বস্যার্তি হরে দেবী নারায়ণী নমোহস্তুতে

—হে শরণাগত, দীনার্ত, পরিত্রাণপরায়ণে, সকলের আর্তি হরণকারিণী দেবী, হে নারায়ণী, তোমকে নমস্কার করি।

পৌরাণিক উপাখ্যান থেকে দেবী দুর্গা সম্পর্কে আমরা বেশ কয়েকটি তথ্য লাভ করি। দেবতারা যখন অলস ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন, তাঁদের শক্তি কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল, তখনই অসুররা স্বর্গরাজ্য অধিকার করে নিতে সক্ষম হয়েছিল। তখন দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে দেবী দুর্গার আবির্ভাব। এই যে সম্মিলিত শক্তি, এ কথাটা তাত্পর্যপূর্ণ। একক নয়, সম্মিলিত শক্তি। হতাশায় নিশ্চেষ্ট থাকা নয়, পূর্ণ উদ্যমে শক্তি সঞ্চয়ের প্রয়াস এবং মহাশক্তির উদ্বোধন। সেই মহাশক্তিতে অসুরকে আঘাত করা এবং বিজয় অর্জন। আবার দেবী দুর্গা শান্তিপ্রদায়িনী। অসুর নাশ করে তিনি দেবতাদের শান্তি দিয়েছিলেন। দুর্গতি থেকে তাঁরা মুক্ত হয়ে পেয়েছিলেন পরম শান্তি। সেখানে দেবী দুর্গা শান্তির প্রতীক। তাইতো শ্রীশ্রী চণ্ডীতে বলা হয়েছে—

যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা।

নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ

—যে দেবী সর্বভূতে বিশ্বচরাচরের শান্তিরূপে বিরাজ করেন, সেই দেবীকে নমস্কার করি।

দেবী দুর্গা তাই শক্তি ও শান্তি দুরূপেই প্রকাশিত। এ থেকে  আমরা এ শিক্ষাই পাই, আমরা যখন কোনো সংকটে নিপতিত হব তখন হতাশায়, গ্লানিতে নিশ্চেষ্ট-নিষ্ক্রিয় থাকব না। আমরা গ্রহণ করব সক্রিয় উদ্যোগ। আমরা আমাদের ভেতরের শক্তিকে জাগ্রত করব নিরন্তর সাধনায়, অক্লান্ত প্রচেষ্টায়। তারপর প্রত্যেকের শক্তিকে সম্মিলিত করব, আমরা ঐক্যবদ্ধ হব। আমরা সংহত হব। সংহত হওয়ার পর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাকে নিয়োজিত করব সংকটের মোকাবিলায়। অবশ্যই আমাদের বিজয় হবে এবং পরিণামে আমরা লাভ করব শান্তি।

যেমন, যখন আমরা প্রবল বন্যার আক্রমণে আক্রান্ত হয়ে বিপর্যস্ত হই তখন আমরা ভয় পাই না। সবাই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা বন্যার মোকাবিলা করি। দুর্গতদের ত্রাণ করার জন্য ‘ত্রাণের’ হাত বাড়িয়ে দিই। এর মধ্য দিয়ে আমাদের মধ্যে দেবী দুর্গার শক্তির প্রকাশ ঘটে। বন্যার প্রকোপ কমে গেলেও বন্যার পরবর্তী দুরবস্থা থাকে। তখন পুনর্বাসনের পালা। এ ক্ষেত্রেও ঐক্যবদ্ধভাবে সম্মিলিত শক্তিতে আমরা কাজ করে যাই। পরিণামে আমরা পাই শান্তি, অসুর বিনাশের পর দেবতারা যেমন পেয়েছিলেন।

যেখানে অনৈক্য, বিভেদ, নিষ্ক্রিয়তা, সেখানেই সুরের-মঙ্গলের-কল্যাণের পরাজয়, তখনই ঘটে অসুরের আবির্ভাব। সম্মিলিত শক্তি ছাড়া সে অসুরের পরাজয় অসম্ভব। সুর আর অসুর, ভালো আর মন্দের এই দ্বন্দ্ব ঘটছে সমাজে, দেশে এবং বিশ্বে। এমনকি ঘটছে নিজের মধ্যেও। নিজের ভেতরকার অসুরটিকে বিনাশ করতে হবে, না হলে সে অসুর অধিকার করে নেবে ‘শান্তির’ স্বর্গরাজ্য। অহংকার, লোভ প্রভৃতি একেকটি অসুর। আর এগুলোই মানবাত্মার শত্রু। এরাই সমাজে সৃষ্টি করে অনাচার। এগুলোই মহিষাসুর, রক্তবীজ, চিক্কুর, চামর। এদেরই আমরা দেখি সন্ত্রাসীরূপে, অসামাজিক কর্মকাণ্ডের দানব এরাই। ব্যক্তির ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে এরা সমাজকে কলুষিত করে। তাই চাই সুরের ভেতরকার শক্তিতে মহাশক্তির উদ্বোধন। অন্তরের অসুরের বিনাশ ঘটিয়ে বিজয়ী হয় ‘সুর’। তাতেই আসে শান্তি, কল্যাণ। দুর্গাপূজার মধ্য দিয়ে এ তাত্পর্য প্রকাশিত। আমরা যেন তা শারদীয় দুর্গাপূজার মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করি। সেভাবেই নিজেদের প্রস্তুত করি। প্রার্থনা করি; অন্তরমন্দিরে এসো হে শক্তিময়ী, অসুরকে বিনাশ করে তুমি আমাদের শান্তি দাও। চিনে নিই, জেনে নিই অসুরের ভয়াল স্বরূপ—জাগ্রত করি, উদ্বোধিত করি সুরের শক্তিময় শান্তি, শান্তিময় শক্তি।

 

লেখক : অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য