kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


‘মিড ডে মিল’ ও প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রযাত্রা

শাহীন আহমেদ

১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



 ‘মিড ডে মিল’ ও প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রযাত্রা

অনেক শিশু স্কুলে যায় না। গেলেও পড়াশোনায় তাদের মন থাকে না।

রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জ। এ উপজেলার এমন বহু সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় ঘুরে এমন চিত্রই দেখেছি। অনেক পরিবার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সন্তানদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে পারছিল না।

২০০৮ সালের ঘটনা। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে এসব ছবিই দেখতে হয় আমাকে। তখনই পণ করেছিলাম, একদিন এ অবস্থা আর থাকতে দেব না। বদলে দেব পড়াশোনার ধরন। বদলে দেব গ্রামাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোর দুঃখ-দুর্দশা। ঝরে পড়া শিশুদের আবারও স্কুলমুখী করব। এসব চিন্তা মাথায় কেবলই ঘুরপাক খেত।

২০০৯ সালের উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে এ এলাকার মানুষ আমাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করে। সেটিকে মোক্ষম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে থাকি ঠিক স্বপ্নের পথে। কথা বলি সংশ্লিষ্ট পরিবারের কর্তাব্যক্তি, সমাজের অভিভাবক ও স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের সঙ্গে। সবাই একবাক্যে সমর্থন করেন। মনের জোর আরো বেড়ে যায়।

প্রথম ধাপে পাঁচটি স্কুল নিয়ে শুরু হয় স্বপ্নের পথচলা, ‘মিড ডে মিল’। এ কর্মসূচিই বদলে দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেয় এলাকাগুলোয়। মিড ডে মিল কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করি স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, অভিভাবক ও শিক্ষকদেরও।

বলা হয়ে থাকে যে শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। তাহলে শিক্ষার মেরুদণ্ড কী? নিঃসন্দেহে প্রাথমিক শিক্ষা। একজন শিক্ষার্থী, একটি জাতির স্তম্ভও সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রতিটি অঞ্চলের শিক্ষানুরাগীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন যে সুবিধাবঞ্চিত এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় মিড ডে মিল কর্মসূচি চালু করার।

আমি দুই দফায় কেরানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। আমার নিজস্ব উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন ও এর ফলে বদলে যাওয়া মানুষ ও জনপদের উজ্জ্বল চিত্র তুলে ধরলে হয়তো সেটি সারা দেশের সুবিধাবঞ্চিত এলাকার প্রয়োজনে কাজে লাগানো যেতে পারে।

গ্রামে ঘুরতে গিয়ে এমনও অনেক শিশু দেখেছি, যাদের পরনের জামা ছিল মলিন। রোগা শরীর নিয়ে স্কুলে আসত আধপেটা বা একদম খালি পেটে। ওদের মধ্যে ছিল পুষ্টিহীনতা। বিদ্যালয়ের বেঞ্চে এসে বসত এবং শিক্ষকের পড়ানোর প্রতি হাঁ করে তাকিয়ে থাকত বটে, মগজে কিছুই ঢুকত না। সেখানেই তাদের আসল শিক্ষার শূন্যতা।

আমি ব্যক্তিগতভাবে পর্যালোচনা ও একটি জরিপ চালিয়ে নিশ্চিত হই যে ঠিক কী পরিমাণ শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। আরো জানার চেষ্টা করি যে স্কুলের আওতায় গেলে কী পরিমাণ শিক্ষার্থী নানা রকমের শূন্যতায় ভোগে। তখন জানা যায়, অভাব কিংবা দারিদ্র্যের কারণেই অগণিত শিশু পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ দিতে পারে না।

কেরানীগঞ্জের চর চামারদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শাক্তা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাইনা খালপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর সোনাকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে লক্ষ্য করে এগোতে থাকে আমার স্বপ্ন ও পরিকল্পনা। সঙ্গী হিসেবে আছে বিভিন্ন শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষানুরাগী ও অভিভাবকের দেওয়া পরামর্শ। এই পাঁচটি বিদ্যালয়ে চালু করি ‘মিড ডে মিল’।

এরপর আর পেছন ফিরে তাকাইনি। শুধুই সামনে এগিয়ে যাওয়া। অল্প কিছুদিনের মধ্যে তালিকায় যুক্ত হবে মোট ১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মিড ডে মিল বলতে শিশু শিক্ষার্থীদের পেটভরে খাওয়ানোর কর্মসূচি, যা ২০০৯ সালে আমি শুরু করেছি। আমার স্বপ্ন অনেক। আশা আছে, কেরানীগঞ্জের যত সুবিধাবঞ্চিত এলাকা বা বিদ্যাপীঠ রয়েছে, সব কটিতে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব।

খুবই অন্য রকমের অনুভূতি জন্ম নেয় মনের ভেতর। প্রতিদিন সকালে এই পাঁচটি স্কুলে পরিদর্শনে বের হই। ঘুরে দেখার চেষ্টা করি, শিশুরা আদৌ খুশি কি না। নাকি কোথাও ফারাক রয়ে যাচ্ছে। ওদের সঙ্গে বসেই অনেক দিন ব্রেকফাস্ট হয়েছে। ওরা যা খায়, আমিও তা-ই খাই। কখনো খিচুড়ি, মাছ-সবজি কিংবা কখনো রুটি-ডিম। সর্বোপরি শিশুদের পুষ্টিহীনতা দূর করতে উপকারী খাবারগুলোই ওদের জন্য নিয়মিত পরিবেশন করা হয়। আর এই মহান কাজে আমি একা নই, শামিল হয়েছে এলাকার সর্বস্তরের মানুষও। কৃষকরা আছেন। মায়েরা আছেন। কৃষক বাবারা একেকজন একেক ধরনের সবজি দিয়ে যান। কেউ বা তেলও দিয়ে যান। আর মায়েদের ভূমিকা আরো সাজানো। আমি কয়েক দিন পরপরই মা সমাবেশ করি। সেখানে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের মায়েরা উপস্থিত হন। তাঁদের আগ্রহের ভিত্তিতেই রাঁধুনি নির্বাচন হয়। আর সেটি তাঁদের মধ্য থেকেই। তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন সময়সূচি নির্ধারণ করে রাঁধেন গোটা স্কুলের ছেলেমেয়েদের জন্য। এ যেন অন্য রকম অনুভূতি।

শুধু পুষ্টিকর খাবার পরিবেশনই নয়, বিশুদ্ধ পানিও নিশ্চিত করেছি। উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে উপজেলার সব বিদ্যালয়ে বিশুদ্ধ পানীয় ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করেছি। শিশুদের শৃঙ্খলা শেখাতে করে দিয়েছি অনেক কমিটি। তাতে সম্পৃক্ত রয়েছে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থী। সবার সমন্বয়ে শৃঙ্খলাচর্চা চলছে। মনোবিকাশের ব্যবস্থাও করেছি।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অংশ হিসেবে উপজেলার ১২৮টি বিদ্যালয়ে বিতরণ করেছি কম্পিউটার। প্রতিটি স্কুলের তিনজন শিক্ষককে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করেছি। ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষকদের আরো দক্ষ করে তুলতে ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে নিবিড় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি।  EIA (English in Action)-এর আওতায় ২৪টি বিদ্যালয়ের তিনজন করে শিক্ষক প্রশিক্ষিত ছিলেন। আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাকি ১০৪টি বিদ্যালয়ে ৩১২ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি। প্রতিটি বিদ্যালয়ে স্পিকারও দেওয়া হয়েছে।  

কেরানীগঞ্জের যে পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘মিড ডে মিল’ কর্মসূচি চালু আছে, সেসব এলাকার আশপাশে এখন আর কোনো সুবিধাবঞ্চিত শিশু নেই। কোনো শিশুই এখন আর বিদ্যালয়ের গণ্ডির বাইরে থাকছে না। একটি শিশুকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। বিদ্যালয়ের বেঞ্চে বসতেই ওদের প্রফুল্ল দেখা যায়, যা এ কর্মসূচি গ্রহণের আগে কখনোই দেখা মিলত না।

শুধু প্রাথমিক স্তর নয়, নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে কেরানীগঞ্জের গোটা শিক্ষাব্যবস্থা পাল্টে গেছে। উন্নত হয়েছে পড়াশোনার মানও। এখন আর অর্ধেকে আটকে নেই পাসের হার। সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, কেরানীগঞ্জে বর্তমানে পাসের হার ৯৯.৫২ শতাংশ। পাসের হারের দিক থেকে ঢাকা জেলা ও ঢাকা বিভাগে কেরানীগঞ্জ প্রথম। শিক্ষাক্ষেত্রে নানা রকমের উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও অনন্য ভূমিকার অংশ হিসেবে ২০১২ সালে সরকার আমাকে দেশের শ্রেষ্ঠ উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে সম্মানিত করেছে। এর পর থেকে স্থানীয়ভাবে শিক্ষার মানোন্নয়নে আমি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।

বিত্তবানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্থানীয়দের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, সবার সংশ্লিষ্টতায় গ্রামে গ্রামে ‘মিড ডে মিল’ কর্মসূচি চালু করা হোক। স্কুলে স্কুলে রান্না হবে। এতে এক বেলা খাওয়ার সুযোগ পাবে শিশুরা। সবার মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরি হবে। বন্ধুসুলভ আচরণের দীক্ষা সেখান থেকেই পাবে খুদে শিক্ষার্থীরা। মিড ডে মিল কর্মসূচি পুরোদমে চালু হলে দেশের কোনো শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আওতার বাইরে থাকবে না।

প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বান যুগোপযোগী। এটি বাস্তবায়িত হলে সুবিধাবঞ্চিত এলাকাগুলোয় আমূল পরিবর্তন সাধিত হবে। পাইলট প্রকল্প বিবেচনা করা হলে আমার উপজেলা কেরানীগঞ্জই এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

কেরানীগঞ্জের কয়েকটি জনপদ যেভাবে বদলে গেছে, যেভাবে এখানে আলোর ছোঁয়া লেগেছে, তাতে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে বাংলাদেশের সব সুবিধাবঞ্চিত স্কুল বা এলাকায় এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে বদলে যাবে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার অনেক কিছু। ঝরে পড়া রোধ হবে। সত্যিকারের শিক্ষায় শিক্ষিত হবে ভবিষ্যৎ নাগরিক। দূর হবে শিশুর পুষ্টিহীনতা, সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেড়ে ওঠার পাশাপাশি স্কুলের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া কমবে। সৃজনশীল মানুষ হিসেবেই আজকের শিশু আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।

 

লেখক : উপজেলা চেয়ারম্যান, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

 


মন্তব্য