kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শারদীয় দুর্গোৎসব সব সম্প্রদায়ের সম্প্রীতির বন্ধন

স্বপন সাহা

১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



শারদীয় দুর্গোৎসব সব সম্প্রদায়ের সম্প্রীতির বন্ধন

দুর্গাপূজা ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। বিভিন্ন রাষ্ট্রের বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোয় শারদীয় দুর্গোৎসব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসবের আমেজে পাঁচ দিনব্যাপী সব সম্প্রদায়ের মধ্যে এক সুন্দর সম্প্রীতির পরিবেশের সৃষ্টি করে।

সবার কাছে আজ ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব।

দুর্গাপূজার প্রধান আবেদন হলো, ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন’, অর্থাৎ সব অশুভ শক্তিকে নির্মূল করার জন্যই পৃথিবীতে প্রতিবছর দুইবার দেবী দুর্গার আগমন হয়। প্রাচীনকাল থেকেই বছরের চৈত্র মাসে বসন্তকালে বাসন্তী নামে পৃথিবীতে মা দুর্গা আবির্ভূত হন, যা হিন্দু সম্প্রদায়ে বাসন্তী পূজা হিসেবে উদ্যাপন করা হয়।

রাক্ষস রাজা রাবণ রামচন্দ্রকে যুদ্ধে পরাভূত করার জন্য কৌশল হিসেবে তাঁর সহধর্মিণী সীতাকে অপহরণ করে লঙ্কায় নিয়ে যায়। রামচন্দ্র সীতাকে উদ্ধারের জন্য শরৎকালে অকালবোধনের মাধ্যমে মা দুর্গাকে আবাহন করেন। তখন থেকেই শরৎকালে এই শারদীয় পূজার প্রচলন শুরু। ভক্তরা বাসন্তী মায়ের আরাধনা করেন সব প্রাণীর দুঃখ-দৈন্য, অভাব-অনটন, রোগমুক্তি, অন্যায়-অবিচার, অত্যাচার দূর করে, মানুষের তথা দেশের সুখ, সমৃদ্ধি ও শান্তিময় জীবনের আশায়।

শারদীয় উৎসবের উদ্দেশ্য একই, তবে বাসন্তী পূজার তুলনায় শারদীয় সর্বজনীনতা ও উৎসবের ব্যাপকতা অনেক বেশি। শরতের শিশিরভেজা শিউলি ফুলের গন্ধ, কাশফুলের শুভ্রতা, আকাশজুড়ে শরতের সাদা মেঘ সবই যেন মা দুর্গার আগমন বার্তা নিয়ে আসে ভক্তদের মধ্যে। তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় দেবীকে বরণ করে নেওয়ার আয়োজন।

ইতিহাসে কথিত আছে, প্রায় ২০০ বছর আগে রাজশাহীর রাজা কংস নারায়ণ প্রথম শরৎকালে দুর্গোৎসব শুরু করেছিলেন। অতীতে রাজা-জমিদাররাই এ পূজা করতেন। মাসব্যাপী এ উৎসবের আমেজ ওই অঞ্চলের সব মানুষ উপভোগ করত। যেহেতু দুর্গাপূজা উৎসবের আঙ্গিকে একটি ব্যয়বহুল পূজা, সেহেতু প্রথমে শুধু রাজা ও জমিদাররাই এ আয়োজন করতেন। দুর্গাপূজা পরবর্তী পর্যায়ে সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে সর্বজনীন পূজা হিসেবে প্রচলিত হয়।

আজ দুর্গাপূজার সর্বজনীনতা সবার কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত ও জনপ্রিয়। তাই শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হওয়ার প্রায় দুই মাস আগে থেকে পূজার প্রস্তুতি চলে বিভিন্ন মন্দির, আশ্রম, সংগঠন, শহর-বন্দর, উপজেলা ও জেলা শহরে। বিশেষ করে বিভিন্ন সংগঠন মা দুর্গা তাঁর সন্তান লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্তিক ও স্বামী ভগবান মহেশ্বরকে সঙ্গে নিয়ে মর্ত্যে আগমন করেন। অসুর শক্তি নিধনের প্রতীকী মূর্তিতে আমরা মা দুর্গাকে মহিষাসুর বধ করার দৃশ্যে দেখতে পাই। কে কত সুন্দর ও আকর্ষণীয়ভাবে তা প্রতিষ্ঠা করতে পারে এ নিয়ে বিভিন্ন পূজামণ্ডপের আয়োজকদের মধ্যে শুরু হয় তুমুল প্রতিযোগিতা। প্রতিমার মৃিশল্পীদের মধ্যেও প্রতিযোগিতা শুরু হয় কে কত সুন্দর ও শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রতিমা নির্মাণ করে আয়োজকদের মধ্যে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারেন। ধর্মীয়ভাবে প্রচলিত আছে যে মা দুর্গা এ সময় তাঁর স্বামী-সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়িতে আসেন, তাতে ব্যাপক আয়োজন হবে বৈকি!

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে পূজা বেড়েই চলেছে। স্বাধীনতার পর সারা বাংলাদেশে পূজার সংখ্যা ছিল চার থেকে পাঁচ হাজারের মতো। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পূজার সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত বছর সারা দেশে প্রায় ২৯ হাজার মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পূজার সংখ্যা বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো স্বাধীনতায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী মূল্যবোধগুলোর অন্যতম হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। কিন্তু ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর স্বাধীনতার মূল্যবোধগুলো একে একে পবিত্র সংবিধান থেকে মুছে ফেলতে পরবর্তী সরকারগুলো নানাভাবে ষড়যন্ত্র করেছে। অন্য চিন্তায় অর্থাৎ পাকিস্তানি ভাবধারায় দেশ পরিচালনা করা হয় দীর্ঘ ২১ বছর। ১৯৮৮ সালে তৎকালীন সরকারের আমলে সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম এবং অন্য ধর্মগুলোকে বিজাতীয়করণ করা হয়। এতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রাষ্ট্র পরিচালনার যে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছিল সে সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়।

১৯৯৩ সালে এক শ্রেণির দুষ্কৃতকারী ঐতিহাসিক জন্মাষ্টমীর বর্ণাঢ্য মিছিলে হামলা করে। এতে প্রায় ৩০ জনের মতো ভক্ত আহত হয়, তাদের মধ্যে চার-পাঁচজন দৃষ্টিশক্তিও হারায়। এ হামলার প্রতিবাদে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের আহ্বানে দেশব্যাপী মায়ের প্রতিমা অবয়ব নির্মাণের বদলে ঘটপূজা করা হয়। শুধু বাংলাদেশেই নয়, এ প্রতিবাদ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, যেমন আমেরিকা, লন্ডন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখানেও ঘটপূজার মাধ্যমে মায়ের আরাধনা করা হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসার পর পুনরায় স্বাধীনতার অন্যতম মূল্যবোধ ধর্মনিরপেক্ষতা ধারণ করে দেশ পরিচালনা করতে থাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আওয়ামী লীগ সরকার ২০০১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে পারল না। তারপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুলভাবে বিজয়ী হওয়ার পর থেকে সাত বছর ধরে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার পরিচালনার মাধ্যমে স্বাধীনতার মূল্যবোধগুলো ধারণ করে দেশ পরিচালনায় এক যুগান্তকারী উন্নয়নের ভূমিকা রাখছে বলেই সব ধর্মের মানুষ নির্বিঘ্নে ও স্বাধীনভাবে যার যার ধর্ম পালন করে যাচ্ছে, আর তারই সঙ্গে বেড়ে চলেছে পূজার সংখ্যা। আরেকটি বড় কারণ হলো, ধর্ম যার যার রাষ্ট্র আমাদের সবার—এটাকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধারণ করে আজ জনপ্রিয় স্লোগান হলো, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। ’ এই স্লোগান ধারণ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যান এবং বিশ্বাসের সঙ্গে সে কথা বলেন। সে কারণেই আজ এ স্লোগান সর্বমহল, এমনকি রাজনীতিবিদদের মধ্যেও জনপ্রিয়তা লাভ করছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলেই ১৯৮২ সালে সর্বপ্রথম একটি বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রধান হিসেবে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে মহানগর সর্বজনীন পূজামণ্ডপ, পুরান ঢাকার পূজামণ্ডপ ও ঢাকা রামকৃষ্ণ মিশনে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও ভক্তদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে ধর্মে ধর্মে সম্প্রীতির এক নতুন দিকনির্দেশনা দেন। তখন থেকেই তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অথবা বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে আসছেন। অতীতে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে কেউ এভাবে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেননি।

উল্লেখ্য, এখন সব রাজনৈতিক দলের নেতা, বুদ্ধিজীবী, সুধীসমাজসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ বাঙালি হিন্দু ঐতিহ্যের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজায় মণ্ডপে যায় এবং এর মধ্য দিয়ে ধর্মে ধর্মে, বর্ণে বর্ণে, গোত্রে গোত্রে ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে এক মহা মিলনমেলার সৃষ্টি হয়। এতে আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন আরো দৃঢ় হয়। বিভিন্ন রাষ্ট্রের বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে শারদীয় দুর্গোৎসবের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসবের আমেজে পাঁচ দিনব্যাপী সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এক সুন্দর সম্প্রীতির পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আজ এ উৎসব সব মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ যে ভারতের সাবেক পশ্চিমবঙ্গ, বর্তমানে ‘বাংলা’ রাজ্যসহ আসাম, ত্রিপুরা ও অন্যান্য বাঙালি হিন্দু অঞ্চলে দুর্গাপূজার আনন্দ-উদ্দীপনা, আকর্ষণ ও ব্যাপকতা দেশ-বিদেশে বিশেষভাবে আলোচিত এবং প্রশংসিত। তা ছাড়া আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, নেপালসহ বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও এই শারদীয় দুর্গোৎসব বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবেই পালিত হচ্ছে।

এবারের দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে দুর্গাপূজার উৎসবের আয়োজন সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ, র‍্যাব ও অন্যান্য সংস্থার সব সদস্যের সতর্ক নজরদারি থাকবে পূজামণ্ডপগুলোয়, যাতে কেউ কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে। আজ দেশের মধ্যে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতার মাধ্যমে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদ প্রতিহত করে যাচ্ছে দক্ষতার সঙ্গে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদ-সাম্প্রদায়িকতা বাংলাদেশের মাটি থেকে চিরতরে নির্মূল করার জন্য দেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ। তাই এবার উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে দুর্গাপূজার উৎসব নির্বিঘ্নে পালনের উদ্দেশ্যে দেশের সব পূজামণ্ডপে সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

মা দুর্গা দুর্গতিনাশিনী হিসেবে প্রতিবছর ভক্তদের সামনে আবির্ভূত হন। তিনি দশভুজা হিসেবেও পরিচিত। তিনি ১০ হাতে সব অপশক্তির কবল থেকে মানুষকে মুক্তি দেবেন এবং মানবকল্যাণে আমাদের সব ধরনের অগ্রযাত্রা প্রতিষ্ঠিত হবে—এ কামনা ও বাসনা নিয়েই এ বছর মাকে বরণ করে নেবে দেশের সব ভক্ত।

পঞ্জিকা মতে, এ বছর মা দুর্গা ঘোটকে চড়ে পৃথিবীতে আসবেন এবং ঘোটকে চড়েই স্বর্গলোকে ফিরে যাবেন। মা দুর্গার পৃথিবীতে ঘোটকে চড়ে আসা শুভ নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা। তাই মার কাছে সব ভক্তের বিশেষ প্রার্থনা, সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশের মানুষকে যেন রক্ষা করেন। মা দুর্গার চরণে আরো প্রার্থনা, সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদ-সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করে বাংলাদেশ যেন ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত, সুখী, সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে পরিচিতি লাভ করে। ২০২১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যবিত্তের বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে স্থান করে নিয়ে ২০৪১ সালে যেন বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে। তাহলেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়িত হবে। যত বাধাবিপত্তি আসুক, মা দুর্গা অবশ্যই ভক্তদের প্রার্থনা শুনবেন।

লেখক : সাংবাদিক


মন্তব্য