kalerkantho

রবিবার । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ । ৭ ফাল্গুন ১৪২৩। ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পবিত্র কোরআনের আলো

আল্লাহর ঘোষণা বাস্তবায়িত হবেই

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আল্লাহর ঘোষণা বাস্তবায়িত হবেই

১১৯. তোমার পালনকর্তা যাদের ওপর রহমত করেছেন, তারা ছাড়া (সবাই মতভেদ করতে থাকবে)। এ জন্যই আল্লাহ তাদের সৃষ্টি করেছেন। ‘আমি অবশ্যই জিন ও মানুষ দ্বারা জাহান্নামকে পরিপূর্ণ করব’—তোমার প্রতিপালকের এ কথা পূর্ণ হবেই। [সুরা : হুদ, আয়াত : ১১৯ (দ্বিতীয় পর্ব)]

তাফসির : আলোচ্য আয়াতের মূল বক্তব্য হলো, নিগূঢ় রহস্যের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা এ দুনিয়ায় কাউকে কোনো কাজে বাধ্য করেন না। আল্লাহ মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি দিয়েছেন। এর ফলে মানুষ পাপ ও পুণ্য উভয়টিই বেছে নিতে পারে। মানুষের মন-মানসিকতা বিভিন্ন হওয়ার কারণে তাদের মত ও পথ ভিন্ন ভিন্ন হয়েছে। ফলে সব যুগেই কিছু লোক সত্যের বিরোধিতা করেছে। আর কিছু লোক সানন্দে সত্য গ্রহণ করেছে। যাদের ওপর আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশেষ রহমত করেছেন, তারা সত্যের পথে চলেছে। নবী-রাসুলদের শিক্ষা অনুসরণ করেছে। তারা সত্যবিচ্যুত হয়নি।

মুফতি শফি (রহ.) উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন : আলোচ্য আয়াতে যে মতবিরোধের নিন্দা করা হয়েছে, তা হচ্ছে নবীদের শিক্ষা ও সত্য ধর্মের বিরোধিতা করা। পক্ষান্তরে দ্বীনের পণ্ডিত ও মুজতাহিদ আলেমদের মধ্যে যে মত-দ্বিমত সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে চলে আসছে, তা আদৌ নিন্দনীয় ও রহমত পরিপন্থী নয়, বরং তা অবশ্যম্ভাবী, সাধারণ মানুষের জন্য কল্যাণকর ও আল্লাহর রহমতস্বরূপ। (তাফসিরে মা’আরেফুল কোরআন)

আলোচ্য আয়াতের দ্বিতীয় অংশটি বিশেষ ব্যাখ্যার দাবি রাখে। সে অংশটি হলো, ‘এ জন্যই আল্লাহ তাদের সৃষ্টি করেছেন। ’ আয়াতে ‘এ জন্যই’ কথাটার মানে কী—এ নিয়ে তাফসিরবিদদের বিভিন্ন ব্যাখ্যা আছে। হজরত হাসান (রহ.)-এর মতে, ‘এ জন্যই’ মানে মতভেদ সৃষ্টি করার জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অর্থাৎ সৃষ্টিগতভাবে এমন স্বাধীনচেতা মনোভাব দিয়ে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে যে সে ভিন্ন পথ ও মত আবিষ্কার কিংবা গ্রহণ করতে পারে।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে, ‘এ জন্যই আল্লাহ তাদের সৃষ্টি করেছেন’—এর অর্থ হলো, আল্লাহ মতানৈক্য ও বিশেষ রহমতের জন্য মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। বিষয়টি অন্য আয়াতে এভাবে এসেছে : ‘তাদের মধ্যে কেউ হবে হতভাগ্য, আর কেউ হবে ভাগ্যবান। যারা হতভাগ্য, তারা থাকবে দোজখে, ...আর যারা ভাগ্যবান, তারা থাকবে জান্নাতে। ’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ১০৫-১০৮)

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে এ আয়াতের আরেকটি ব্যাখ্যা বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আল্লাহ মানুষকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, রহমত লাভের জন্য সৃষ্টি করেছেন। যাতে মানুষ রহমত লাভ করতে পারে, সে জন্য তিনি মানুষকে ইবাদতের নির্দেশ দিয়েছেন। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘জিন ও মানুষকে আমি কেবল আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি। ’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ৫৬)

আয়াতের শেষ অংশে বলা হয়েছে, “‘আমি অবশ্যই জিন ও মানুষ দ্বারা জাহান্নামকে পরিপূর্ণ করব’—তোমার প্রতিপালকের এ কথা পূর্ণ হবেই। ” এখানে বলা হয়েছে, পৃথিবী সৃষ্টির আগেই এটি মীমাংসিত হয়েছে যে জিন ও মানুষের এক দল জান্নাতে যাবে, আরেক দল জাহান্নামে যাবে। পাপাচারী ও অবিশ্বাসী মানব-দানবদের দিয়ে আল্লাহ জাহান্নামকে পূর্ণ করবেন। আল্লাহর এ ঘোষণা বাস্তবায়িত হবেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘জান্নাত ও জাহান্নাম একবার বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে। জান্নাত বলল, আমার কী হলো, আমার মধ্যে কেবল সমাজের দুর্বল ও অবহেলিত লোকেরাই প্রবেশ করবে। জাহান্নাম বলল, উদ্ধত ও অহংকারীদের মাধ্যমে আমার মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ জান্নাতকে বললেন, হে জান্নাত! তুমি আমার রহমত। তোমাকে দিয়ে আমি যাকে ইচ্ছা দয়া করি। আর তিনি জাহান্নামকে বললেন, হে জাহান্নাম! তুমি আমার আজাব। তোমার মাধ্যমে আমি যাকে ইচ্ছা শাস্তি দিই। তোমাদের প্রত্যেককে আমি পূর্ণ করেই ছাড়ব। ’ (বুখারি শরিফ, ইবনে কাসির)

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য