kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভর্তি পরীক্ষায় সমন্বয়ের অভাব

ড. সহিদুজ্জামান

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ভর্তি পরীক্ষায় সমন্বয়ের অভাব

বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার তারিখ একই দিনে নির্ধারিত হওয়ায় বিপাকে পড়েছে উচ্চশিক্ষায় ভর্তীচ্ছু শিক্ষার্থীরা। ১৯ জুলাই ২০১৬ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের সংগঠন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের তথ্য অনুযায়ী আগামী ২৩ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।

১৮ নভেম্বর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, তেজগাঁওয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরদিন ১৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ২ নভেম্বর। এ ছাড়া কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ পর পর থাকায় অধিক দূরত্বের কারণে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে।  

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচি অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, একজন শিক্ষার্থীকে ৪ নভেম্বর যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি) ভর্তি পরীক্ষা শেষ করে পরদিন চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) পরীক্ষা দিতে হলে প্রায় ৪৬৬ কিলোমিটার বা প্রায় ১২ ঘণ্টা ভ্রমণ করতে হবে। অনুরূপভাবে ২৮ অক্টোবর খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী একজন শিক্ষার্থী পরদিন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) অংশগ্রহণ করতে চাইলে তাকে ৩৮৫ কিলোমিটার বা প্রায় ৯ ঘণ্টা ভ্রমণ করতে হবে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকায় অবস্থিত বিজ্ঞানের একটি শিক্ষার্থীর সময় বা দূরত্ব বিবেচনা করে প্রায় ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা অনেকটাই অসম্ভব হবে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী সব ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণে ইচ্ছুক একজন শিক্ষার্থীকে শুধু অক্টোবরের ২২-২৯ তারিখ মোট পাঁচ দিনে গড়ে প্রায় ২২৯ কিলোমিটার রাস্তা ভ্রমণ বা প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ব্যয় করতে হবে। নভেম্বর মাসে ৯ দিনে মোট দুই হাজার ১১২ কিলোমিটার বা ৫৬ ঘণ্টা (গড়ে ২৩৫ কিলোমিটার বা ৬.২ ঘণ্টা) ভ্রমণ করতে হবে। ডিসেম্বর মাসে গড়ে ২৪৬ কিলোমিটার বা ৬.৭১ ঘণ্টা ব্যয় করতে হবে। তবে ভর্তি পরীক্ষার মধ্যে বাড়ি ফেরাসহ মোট প্রায় সাত হাজার ৭৮১ কিলোমিটার বা ১৯৪.৫ ঘণ্টা (গড়ে প্রায় ৩৭০ কিলোমিটার বা প্রায় ৯ ঘণ্টা) ভ্রমণ করতে হবে।

বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটার ১.৪২ টাকা হারে সাত হাজার ৭৮১ কিলোমিটারের ভাড়া দাঁড়ায় প্রায় ১১ হাজার ৫০ টাকা এবং একজন শিক্ষার্থী যদি সর্বোচ্চ ২১টি কেন্দ্রে পরীক্ষা দেয়, তাহলে খাওয়া-থাকাসহ কমপক্ষে আরো প্রায় ৪২ হাজার টাকা খরচ হবে। এই গাণিতিক হিসাবের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক কিছু খরচ যেমন রিকশা বা অটো ভাড়াসহ মোট খরচ হতে পারে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা। এতে উচ্চশিক্ষায় ভর্তীচ্ছু একজন শিক্ষার্থীকে শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে; বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এ অবস্থা আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এ ছাড়া বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরমের মূল্য ও বিষয়ভিত্তিক ভর্তি ফির মধ্যে অসামঞ্জস্য অভিভাবকদের আরো বিপাকে ফেলে দিয়েছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যে প্রচলিত পদ্ধতিতে ভর্তিপ্রক্রিয়া চালু রয়েছে, তাতে দেখা যায়, ভর্তীচ্ছু শিক্ষার্থীদের ছুটতে হয় এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে, এক জেলা থেকে আরেক জেলায়, এক বিভাগ থেকে আরেক বিভাগে, এমনকি দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। অনেক সময় কোনো শিক্ষার্থী এই জটিলতা বা পরিস্থিতির শিকার হয়ে যখন পছন্দের বিষয়টিতে ভর্তি হতে না পারে তখন হতাশা আর না পাওয়ার বেদনা নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত বিষয়ে ভর্তি হয়ে উদ্দীপনা হারিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না। তাই প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে তার যোগ্যতা সাপেক্ষে সব ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগদানের মাধ্যমে মেধা যাচাইয়ের সুযোগ দিতে হবে। তা না হলে বঞ্চিত হবে মেধাবীরা, ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ ও জাতি।

কেন্দ্রীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি বিশ্বের অনেক দেশেই রয়েছে (চীন, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল); যদিও বিষয়টি নিয়ে আমাদের অনেক কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজন আছে, তবে দেশের যোগাযোগ, অধিক শিক্ষার্থী ও আর্থসামাজিক দিকগুলো বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাধীনভাবে পরীক্ষা নেওয়ার অধিকার আছে। তবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তির বিষয়টিও গুরুত্বসহ বিবেচনা করতে হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত পরীক্ষা পদ্ধতি অতিদ্রুত চালু করতে না পারলেও অন্ততপক্ষে দেশের ৩৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবকরা সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় রুটিন এমনভাবে করতে পারেন, যাতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ভোগান্তির শিকার না হন এবং একজন শিক্ষার্থী যোগ্যতা অনুযায়ী তার পছন্দের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বা সব বিষয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দূরত্ব বিবেচনা করে কাছাকাছি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিষয়ভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষার তারিখ পাশাপাশি করা যেতে পারে এবং বেশি দূরত্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে কমপক্ষে এক সপ্তাহ বিরতি দিয়ে ভর্তি পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা যেতে পারে।  

বাংলাদেশে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার চাকরির পরীক্ষা, মেডিক্যাল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষা, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রীয়ভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে একযোগে অথবা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিষয়ভিত্তিক  গ্রুপে ভাগ করে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেমন অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একসঙ্গে ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, একইভাবে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা সম্পাদন করা যেতে পারে। মানবিক ও বাণিজ্য শাখার বিষয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষাও একইভাবে করা যেতে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরমের মূল্য ও বিষয়ভিত্তিক ভর্তি ফির মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়ে আসা উচিত। এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুুরি কমিশন তথা সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এখানে সমাজের আলোকিত মানুষরা জ্ঞান বিতরণ করেন। তাঁদের বুদ্ধি, বিবেক ও বিচক্ষণতার কাছে এসব শিক্ষার্থী ও অভিভাবক ভর্তি পরীক্ষায় ভোগান্তি ও জটিলতা কাটিয়ে অতিদ্রুত সহজ ও অধিকতর কার্যকর সমাধান আশা করেন।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

szaman@bau.edu.bd


মন্তব্য