kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পবিত্র কোরআনের আলো

বিশ্বাস ও মতাদর্শের বিরোধ থাকবেই

৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বিশ্বাস ও মতাদর্শের বিরোধ থাকবেই

১১৮. তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে সব মানুষকে এক জাতি করতে পারতেন। কিন্তু তারা মতভেদ করতেই থাকবে।

(সুরা : হুদ, আয়াত : ১১৮)

তাফসির : আগের আয়াতে বলা হয়েছিল, যে সমাজে অপরাধ নির্মূলে সমাজ সংস্কারকরা এগিয়ে আসেন, নাগরিকরা দায়িত্ববান হয়, ক্রমান্বয়ে সে সমাজের উন্নতি ও অগ্রগতি হতে থাকে। সে সমাজ ধ্বংস হয় না। সে সমাজের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হয় না। আলোচ্য আয়াতে সমাজে বিভিন্ন ধরনের লোকের উপস্থিতির কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, বিশেষ হিকমতের কারণে নানা রং, শ্রেণি, পেশা, বিশ্বাস ও আদর্শের মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে। যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন, তাহলে সব মানুষকে এক জাতি বা মুসলমান হতে বাধ্য করতেন। আল্লাহ সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। তিনি ইচ্ছা করলে সবাই এক জাতিতে পরিণত হতো। তখন কোনো মতভেদও থাকত না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা নানা পথ ও মতের মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি ও জ্ঞান দিয়েছেন। চিন্তার স্বাধীনতা দিয়েছেন। যুগে যুগে সত্য ও সরল পথ প্রদর্শনের জন্য নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। তাই মানুষ স্বাধীনভাবে তার পথ নির্বাচন করবে—এটাই আল্লাহর ইচ্ছা। তিনি মানুষের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি ও পুরস্কারের বিধান রেখেছেন। যারা নিজেদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা কাজে লাগিয়ে সৎপথ অবলম্বন করবে, তারা পুরস্কৃত হবে, আর যারা তা করবে না তারা শাস্তি পাবে। কাজেই সৃষ্টিগত নিয়মেই মানুষের মধ্যে মত-দ্বিমত বিদ্যমান। কোনো কিছুর বিনিময়ে এ বিরোধ রোধ করা যাবে না। এ বিরোধের চূড়ান্ত মীমাংসা হবে পরকালে।

ইসলাম উদারতা, কোমল মানসিকতা ও প্রসন্নচিত্ততার নির্দেশ দেয়। কোরআনে এসেছে : ‘আল্লাহ কারো ওপর তার সাধ্যাতীত কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬৮)

ইসলামের উদারতা গগনচুম্বী। চাপিয়ে দেওয়ার মতো কোনো বিধান নয় এটি। এর সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হয়ে সবাই তা গ্রহণ করবে—এটাই স্বাভাবিক। ইসলাম এমন এক সর্বজনীন জীবন বিধান, যেখানে নেই কোনো সংকীর্ণতা বা সংঘাত। এতে রয়েছে উদারতা, বিশালত্ব ও গোটা সৃষ্টির প্রতি অসীম মমত্ববোধ। ইসলাম শুধু মুসলমান নাগরিকদের জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা বিধান করেনি, ধর্ম-নির্বিশেষে সব নাগরিকের যথাযথ অধিকার ও নিরাপত্তা বিধান করেছে। ইসলাম পরমতসহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয়, পরধর্মের বা মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে নির্দেশ দেয়। ইসলাম পারস্পরিক সম্প্রীতির সঙ্গে সবার সহাবস্থান সুনিশ্চিত করে। অন্যের ধর্ম-মতাদর্শকে অবজ্ঞা ও অশ্রদ্ধা করতে ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কোরআনে এসেছে : ‘তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ডাকে, তোমরা তাদের গালি দিয়ো না, নইলে তারাও শত্রুতার কারণে না জেনে আল্লাহকে গালি দেবে। ’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১০৮)

মানবসমাজে অশান্তি সৃষ্টি, নাশকতা, নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা, সংঘাত, হানাহানি, উগ্রতা, বর্বরতা, প্রতিহিংসাপরায়ণতা ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘দুনিয়ায় শান্তি স্থাপনের পর এর মধ্যে বিপর্যয় ঘটাবে না। ’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৬)

ইসলামে মুক্তচিন্তার অবারিত সুযোগ আছে। তাই এ ধর্মে বহু দল-উপদলের উপস্থিতি দেখা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বনি ইসরাইল ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল, আর আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। ’ সুতরাং আদর্শিক বিরোধের ক্ষেত্রে সহনশীলতা ও সহিষ্ণুতার বিকল্প নেই। ইসলামের প্রধান মূলনীতি চারটি—কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস। এর মধ্যে ইজমা ও কিয়াস হলো যুক্তি ও গবেষণানির্ভর। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে কোরআন ও হাদিস অবতীর্ণ হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়; কিন্তু নিত্যনতুন যুগজিজ্ঞাসার জবাবে ইজমা ও কিয়াস তথা চিন্তা ও গবেষণার দরজা কেয়ামত পর্যন্ত খোলা।

 

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য